- আলোচনা, সমাজ ও পরিবেশ

করোনাকালে শিক্ষাব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে কোথায়? ভবিষ্যৎ কী?

ইন্দ্রনীল বন্দ্যোপাধ্যায়

২০২০ থেকে সারা বিশ্ব কোভিড নামক এক ভয়াবহ মহামারীর গ্রাসে বিপর্যস্ত। বিপর্যস্ত সমাজ, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা সর্বোপরি গোটা জনজীবন। মহামারীর কবল থেকে বাঁচতে লকডাউন ও গৃহবন্দী দশায় সবচেয়ে বিপর্যস্ত শৈশব থেকে যৌবন ও শিক্ষা ব্যবস্থা। সারা বিশ্বের সঙ্গে ভারতেও বিগত ১৫ মাস যাবৎ দেশের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। টীকা আবিষ্কারের সাথে সাথে বিশ্বের উন্নত দেশগুলি এই মহামারীর প্রকোপ থেকে কিছুটা সামলে উঠলেও ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশ এই কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউতে চূড়ান্ত বিপর্যয়ের মুখে। স্বাস্থ্য বা অর্থনীতির বিপর্যয় সুদক্ষ রাষ্ট্র পরিচালন নীতির দ্বারা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হলেও শিক্ষা ক্ষেত্রের হাল ফিরবে কিভাবে?

শিক্ষাদানের পদ্ধতিতে স্বপ্রশ্ন মননের পাশাপাশি যুক্ত থাকে সমানুভূতি ও সহানুভূতি। মহাত্মা গান্ধীর মতে, প্রকৃত শিক্ষা সম্ভব শরীর মন ও আত্মার সংমিশ্রণের মধ্য দিয়ে। কিন্তু শিক্ষাঙ্গনচ্যূত ছাত্রসমাজ আজ সেটা গড়ে তুলবে কিভাবে? দীর্ঘ প্রায় ১৫ মাস ভারতবর্ষের ছাত্ররা বিদ্যালয়মুখী হয়নি। ব্ল্যাকবোর্ড, শ্রেণীকক্ষ থেকে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ এমনকি শিক্ষক দের মুখও তারা দেখেনি। শিক্ষক ও ছাত্রের মধ্যে সংযোগমাধ্যম হিসেবে আজ শুধু বর্তমান অন-লাইন শিক্ষা ব্যবস্থা। এই শিক্ষা ব্যবস্থা হল যন্ত্রগত শিক্ষা যেখানে শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ ঘটে থাকে। যেখানে দেহ ও মনের বিকাশের মাধ্যমে শিক্ষা সম্ভবপর নয়। ছাত্রের প্রতি শিক্ষকের সহানুভূতি সেখানে ব্রাত্য।

অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থায় হাতে কলমে পাঠ প্রয়োগ, বুদ্ধিমত্তা বা প্রয়োগ ক্ষমতার বিকাশ সম্ভবপর নয়। উপরন্তু শিক্ষাঙ্গন বর্জিত ছাত্র সমাজ ঘরে বসে যন্ত্র দ্বারা (মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, কম্পিউটার) পড়া পড়া খেলতে খেলতে বাস্তব বর্জিত অনলাইন গেমে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এই আসক্তি তাদের খেতে, বসতে, খেলতে, পড়তে, বলতে ভুলিয়ে দিচ্ছে। আট-দশ ঘন্টা (প্রতিদিন) এই যন্ত্রনির্ভর জীবন তাদের চোখ, মস্তিষ্ক ও শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধির বদলে সর্বনাশ ডেকে আনছে। ছাত্র সমাজের খাওয়া দাওয়া, ঘুম, আচরণ, সবকিছুর মধ্যে চলে এসেছে বিস্তর পরিবর্তন।

অতিমারিতে সামাজিক মেলামেশা বন্ধ, ফলে শিশু থেকে তরুণ ছাত্র ছাত্রী দের গৃহবন্দী দশা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে প্রভাব ফেলছে। বাড়ছে স্থূলতা, চোখ, শিড়দাড়া ও মাথর রোগ। এই পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে তা বোধহয় বিধাতাও জানেন না। শিক্ষাঙ্গন কবে তার মুক্ত পরিবেশ ফিরে পাবে এই প্রশ্নের উত্তর কারো জানা নেই। এই গৃহবন্দী দশায় অনলাইন না অফ লাইন পদ্ধতিতে মূল্যায়ন কীভাবে সম্ভব সেই উত্তর পেতে ও সিদ্ধান্ত নিতে সরকার ও দ্বিধাগ্রস্ত; কেননা আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে এই অনলাইন পদ্ধতি ক্রয় করার ক্ষমতা কতটুকু তা আমরা প্রায় সকলেই জানি। ইন্টারনেট সংযোগ ও পরিষেবার হালও গ্রামে গঞ্জে তথৈবচ।

করোনাকালে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে তা মোটেই আশা ব্যঞ্জক নয়। কেন্দ্রীয় বোর্ডের দশম ও দ্বাদশ শ্রেণীর পরীক্ষা বাতিল করতে হয়েছে। রাজ্যগুলিও বোর্ড পরীক্ষা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। আসলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক স্বাস্থ্যের কথা ভাবতে গিয়ে কোথাও আমরা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটি বোধহয় বিচার করছি না। সারা বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করা ছাত্রছাত্রী যখন বছর শেষে জানতে পারে তার পরীক্ষা বাতিল করা হল তখন তার মানসিক অবস্থার খোঁজ কে রাখে?

আবার অপরদিকে গৃহবন্দী শিক্ষককূলও অনলাইন পাঠদানের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকে মোটামুটি সচল রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে সরকারি শিক্ষকদের বেতন প্রাপ্তির সমস্যা না থাকলেও, বাড়ি গিয়ে পাঠদান বা টোলকেন্দ্রিক পাঠদান করা প্রাইভেট টিউটরদের অনেকের বেতন বন্ধ হওয়ায় সংসারে হাঁড়ি চড়ছে না।

তাহলে এই শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কী? সবচেয়ে বড় কথা স্বাধীনতার এত বছর পরেও আমাদের দেশে শিক্ষার প্রকৃত হাল ফেরেনি। পরিকাঠামোগত উন্নয়নও হয়নি। আমরা শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি করে গিয়েছি। কিন্তু শিক্ষাকে বাহন বানাতে শেখাইনি। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-তেও অনলাইন পাঠদানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ গৌণ থেকে যায়। এমনকি প্রতিযোগিতা ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও সংকুচিত হবার প্রবল আশঙ্কা থেকে যায়। তাই টীকাকরণ করে দেশবাসীকে বাঁচাবার পাশাপাশি শিক্ষার হাল ফেরানোটাও অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হওয়া উচিত। বর্তমান এই শিক্ষক-শিক্ষাঙ্গনবর্জিত হতশ্রী শিক্ষাব্যবস্থার সুন্দর সমাধানের কথা ভাবতে হবে একযোগে ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক ও সমাজকে, সর্বোপরি রাষ্ট্রের সরকারকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *