- আলোচনা, সমাজ ও পরিবেশ

বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২১

সন্তোষ অভি

প্রতি বছর রাষ্ট্রসংঘের উদ্যোগে ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়ে আসছে, ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে। পরিবেশ রক্ষার সচেতনতা বৃদ্ধি ও নুতন নুতন পদক্ষেপকে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে। পরিবেশ দিবস পালন করে এমন ১৪৩টি দেশের মধ্য থেকে প্রতি বছর একটি দেশকে বাছাই করা হয়, প্রধান কেন্দ্র হিসাবে। থিমের বিষয়বস্তুকে কার্যকর করা ও প্রচার করার উদ্দেশ্যে।

এই বছরে (২০২১) নির্বাচন করা হয়েছে পাকিস্তানকে (হোস্ট) ও মূল থিম/ বিষয় রাখা হয়েছে Eco-System Restoration বা পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করা। যার মধ্যে বৃক্ষরোপন, উপকূল অঞ্চল / সমুদ্র তট / নদী পরিস্কার রাখার কাজ ইত্যাদি করা হবে। এই সম্পর্কিত বিষয়ে সচেতন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা ও আরও বিবিধ উপায় অবলম্বন করে বিষয়টিকে কার্যকর করে তোলার দিকটি দেখতে হবে।

আমরা পরিবেশ নিয়ে অনেক কথা বলি কিন্তু কাজের কাজ খুব কমই করি। এই বিষয়ে বিজ্ঞানী বা গবেষকদের কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হয় না, বা শোনা হয় না। তাঁদের প্রস্তাব বা সুপারিশকে মান্যতা দেওয়া হয় না। যার ফলস্বরুপ আমাদের আরও বেশি বেশি করে প্রাকৃতিক বির্পযয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে। আরও বেশি বেশি করে স্বাস্থ্য বিষয়ক দুর্ভোগের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

কয়েকটি বিষয় যেমন বিশ্ব উষ্ণায়ন, সমুদ্রপৃষ্টের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ইত্যাদি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা না করার ফল। আমাদের অবাধে যত্র-তত্র বৃক্ষনিধন, প্লাস্টিকের ব্যবহার, পাহাড় বা সমূদ্র সৈকতে অবৈজ্ঞানিক পন্থায় নানান নির্মাণ, অবৈজ্ঞানিক উপায়ে কোনও পরিবেশের নিয়ম না মেনে কল-কারখানা করা ইত্যাদির ফলে আমরা আমাদেরই বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছি।

সমুদ্রপৃষ্টের উপরিভাগের তাপমাত্রা বৃদ্ধি মূলত বিশ্ব-উষ্ণায়নেরই ফলেই ঘটছে। যার জন্যই সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার একটা বৃহৎ জনসংখ্যা আরও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হবে। যেমন সমুদ্রের জলস্ফীতির ফলে উপকূলের বিশাল অঞ্চল প্লাবিত হবে। আরও ভূমির ধস নামবে। মিষ্টি জলের এলাকায় লোনা জল চাষযোগ্য জমি ও পুকুরের প্রভূত ক্ষতিসাধন করবে। উপকূলীয় এলাকায় মাছ উৎপাদনের ব্যাপক ক্ষতি হবে। আবহাওয়ার ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ফলে বিভিন্ন রকমের ভাইরাস সংক্রমণ, মহামারী ইত্যাদি আরও বেশি বেশি করে ঘটতে থাকবে।

এসব বিষয়ে বিজ্ঞানীরা অনেক আগেই তাঁদের গবেষনালদ্ধ ফলাফল জানিয়েছেন এবং নিরন্তর প্রচেষ্টা করে চলেছেন আরও ভাল করে বিজ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর জন্য। কিন্তু মানুষ তাঁর সাময়িক সুবিধার্থে সমুদ্র তীরে বালুরাশি ধংস করে হোটেল বা রির্সট তৈরি করেছে। উপকূল রক্ষাকারী ম্যানগ্রোভ রক্ষা করছে না। বন জঙ্গল কেটে বাসভুমি বা নানান কাজে লাগানো হচ্ছে।

বিশ্ব-উষ্ণায়নের জন্য Green House Effects নিয়ে বহুবছর ধরে বা অনেকদিন ধরে কাজ চলছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে কি? হিমবাহে ধস নামছে। সমুদ্রে জল বাড়ছে। এদিকে সমুদ্র তলের উষ্ণতাও বাড়ছে। ফলে উপকূল অঞ্চলের বিপদ বাড়ছে। নদীবাঁধ তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়ছে। দ্বীপের মানুষ দ্বীপছাড়া হওয়ার উপক্রম! নুতন করে উদ্বাস্তু হওয়ার অবস্থা তৈরি হচ্ছে।

হিমবাহের দেশ আইসল্যান্ডের খবর আমরা সম্প্রতি দেখেছি কিভাবে হিমবাহ সাংঘাতিক ভাবে গলে পড়ছে। প্রকান্ড আকারের বরফের ধস নামছে। গত ২০ বছরে ৭০০ বর্গকিলোমিটার হিমবাহ হারিয়েছে বা ধ্বংস হয়েছে, যা আইসল্যান্ডের মোট ভূখণ্ডের ৭ শতাংশ। হিমবাহ বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ২২০০ সালের মধ্যে আইসল্যান্ডের বরফ স্তর সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দিন দিন বাড়ছে। ২ লাখ ২০ হাজার হিমবাহর প্রায় সবকটি খুব দ্রুত হারে গলছে। ফলে সমুদ্রের জল বাড়ছে, উপকূলবর্তী নীচু অঞ্চল জলের তলায় চলে যেতে পারে।

আমরা কি আমাদের সর্বনাশের দিন গুনছি? সমস্ত রাষ্ট্র পরিচালকেরা কি দিবানিদ্রায়? দেখেও কিছু দেখছেন না ! বিজ্ঞানীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। তারা সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেন, মানুষের কল্যাণে কাজ করেন। এখন অন্তত বিজ্ঞানের দৌলতে আবহাওয়ার পূর্বাভাষের জন্য মানুষ অনেক আগেই সাবধান হতে পারছেন। ইয়াসের মত এত বড় বির্পযয়েও নূন্যতম প্রাণহানি ঘটছে।

বিশ্বে বিজ্ঞানীদের অবস্হা তো পারমানবিক বোমা আবিষ্কারের ঘটনার মত, আবিষ্কার করলেন বিজ্ঞানীরা কিন্তু তা মানুষের কল্যাণে ব্যবহার না করে, মানুষকে ধংস করতে ব্যবহার করা হয়েছিল এবং সে সিদ্ধান্ত নেন রাষ্ট্রনেতারা।

উন্নত পরিবেশ, যথাযথ প্রযুক্তির ব্যবহার, পরিবেশ বান্ধব কল কারখানা গড়ে তোলা, শহরে, জঙ্গলে, নদী, পাহাড়কে দূষণ মুক্ত রাখার ব্যবস্থা করা ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষের কষ্ট কিছুটা লাঘব হতে পারে। করতে হবে ব্যাপক বৃক্ষায়ন/সবুজয়ান। প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে পাহাড়, সমূদ্র উপকূলে অবৈজ্ঞানিক নির্মাণ করা চলবে না। কোভিড আমাদের আরও সচেতন করছে অক্সিজেন কত বেশি প্রয়োজন। অতএব প্রকৃতি ধ্বংস নয়, তাকে প্রাণ দিয়ে বাঁচাতে হবে, নিজেদের বাঁচার তাগিদেই। প্রকৃতিবান্ধব হতে হবে, গাছ লাগাও, গাছ বাঁচাও আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে দিকে দিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *