- আলোচনা, রাজনীতি

তৃণমূল সুপ্রিমোর নীতিবাক্য ও মানুষের চিন্তাভাবনার দীনতা

পাঠক মিত্র

সম্প্রতি তৃণমূলের দলের বৈঠকে তৃণমূল সুপ্রিমো দলীয় নেতামন্ত্রীদের বার্তা দিলেন। দুর্নীতির সাথে আপস করা হবে না বলে। আমফানের ত্রাণ থেকে গরু পাচার, বালি পাচার, কয়লা পাচার নিয়ে বিরোধীরা তৃণমূলকে হেনস্থা করার চেষ্টা করেছে। এ কথা সবাইকে তিনি স্মরণ করিয়ে দিলেন। তবে বিরোধীরা শুধু যে হেনস্থা করেছে তা নয়। দুর্নীতির ঘটনায় অভিযুক্ত তাঁর দলের নেতা দেশ ছাড়া হয়েও আছে। তবু এসব ঘটনা বা এত কুৎসা সত্তেও তৃণমূল ভোটে অপ্রত্যাশিত ভালো ফল করেছে। এই ফল কি তাঁদের যে কোনো দুর্নীতিকে নস্যাত্ করে দিতে পারে ? পারে না বলেই তৃণমূল সুপ্রিমো আরো একবার মনে করিয়ে দিলেন। প্রতিবারই যখনই দুর্নীতি বা পক্ষপাতিত্ব যে প্রশ্নই এসেছে, তিনি উপদেশ দিয়েছেন সৎ থাকার জন্য। তাঁর নীতিবাক্য যে দুর্নীতি কমাতে পারে না তা প্রতিপদেই দেখা গেছে। ছোটো, বড় অনেক নেতাদের পূর্ব অবস্থা ও বর্তমান অবস্থার লাইফস্টাইল তার অনেক প্রশ্ন তুলে দিতে পারে। এ নিয়ে অনেক তর্ক হতে পারে। আবার প্রমাণের প্রশ্ন আসতে পারে। যাই আসুক, তাঁর নেতা মন্ত্রীদের নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন করতে বলুন। দুর্নীতি নেই বলে কখনো তর্কে জেতার বিষয় নয়। তাই শুধু নীতিবাক্য দিয়ে নীতিবোধ তৈরি করা যায় না। নীতিবোধ না এলে দুর্নীতি বন্ধ করা যায় না। আসলে নীতিবোধ আসে উচ্চ রাজনৈতিক ও সংস্কৃতির চর্চার মধ্য দিয়ে। সেই চর্চা তিনি কি তৈরি করতে পেরেছেন? সে প্রশ্ন নিজেকে করতে হবে আগে। তারপর সমাধানের পথ দেখাতে পারবেন। মনীষীদের কথা আউড়ালেই যেমন সংস্কৃতির চর্চা হয় না, তেমন শুধু নীতিবাক্য দিয়ে নীতিবোধ তৈরি করা যায় না। তিনি সবসময় বাংলা সংস্কৃতির কথা বলেন। আজকের ভোটপরবর্তী যে হিংসার ছবি মিডিয়ায় আসছে তা কোন সংস্কৃতি। বিরোধীদের চক্রান্ত বলে তিনি কি দোষ এড়িয়ে যেতে পারেন ? যদি বিরোধিদের চক্রান্ত হয় তাহলে মাননীয় আদালতের হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে কেন ? হিংসার খবর যদি সাজানো হয় তাহলে তিনি তার পদক্ষেপ নিচ্ছেন না কেন ? এখন তাঁর প্রশাসন। চাইলে পদক্ষেপ নেওয়া যায়। কিন্তু এই প্রশাসনে রাজনৈতিক সব হিংসা নথিভুক্ত হতে পারে না। আসলে নথিভুক্ত করার সাহসই থাকবে না কারো। গ্রামে গ্রামে বিরুদ্ধ রাজনীতির মুখ বন্ধ করার যে ছবি তা বাংলার সংস্কৃতি যদি না ধরি, তাহলে এটাই বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি বলে ধরে নিতে হব এবং তা স্বাভাবিক বলে বলতে হবে। তিনি সর্বভারতীয় বিরোধী মুখের প্রতীক বলে একটি চর্চা উঠে আসছে। কিন্তু বিরোধী রাজনীতির মুখ বন্ধ করার কৌশল বিজেপি যে পথে হাঁটছে সেই পথে তিনি না হাঁটলেও, তাঁর পথ যে অন্যরকম তা কিন্তু ওপেন সিক্রেট। সেই অন্যরকম ছবি গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় আছে। প্রশাসনের কাছে কোনো রিপোর্ট না থাকলে, তার মানে সব শান্তি আছে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু তা নয়। তবে মানুষের মনে জ্বলে তুষের আগুন। ইতিহাস বলে সে কথা। তাহলে আজকের বাংলার সংস্কৃতি কেবল নীতিবাক্য দিয়ে সংশোধন করা যাবে কি ?

আগেকার দিনে কোনো কোনো ভালো রাজা ছদ্মবেশে ঘুরে ঘুরে প্রজাদের অবস্থা দেখতে বের হতেন। কারণ, পারিষদের রিপোর্ট সব ঠিক আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতেন। এখন সে দিন নেই। মিডিয়ায় প্রচার হবে নীতিবাক্য। সব মানুষ ধন্য ধন্য করবেন। এ পর্যন্ত ঠিক থাকে। তারপর যা হবার তা হবেই। আজকের যে পথে দুর্নীতির কথা বলা হয়, আগামীতে তার পথ অন্য হবে। তিনি কি জানেন না, তার কাউন্সিলর থেকে অন্যান্যদের তাঁদের রাজনীতি জীবনে সম্পত্তির পরিমাণ কতগুণ বেড়েছে। এখন ত এটা একটা ওপেন সিক্রেট। কেউ কি অস্বীকার করতে পারেন। তাহলে শুধু শুধু নীতিবাক্যের প্রচার করে লাভ কি হবে। বামফ্রন্ট ধূলিসাত্। তাঁরা নিজেদের একটা আদর্শের পথে চলার জন্য একসময় গর্ব করত। কিন্তু সেই আদর্শ সুবিধাবাদী রাজনীতির কাছে পুরোপুরি পরাজিত। আর আজকে তৃণমূল সুপ্রিমো যাই কথা বলুন না কেন, তাঁর দলের রাজনৈতিক আদর্শ যে পথেই চলুক তা সুবিধাবাদী রাজনীতির ঊর্দ্ধে উঠতে পারে নি আর পারবেও না। যে রাজনীতিতে প্রাথমিকভাবে মানুষের জন্য কাজ হচ্ছে বলে মনে হবে, কিন্তু তাতে মানব সমাজ বলতে যা বোঝায় তার চেহারা দিনে দিনে পাল্টে যাচ্ছে। কংগ্রেস, সিপিএমের শাসন যাঁরা দেখলেন আর আজকের তৃণমূলের শাসনও দেখছেন, তাঁরা কোনো দলের সক্রিয় কর্মী বা সমর্থক না হলে ছবিটা পরিষ্কার ধরতে পারবেন। একটা জিনিস বলা যায়, গ্রামের সরল ঐক্য যা ছিল তা নোংরা সুবিধাবাদী রাজনীতির পরিমণ্ডলে আজ তার অবশিষ্ট একেবারে নেই। আজকের এই বাংলার সংস্কৃতি শুধু নীতিবাক্যে আর বদলে ফেলা সম্ভব হবে না।

এই নীতিবাক্যে তিনি আরো বলেছেন জনসংযোগ করতে। জনসংযোগ কিভাবে হবে। মানুষের পাশে থেকে। ভিআইপি সেজে নয়। কথাটা মূল্যবান। কিন্তু সেই মানুষের পাশে থেকে ক্ষমতাধর হয়ে উঠলে বিপদ ঘটে পরে। চারিদিকে পাশে থাকার নামে ক্ষমতাধরের চিত্র ফুটে ওঠে। আসলে ক্ষমতাধর হয়ে ওঠা খুব সহজ হয় শাসকদলের নেতা হলে। কিন্তু সাধারন মানুষের একজন হয়ে ওঠা কঠিন যা কোনো নীতিবাক্যে গড়ে তোলা যায় না। নিরলস মানুষের সেবার আদর্শে যা গড়ে উঠতে পারে। আর যেখানে থাকবে রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় উচ্চ হৃদয়বৃত্তির চর্চা। জানিনা তৃণমূল সুপ্রিমো কেবল তাঁর নীতিবাক্য দিয়ে সে ইতিহাস তৈরি করতে পারবেন কিনা তা সময়ই বলবে। যদিও প্রতি সঙ্কটকালে তাঁর নীতিবাক্য ভোট বৈতরণী পার করেছে, কিন্তু নেতাদের শুদ্ধিকরণ হয়নি। তাহলে কি বলা যায়, শুদ্ধিকরণের জন্য নয়, নীতিবাক্য শুধু ভোট বৈতরণী পার হওয়ার জন্য। এ অবস্থা যদি চলে তাহলে সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনার দীনতাই প্রকাশ পায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *