- অপরাধ ও দুর্নীতি, আলোচনা, রাজনীতি, সমাজ ও পরিবেশ

তোমরা পন্ডিত হতে পারো, আমরা মূর্খ নই

পাঠক মিত্র

দেশে এখনও অতিমারির প্রকোপ কমেনি। তৃতীয় ঢেউ নিয়ে ভাবনা সব মহলেই শুরু হয়েছে। টিকা নিয়ে এখনও পর্যন্ত সদর্থক ও সুসম নিয়ম করা যায়নি। অতিমারি ঘোষিত। অথচ মানুষকে বাঁচতে হবে নিজের তাগিদে। এই অবস্থার পাশাপাশি উপকূলবর্তী রাজ্যগুলো প্রাকৃতিক রোষের মুখে দিন কাটাচ্ছে। প্রতিবছর তার বিধ্বংসী চেহারায় লক্ষ লক্ষ মানুষ বিধ্বস্ত। ঠিক এই সময়ে আবার আলোচনায় উঠে আসছে দেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব। অতিমারিতে মানুষের নিরাপত্তা কি? ভালো চিকিৎসা। সেই চিকিৎসার চেহারা তার আনুষঙ্গিক উপকরণের অভাবে মানুষ লাশ হয়ে পড়ে আছে হাসপাতালে, শ্মশানে, রাস্তায়, নদীর স্রোতে। তাহলে মানুষ নিরাপদ কোথায়। অবশ্য এখন যে নিরাপত্তার কথা আসছে তা হল দেশের নিরাপত্তা। দেশের ভেতরে মানুষ নিরাপদে বাঁচে না, অথচ দেশের নিরাপত্তা নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। দেশের নিরাপত্তা নষ্ট হতে পারে নাকি অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের হাতে যাঁরা দেশের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। একটা কথা বোঝা যাচ্ছে না যাঁরা দেশের নিরাপত্তার কাজে কর্মজীবন শেষ করল। অবসরের পরে তাঁরা সেই নিরাপত্তাকে নষ্ট করতে পারে বলে আশঙ্কা করা মানেই চাকরি শেষে তাঁদের দেশভক্তি নিয়ে প্রশ্ন এসে যাচ্ছে। তাই দেশের স্বার্থে তাঁদের মুখ বন্ধ রাখতে হবে, কলম বন্ধ রাখতে হবে। এতদিন জানা ছিল আমলা রাষ্ট্রের। কিন্তু অবসরের পরে তার কোনও আর অর্থ থাকে না, এটাই প্রমাণ হল। দেশের জন্য যাঁরা সারাজীবন কাজ করে গেল বলে বলা হয় তাঁরা দেশের স্বার্থ বুঝবে না। অবসরের পর তাঁরা দেশকে বিপন্ন করে তুলতে পারে। আসলে তা নয়। বিপন্ন হবে সরকারে থাকা রাজনৈতিক দল ও তার নেতারা। তাঁদের ভুল পদক্ষেপ মানুষের কাছে প্রকাশ যাতে না পায়। সেটাই লক্ষ্য।

অবসরের পর সরকারের পদক্ষেপের কোনও ভুল যাতে তুলে ধরা না হয়, এটাই লক্ষ্য। যে ভুলটার এখন প্রাসঙ্গিকতা না থাকলে তার সমালোচনা করা মানেই তো ভবিষ্যতকে সমৃদ্ধ করে। আর যদি সরকারের কোনও ভুলের মাশুল এখনও দিয়ে যেতে হয়, তার কথা বলবে সে সরকারের কাছেই যা সরকার উপদেশ বা প্রস্তাব হিসেবে গ্রহণ করলে তাতে ত দেশের প্রশাসনের ভালো। সেই উপদেশ বা প্রস্তাব প্রকাশে নাইবা এল। সেন্ট্রাল সিভিল সার্ভিসেস(পেনশন) সংশোধনী আইন, ২০২১-এ তা আনলে। এই সংশোধনী আইন নিয়ে তর্কবিতর্ক করার একটা দিক পাওয়া যেত। তাহলে দেশের জন্য কথা তুলে আমলাদের মুখ বন্ধের যে প্রক্রিয়া চলছে, সেখানে সাধারণ মানুষ হীরার শ্রমিকের মতো (হীরক রাজার দেশে চলচ্চিত্রে যেমন) মুখ বুজে শুধু কাজ করে যেতে হবে। এছাড়া আর অন্য কোনও উপায় থাকবে না। এমনিতে বাকস্বাধীনতা হরণে রাষ্ট্রকে নানা সময়ে নানাভাবে দেখা গেছে। মূলতঃ সরকারী নীতি ও পদক্ষেপের সমালোচনা যাঁরা কঠোরভাবে করেছে তাঁদের প্রতি। সে ছাত্র হোক, কবি হোক, ডাক্তার হোক, সাংবাদিক হোক, সমাজকর্মী হোক। সবার কাছে তা অজানা নয়। মাননীয় আদালত ও কখনও কখনও বলেছেন সরকারী নীতির বিরুদ্ধতা করা মানেই ‘দেশদ্রোহী’ হতে পারে না। এই শব্দটি যদিও ইদানিং কম ব্যবহৃত হচ্ছে। সেই জায়গায় জাতির স্বার্থ, দেশের স্বার্থ এই অতিমারিতে আলাদা করে গুরুত্ব নিয়ে হাজির হচ্ছে। দেশের অধিকাংশ মানুষ যখন মৃতপ্রায় তখন এই শব্দের ঝংকার তোলা কাদের জন্য। তার মানে বলা যায় মৃতপ্রায় মানুষের জন্য সরকারের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন করবে যে তাঁর জন্য। এই প্রশ্ন তো শাসক দলের জনপ্রতিনিধিরা সবসময় করতে পারেন না। থাকলেও অনেকে তা প্রকাশ করতেও পারে না। উত্তরপ্রদেশের এক বিজেপি বিধায়ক করোনার চিকিৎসা ও মৃত্যু নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও বলতে না পারার জন্য যুক্তি দিয়ে বলেছেন, তিনি ‘দেশদ্রোহী’ হতে চান না। তাহলে সরকারি নীতি ও কাজের বিরুদ্ধ সমালোচনা সাধারণ মানুষ, আমলা থেকে জনপ্রতিনিধি কেউই করতে পারবে না। এই অবস্থা যদি আয়ত্তে আসে তাহলে কি মজা। সেই মজা কার। অবশ্যই রাজার। রাজার বিরুদ্ধে প্রশ্ন করার আর কেউ থাকল না।

আর একটি কথা সার্বভৌমত্ব নষ্ট যাতে না হয় তার জন্যও সেন্ট্রাল সিভিল সার্ভিসেস (পেনশন) সংশোধনী আইনের প্রয়োজন হয়ে পড়লো। দেশের সার্বভৌমত্ব নষ্ট প্রকৃতপক্ষে কি আমলাদের হাতে থাকে? এ প্রশ্ন ও তার উত্তর নিয়ে সংশয় থাকার কথা নেই। দেশের সার্বভৌম নষ্ট করার জন্য কোনও ব্যক্তিবিশেষ সে সাধারণ মানুষ থেকে আমলা কি দায়ি হতে পারে। স্বাধীনতার পরে যতগুলো দাঙ্গা হয়েছে তার জন্য দায়ি কে? কোনও একজন ব্যক্তি বা সরাসরি প্রশাসন কি দায়ি। তা কিন্তু নয়। তার পিছনে হয় কোনও রাজনৈতিক দল বা অন্য কোনও সংগঠন জড়িয়ে আছে। প্রশাসনিক তদন্তে অনেক তথ্য উঠে না এলেও ভুক্তভোগী মানুষের কাছে তার ইতিহাস জমা থাকে। সার্বভৌমত্ব নষ্ট করার চেষ্টা কোনও ব্যক্তিবিশেষ করতে পারে তার সংগঠন দিয়ে। তবুও দেশের সার্বভৌমত্ব বাঁচে একমাত্র রাজনীতির সুস্থতায়। সেই সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন থাকে বলেই আজ আমলাদের কথা বলার মধ্যে প্রশ্ন না থাকার প্রশ্ন ওঠে। আসলে আমলারা রাজনৈতিক প্রভুদের সেবা করতে হয় ঠিকই, যখন সেই প্রভুদের সাথে সাথে তাঁদের নোংরা রাজনীতির সেবা হয়ে যায়, তখন সবার পক্ষে বিপজ্জনক। তাই আমলাকে রাজনৈতিক প্রভুর রাজনীতির সেবা করতে হবে, নইলে ভুগতে হতে পারে। সেই কথাটা হয়তো ধীরে ধীরে উঠে আসবে আগামী দিনে। এর মধ্যে রাজনৈতিক নেতাদের হয়তো পরোক্ষ বার্তা লুকিয়ে আছে– “আমলা, তোমরা পন্ডিত হতে পারো, আমরা মূর্খ নই”।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *