আলোচনা, বিনোদন

জন্মদিনে স্মরণ করি বাঙালি প্রাণের ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ

পাভেল আমান

প্রতি বছর ২৫ শে বৈশাখ ফিরে আসে বাঙালির কাছে। সমস্ত আবেগ উচ্ছ্বাস সমস্ত অনুভূতি ঝরে পড়ে ২৫ শে বৈশাখের পুণ্য লগ্নে। ২৫ বৈশাখ যেন আপামর বাঙালির বাঁচার অণুপ্রেরণা, আত্মশ্লাঘার অবলম্বন, সর্বোপরি বাঙালি সংস্কৃতির মহীরুহ। আমরা জাতি ধর্ম নির্বিশেষে পুরোদস্তুর বাঙালি অনুভূতির টগবগাণিতে মাতোয়ারা হয়ে পালন করি রবি ঠাকুরের বর্ণময় জীবনের নানান দিক, আঙ্গিক। সারাদিন আলোচনা, কবিতা পাঠ, সঙ্গীত পরিবেশন ও তার জীবন দর্শন সাহিত্য নিয়ে চলে বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার জাগরণ। এভাবেই আমরা আমাদের প্রিয় প্রাণের ঠাকুর, কাছের মানুষ, সৃষ্টির পূজারী, বিশ্ব চরাচর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্থান দিয়েছি মননে। বাঙালি সাহিত্য সংস্কৃতি, ঐতিহ্য চেতনায় তিনি ছিলেন বটবৃক্ষের মতো দণ্ডায়মান এক অবিসাংবাদিত প্রতিভূ। আপামর বাঙালি জাতির তিনি হয়ে উঠেছিলেন চিরন্তন অভিভাবক, পথের দিশারী। বাংলা ভাষাকে পৌঁছে দিয়েছিলেন বিশ্বের আঙিনায়। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, বহুদর্শী, বিবিধ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন, মনুষ্যত্বের বার্তাবাহক, মানবতাবাদি, উদারচেতা, সম্প্রীতির রূপকার রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছিলেন আন্তর্জাতিক আইকন।

দেড়শ’ বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও বাঙালি মানসে এখনো তিনি দিবাকরের মতো সমান সমুজ্জ্বল, তাঁর কিরণ আজো চির অম্লান। বাংলা সাহিত্যের সব ধারাই তার লেখনীতে সমৃদ্ধ। বাংলা সাহিত্য ও বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে অসামান্য অবদান তার। তার হাত ধরেই বাংলা সাহিত্য পায় নতুন রূপ ও মনন। যা বয়ে আনে বিশ্ব অঙ্গনে এক বিরল সম্মান। বাংলা সাহিত্যে একমাত্র রবীন্দ্রনাথেরই একটি নিজস্ব অধ্যায় রয়েছে। যে অধ্যায় বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে এক মহান উচ্চতা। কালজয়ী এই কবি শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, ছিলেন বিশ্বসাহিত্যের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ প্রতিভাদের একজন। তাকে অভিহিত করা হয় বাংলার কবি, বাঙালির কবি। তারও অধিক তিনি ছিলেন বিশ্বচরাচরের কবি; বিশ্বকবি। রবীন্দ্রনাথের কর্মসম্ভার ছিল জীবনব্যাপী। সমগ্র জীবনই ছিল তার সৃষ্টির আধার। জীবনের প্রতিটি পর্বেই তার সাহিত্যাদর্শের সন্ধান মেলে। তার সাহিত্য দর্শনের ভিত্তি ছিল অন্তর্নিহিত জীবনবোধ; যার ভিত্তি ছিল গভীর অনুশীলন ও ক্রমাগত নিরীক্ষা; যার ভিত্তি ছিল বিশ্বচরাচরের প্রতিমুহূর্তে রূপান্তর হওয়া সাহিত্য, সংস্কৃতি, সভ্যতা, দর্শন ও জ্ঞান-বিজ্ঞান। এই পরিবর্তনকে রবীন্দ্রনাথ তার মননে স্থান দিয়েছেন। তবে তিনি ছিলেন স্থির। তার সৃজনশীলতা ছিল আপন আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত। যা তার কবিতা, গান, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্য, ভ্রমণকাহিনী, চিঠিপত্র এবং দেশে-বিদেশে দেওয়া বক্তৃতায় লক্ষণীয়। একই কারণে এগুলো কখনোই প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। এদিক থেকেই তিনি কেবল তার কালের প্রতিভা নন, তিনি কালজয়ী প্রতিভা। তিনি আজও সুখে দুঃখে, চিন্তনে ভাবনায়, স্মরণে বাঙালি মননে ছেয়ে আছেন। বাঙালি সাহিত্য, সংস্কৃতি, জাতি আবেগ, আবহমান ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। বাংলা ভাষা, সাহিত্য সংস্কৃতি কে দেশ কালের গণ্ডি পার করে আন্তর্জাতিক আঙিনায় সসম্মানে সম্মানিত করেছিলেন আমাদের সকলের প্রিয় রবীন্দ্রনাথ। এক কথায় বাঙালি চেতনা, জাগরণের যথার্থ বাতিঘর হিসেবে তিনি প্রতিভূ। আজও কবিগুরুর সাহিত্য সম্ভার গান ও কবিতা বাঙালির অনুপ্রেরণা ও নতুন আশার বাণী। বাঙালির বেঁচে থাকার চিরায়ত অবলম্বন রবীন্দ্রনাথের জীবন দর্শন ও সৃষ্টি সম্ভার। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান সবার উপরে। রবীন্দ্রনাথের সমগ্র জীবনের প্রেক্ষাপটেই তাঁর কবিমানস ও সাহিত্যকর্মের স্বরূপ অনুধাবন সম্ভব। জীবনের পর্বে পর্বে তাঁর জীবনজিজ্ঞাসা ও সাহিত্যাদর্শের পরিবর্তন ঘটেছে। যুগে যুগে পৃথিবীতে সাহিত্য, সংস্কৃতি, সভ্যতা, দর্শন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যে রূপান্তর ঘটেছে, রবীন্দ্রনাথ সবকিছুকেই আত্মস্থ করেছেন গভীর অনুশীলন, ক্রমাগত নিরীক্ষা এবং বিশ্বপরিক্রমার মধ্য দিয়ে। পরিশেষে, বাংলা সাহিত্য ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবিচ্ছেদ্য অংশ। রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে কখনও বাংলা সাহিত্য কল্পনাও করা যায় না। রবীন্দ্রচর্চার প্রতি আরও বেশি বেশি মনোনিবেশের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে আরও সমৃদ্ধিশালী করতে ভূমিকা রাখবে। সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও শুদ্ধ সাহিত্যচর্চার মাধ্যমেই কেবল অসাম্প্রদায়িক সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব। সমাজ কিংবা রাষ্ট্রীয় জীবনে ভরে উঠুক সাহিত্যের শুদ্ধতায়। জাতীয় জীবনে বয়ে আসুক সমৃদ্ধিশালী সমাজ কাঠামো। মানবিক মূল্যবোধের উন্মেষ ঘটুক, সে প্রত্যাশায়। আজ যখন সমগ্র জাতি বিমর্ষ, মৃত্যু আতঙ্ক যখন বাঙালি তথা বিশ্বের প্রতিটি মানুষের অন্তরে, তখন সেই মৃত্যুকে জয় করবার সাহসটুকুর জন্যই কবিগুরুকে দরকার। দরকার রবীন্দ্রনাথের লেখা, দর্শন, চিন্তাচেতনা, আলোকছটার ঔজ্জ্বল্য-কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার বিভিন্ন লেখায় সৃষ্টি দিয়ে মৃত্যুকে জয় করার কথা বলেছেন। মৃত্যুঞ্জয় কবিতায় তিনি লিখেছেন, যত বড়ো হও, তুমি তো মৃত্যুর চেয়ে বড়ো নও, আমি মৃত্যু-চেয়ে বড়ো এই শেষ কথা বলে, যাব আমি চলে। আরেক জায়গায় তিনি লিখেছেন, মৃত্যু দিয়ে যে প্রাণের মূল্য দিতে হয়/সে প্রাণ অমৃতলোকে/মৃত্যুকে করে জয়। তার লেখনী, চিন্তা ধারা এখনো আমাদের প্রবাহমান জীবনে বেঁচে থাকার জিয়ন কাঠি। আমরা যদি তাঁর মহৎ আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয় তাহলে বাঙ্গালীদের মধ্যে থাকবে না ধর্মীয় ভেদাভেদ, সংকীর্ণতা। তিনি শুধু সাহিত্যের আঙিনাতে বিচরণ করেন নি, তিনি তার শৃঙ্খলিত, পরিশীলিত, বৈচিত্রে ভরা সাম্যের আদর্শে পরিচালিত ভাবনা দিয়ে দেখিয়েছেন মনুষ্য জীবনের ব্যাপ্তি ওপ্রসারতা। আজ যখন চারিদিকে সাম্প্রদায়িক শক্তি তীব্র আস্ফালন, দাপাদাপি, গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষণভঙ্গুর, ঠিক সেই প্রেক্ষাপটেই রবীন্দ্রনাথ আমাদের সামনে বাড়িয়ে দিয়েছেন তার মানবতার স্মরণীয় দর্শন। তার প্রচারিত অমর বাণীতে মৃত্যুঞ্জয়ী হতেই তো, আমাদের কর্মে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। দিক্ষিত হয়েই ভয়কে জয় করতে হবে। তবেই মুছে যাবে গ্লানি, ঘুচে যাবে জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হবে ধরা। পৃথিবীতে ফিরে আসবে শান্তি, স্থিতিশীলতা সম্প্রীতির বাতাবরণ। কেটে যাবে অতিমারির সংকট কাল। তবেই রবির আলোয় উদ্ভাসিত হবে ২৫ বৈশাখ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬০তম জন্মজয়ন্তী। শিল্প-সাহিত্যে নয় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ আমাদের সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে। বাঙালির চিন্তায় চেতনায়, মননে এককথায় সমগ্রতায় উগরে এখনো তার সদর্প অবস্থান। করোনা সংক্রমনের দ্বিতীয় ঢেউয়ে মানবতা যখন চরম বিপর্যস্ত, দিশেহারা, শঙ্কিত ঠিক সেই সময়ে আমাদের সংকটের হাত থেকে বেঁচে থাকার উত্তরণ ও অবলম্বন হতে পারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আদর্শ ও জীবন দর্শন। বাঙ্গালীদের সামনে আজ অগ্নিপরীক্ষা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ঐতিহ্য, চিরায়ত ও মূল্যবোধের শেকড়কে বাঁচিয়ে রাখার। আসুন আমরা সবাই মিলেমিশে বাঙালি টানে, অনুভবে, জারিত হয়ে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ভাবনায় গেঁথে দিই সমস্ত বাঙালিত্ব। তবেই প্রাসঙ্গিকতার শীর্ষে পৌঁছাবে আমাদের রাবীন্দ্রিক ধ্যান-জ্ঞান। বাঙালি মননের চিরসাথী, অনুপ্রেরণা, সঞ্জীবনী প্রাণের ঠাকুর আমাদের ভালোবাসার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *