- আলোচনা

সফল হলে টেটে, জীবন যাবে কেটে!

পাঠক মিত্র 

টেট পরীক্ষায় পাশ করলে আজীবন তার শংসাপত্র সচল থাকবে। আগে তা সাত বছর পর্যন্ত কার্যকর ছিল। এখন কেন্দ্রীয় সরকার যুবকদের মনে ভরসা জাগিয়ে তুললেন যে একবার পাশ করলেই তার মেয়াদ আর শেষ হবে না। প্রাথমিকভাবে সকলের মনে হবে সরকার কতটা পজিটিভ তাঁর এই সিদ্ধান্তে। যে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শংসাপত্র সারা জীবনের গর্ব হয়ে থাকে। সেই গর্বকে আরও গৌরবান্বিত করে যখন তা উপযুক্ত মর্যাদা দিতে পারে। আর এই মর্যাদা মানে আমাদের সমাজব্যবস্থায় যখন শিক্ষার সঙ্গে কর্মের একটা মেলবন্ধন থাকে। নইলে বাস্তবিক একটা হতাশা তৈরি করে। এই টেট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীরা আজীবন শংসাপত্রের মেয়াদ নিয়ে যদি তার যথাযোগ্য মর্যাদা না পায় তাহলে সেই মেয়াদের যৌক্তিকতা কোথায়। শংসাপত্র নিয়ে আশা নিয়ে বসে থাকতে থাকতে যদি কার্যকর না হয়, তাহলে হতাশা কি তৈরি হবে না। বয়সের সাথে সেই হতাশা সমস্ত উদ্যোমকে নষ্ট করবে। তখন প্রতিবাদ করার মত আর মেরুদণ্ড সোজা থাকবে না। যাঁরা সরকারের এই ঘোষণায় পজিটিভিটি দেখতে পাচ্ছেন তাঁরা অনেকেই বলবেন এ ত কেবল বিরোধিতা করার জন্যই হতাশার কথা বলা। এ ছাড়া আর কিছু নয়।

যাঁরা পজিটিভিটির কথা ভাবছেন, তাঁদের বলি- আজীবন মেয়াদ কথাটার মধ্যে যে একটা অনিশ্চয়তা লুকিয়ে রাখা আছে সুকৌশলে তা কি বোঝা যাচ্ছে না। বর্তমান সময়টা বেকার সমস্যার এক জটিল সময়। মানুষ দিনের পর দিন কাজ হারাচ্ছে সংগঠিত ও অসংগঠিত দুটি ক্ষেত্রেই। সরকারি রিপোর্টেই অতিমারির আগে যা ছিল বেকারি সর্বোচ্চ পঁয়তাল্লিশ বছরে, এখন এই সংখ্যা যে দ্রুত বাড়ছে তা সব রিপোর্ট যেমন বলছে, তেমন রিপোর্ট ছাড়াও কি বোঝা যাচ্ছে না। তার ওপর নতুন নিয়োগে সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে পুরোটাই থমকে আছে। ঠিক এই অবস্থায় টেট পরীক্ষার সফল প্রার্থীদের নিয়ে এই ছেলেখেলাটা কোনও শুভ ইঙ্গিত নয়। ছেলেখেলাটা বলতে হল বলে অনেকের মনে বিদ্রোহ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা অন্ধ ভক্তের উদাহরণ তাঁদের কাছে। টেট পরীক্ষায় পাশ করার পর সাত বছরেও কাজে যোগ দেওয়ার ডাক না পেলে আজীবনে যে ডাক পাবে তার নিশ্চয়তা আছে বলে কি মনে হয়। আসলে টেট নিয়ে যে কোনও আন্দোলন যা চলছে বা ভবিষ্যতের কোনও সম্ভাবনাকে রুখে দিতেই এ সিদ্ধান্ত তা নিশ্চিত করে বলা যায়। আজীবন মেয়াদে কখনও না কখনও ডাক পাওয়ার আশা থাকবে, নিরাশা ত থাকবে না। যখন নিরাশা তৈরি হবে তখন দেখা যাবে। কিন্তু কে দেখবে ? হতাশা ছাড়া কেউ কিছু দেখতে পাবে না।

এর মধ্যে আরও কয়েকটি কথা লুকিয়ে আছে। এই যে অতিমারিতে অনলাইন ক্লাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে একটা বিশেষ শ্রেণীর সমাজ। বিশেষ শ্রেণী বলতে হল এই কারণে যে এই অনলাইন ক্লাস একশ শতাংশ ছাত্রদের জন্য সম্ভব হয়নি। যদিও তা সম্ভবও নয়। কারণটা যে আর্থ-সামাজিক তা এখানে না বললেও চলে। অনলাইন ক্লাসের জন্য শিক্ষক-ছাত্রের অনুপাত কি হবে। আর বর্তমান শূণ্যপদের সাথে তার কোনও সামঞ্জস্য থাকতে পারে কিনা তা জানা যায়নি। তাহলে অনলাইন ক্লাস ভবিষ্যতে পুরোপুরি চালু হলে শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা কিভাবে মিটবে তা কিন্তু ধোঁয়াশা। নতুন শিক্ষানীতি অনুযায়ী আর একটি কথা আছে। যে কোনও স্তরে অতিথি শিক্ষকতার ওপর জোর দেওয়া আছে। তাহলে অতিথি শিক্ষকতার ওপর ভরসা থাকলে স্থায়ী শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তার কথা আদৌ আসবে কি। তাহলে কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন শিক্ষানীতিতে অনলাইন নির্ভর ও অতিথি শিক্ষক নির্ভর পড়াশোনার ব্যবস্থার সিদ্ধান্তের সাথে টেট পরীক্ষায় সফলতার মেয়াদ আজীবন করার মধ্যে কোনও সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে কি ? নতুন শিক্ষানীতিতে আরও একটা কথা আছে। ‘গ্রুপ অফ স্কুলস’ ও ‘সেয়ারিং অফ টিচার্স’। কথা দুটোর অর্থ থেকে এই নীতিতে বলা হচ্ছে, পাঁচ থেকে দশ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে অবস্থিত স্কুলগুলোকে নিয়ে ‘স্কুল কমপ্লেক্স’ গড়া হবে। আর এক স্কুলের শিক্ষক আর এক স্কুলে গিয়ে পড়াতে পারবে। এর মধ্যে অনেক ভালো ভালো কথা আছে। সেই ভালো কথার মধ্যে খারাপ দিকটা হল যে একজন করে শিক্ষক আছে এমন স্কুলের সংখ্যা এক লাখের বেশি (2016-17 সালের হিসেবে) যার মধ্যে প্রাথমিক স্কুল আছে পঁচাশি হাজারের বেশি। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভবিষ্যতের পরিকাঠামো হলে শিক্ষক সংখ্যা নিয়ে মাথাব্যথা থাকবে এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। কারণ নীতি অনুযায়ী অতিথি শিক্ষক যে-কেউ হতে পারেন। এই যে-কেউ নিয়ে যে রাজনীতি থাকবে না, রঙ থাকবে না তা কিন্তু বলা যায় না।

তাহলে টেটে সফলতার মেয়াদ আজীবন রাখার সিদ্ধান্ত কোন দূরদর্শিতা কাজ করছে তা প্রার্থী থেকে শিক্ষক সমাজ না বুঝতে পারলে শিক্ষাক্ষেত্রের এই বিপদ মহীরুহ হয়ে গোটা সমাজকে গিলে খাবে। তাই টেটপ্রার্থীদের জন্য সরকারের এই সিদ্ধান্তে সুকুমার রায়ের “অসম্ভব নয়” ছড়ার গাধার কথা মনে পড়ছে। মনিব নিজের লম্বা নাকের ডগায় মুলো বেঁধে তার পিঠে চেপে বসে। আর সেই মুলোর গন্ধে খাওয়ার আশায় আশায় ছুটতে থাকে গাধা। চাকরি পরীক্ষায় পাশ করা ছেলেমেয়েদের নিয়ে যখন এই অবস্থা, তাও আবার শিক্ষকতার ক্ষেত্রে, তাহলে অন্যদের ক্ষেত্রে কিরকম হবে তা না উল্লেখ করলেও চলে। ভাবি শিক্ষকদের নিয়ে সরকারের এই সিদ্ধান্ত হলে তাঁদের হাতে গোটা সমাজের চিত্র কি পর্যায়ে তৈরি হবে তা ভেবে আঁতকে উঠতে হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *