- আলোচনা, সমাজ ও পরিবেশ

করোনাকালে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের প্রাসঙ্গিকতা

পাভেল আমান

আমাদের চারপাশের আবহাওয়া, জলবায়ু, গাছপালা, মাটি, অন্যান্য প্রাণী, মানুষ, জৈব ও অজৈব সমস্ত কিছু নিয়েই গড়ে উঠেছে আমাদের লালিত পরিবেশ৷ পৃথিবীর পরিবেশ জীবদের বেড়ে ওঠার পক্ষে অনুকূল বলেই এই পৃথিবীতে মানুষের বসতি৷ অথচ সৌরজগতের আর কোথাও বা বিশ্বব্রহ্মান্ডের কোথাও এখন মানুষ জীবের সন্ধান পাচ্ছে না৷ হয়তো বিশ্বব্রহ্মান্ডের কোথাও না কোথাও জীবের অস্তিত্ব আছে৷ হয়তো, দূরবর্তী কোনও নক্ষত্রের সংসারে৷ যেমন এ সূর্যের সংসারে পৃথিবী— এমনি কোনও পৃথিবী আছে সেখানে হয়তো মানুষ আছে, কিন্তু এখনো আমাদের বিজ্ঞানীদের জানার গন্ডির বাইরে৷তাই গবেষণা, বিশ্লেষণে নিরিখে এখন আমরা অনায়াসে ব্যক্ত করতে পারি, এ বিপুলি বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে একমাত্র পৃথিবীর পরিবেশ মনুষ্য বসবাসপোযোগী৷ এর বাইরে মানুষের বাঁচবার, টিকে থাকার, বংশ বিস্তারের সর্বোপরি বেড়ে ওঠবার কোন অবকাশ নেই৷কিন্তু আমাদের হঠকারিতা, অপরিণামদর্শিতা, পরিকল্পনাহীনতায, অসাবধানতা, অসহিষ্ণুতা, নিদারুণ অস্থিরতা ও অবিমৃশ্যকারিতার জন্যে এই সুন্দর পৃথিবীর সুষ্ঠু পরিবেশ ক্রমশইঃ দূষিত হয়ে যাচ্ছে— মনুষ্যবাসের অনুপযোগী। ভয়াবহ পরিবেশ-দূষণের কবলে পড়ে আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ শঙ্কায় ধুঁকছে। অপেক্ষা করছে এক মহাধ্বংস। আজ জলে বিষ। বাতাসে আতঙ্ক। মাটিতে মহাত্রাস। মহাকাশে বিপদ সংকেত। বিগত কয়েক বছরে ৭৬টির বেশি প্রজাতির প্রাণী নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কয়েক’শ প্রজাতির গাছপালা বিলুপ্ত। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে। এ পরিণামে বাতাসে প্রতিবছর ২০ কোটি টন কার্বন মনোক্সাইড সঞ্চিত হচ্ছে। বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড, গ্যাসের আনুপাতিক হার ক্রমশ বাড়ছে। তার ফলে বৃষ্টির জলে অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি হচ্ছে। এই অ্যাসিড বর্ষণ অরণ্যে মহামারীর সৃষ্টি করছে। খাদ্যশস্যকে বিষাক্ত করছে। দ্রুত গতিতে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে সবুজ অরণ্য। সারা বিশ্বে বর্তমান মোট ৮০ শতাংশ হল গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অরণ্য। এর মধ্যে প্রতি মিনিটে ২০ হেক্টর কৃষিযোগ্য জমি বন্ধ্যা হয়ে গেছে। প্রতিবছর ৭০ লক্ষ হেক্টর জমি মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে। প্রতি মিনিটে ৪৫ হেক্টর উর্বর জমি বালুকাকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছর বাতাসে বিপুল পরিমাণ অক্সিজেন কমছে। বিজ্ঞানের অপব্যবহারে ভূ-প্রকৃতির ওপর অত্যাচার বাড়ছেই। শস্য রক্ষার জন্য নানা ধরনের কীটনাশক ওষুধ তৈরি ও প্রয়োগ হচ্ছে। এইসব বিপজ্জনক রাসায়নিক দ্রব্যের অনুপ্রবেশ ঘটছে মানুষের শরীরে। পরিবেশ দূষণের জন্য পৃথিবীর ৮০ শতাংশ নতুন নতুন রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। পরিবেশ দূষণ অব্যাহত থাকলে বৈজ্ঞানিকদের আশঙ্কা পৃথিবীপৃষ্টের উষ্ণতা এক-দুই ডিগ্রি বেড়ে বা কমে যেতে পারে। এর ফলে পৃথিবীর বহু জায়গা ভেসে যাবে বা প্রচণ্ড তুষারপাতে জমাট বেঁধে যাবে। বায়ুমণ্ডলের ওজোনস্তরের আয়তন ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। ফলে সূর্যের মারাত্মক অতিবেগুনি রশ্মি প্রাণিজগৎকে স্পর্শ করবে। দূষণের ফলে উদ্ভিদ ও জীবজগৎ আজ বিপন্ন। সমুদ্রে-নদীতে-জলাশয়ে মাছের সংখ্যা কমছে। মাছের নানা রোগ দেখা দিচ্ছে। এক কথায় জীবজগৎ পরিবেশ দূষণের কবলে বিপন্ন বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত।

অন্যদিকে বলা যেতে পারে যে জল, মাটি, বায়ু ছাড়া আমাদের জীবন অচল। পরিবেশের এসব উপাদান ছাড়া আমরা কিছুতেই বেঁচে থাকতে পারব না। আমাদের জীবন নুইয়ে পরবে সেই লজ্জাবতী গাছের মত। কারণ, পরিবেশের এসব উপাদানের গুরুত্ব বিশ্বের প্রতিটি মানুষের জন্য অপরিসীম। বিশ্ব পরিবেশকে টিকিয়ে রাখতে হলে সবচেয়ে জরুরি হলো, বিশ্বপরিবেশ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা। সচেতন করা পরিবেশ দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে। এ দিনটিতে শুধু বক্তৃতা বা আলোচনায় একমাত্র লক্ষ্য নয়। প্রয়োজন দিনটির গুরুত্ব উপলব্ধি করা। বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রই প্রয়োজনীয় কর্মসূচি গ্রহণ করে দিনটিকে তাৎপর্যমণ্ডিত করে তুলবে। পরিবেশদূষণ থেকে মুক্তির নতুন উপায় উদ্ভাবনে ব্রতী হবে। সেখানে শুধু সরকারই নয়, দেশের অগণিত মানুষের সমবেত প্রয়াসেই সেই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে। পরিবেশদূষণ রোধ করতে সেখানে নিরন্তর ব্যাপক, সুচিন্তিত কর্মসূচি গ্রহণ ও তা কার্যকর হচ্ছে। ভয়াবহ এই পরিবেশ দূষণের পরিপ্রেক্ষিতে, পরিবেশ দিবস উদযাপনের আহ্বান প্রকৃতপক্ষে সমবেতভাবে বিশ্ববাসীকে দূষণবিরোধী কাজে ঝাঁপিয়ে পরারই আহ্বান। এ একটি নির্দিষ্ট আচরণবিধি ও কর্মকাণ্ডে স্বপ্রণোদিত আত্মোৎসর্গের আহ্বান। যুদ্ধ নয় শান্তি , প্রকৃতির ধ্বংস নয়, তাকে শ্যামল সবুজ করে তোলা। এই হল বিশ্বদিবসের তাৎপর্য ও গুরুত্ব।

পরিবেশ রক্ষা ও পরিবেশ সচেতনতার লক্ষ্যে নানাবিধ সামাজিক প্রশাসনিক কর্মোদ্যোগ, পরিকল্পনা এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে সারা বিশ্বজুড়ে এই দিবস পালন করা হয়। আসলে ষাটের দশকে পরিবেশ দূষণ ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়নের ফলে বায়ু, জল, মাটি সবকিছুই দূষিত হয়ে উঠেছিল। তখন থেকেই পরিবেশ সচেতনতা তৈরি হয় আর সেই সচেতনতার ফসল হিসেবে আমরা পৃথিবী ও পরিবেশ বাঁচানোর লক্ষ্যে বছরে দুটি দিবস লাভ করি। একটি হল ‛বিশ্ব ধরিত্রী দিবস(Earth Day)’ যা পালিত হয় ২২শে এপ্রিলে এবং অপরটি ‛বিশ্ব পরিবেশ দিবস(World Environment Day)’ যা পালিত হয় ৫ই জুনে। এখন এই করোনা ভাইরাসের আবহে লকডাউন চলছে তাই জমায়েত করে অন্য বছরের মতো বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করতে পারব না। এবার আলোকপাত করা যাক বিশ্ব পরিবেশ দিবসের ইতিহাসে। মূল ঘটনাটি ঘটেছিল পঞ্চাশ বছরেরও আগে। সুইডেন একটি বিজ্ঞান মনস্ক দেশ। জগৎ বিখ্যাত বিজ্ঞান সংস্থা ‘রয়েল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস ‘ এখানেই অবস্থিত। তা সে দেশের সরকার ১৯৬৮ সালের ২০ মে জাতিসংঘের অর্থনীতি ও সামাজিক পরিষদের উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লিখে। চিঠিটিতে প্রকৃতি ও পরিবেশ দূষণ সম্পর্কে সুইডেন সরকার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। এই চিঠি পেয়ে সেই বছরেই জাতিসংঘ পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি তাদের সাধারণ অধিবেশনের আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে। এর কয়েক বছর পর, যে দেশটি জাতিসংঘে প্রকৃতি ও পরিবেশ দূষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে চিঠি পাঠিয়েছিল সেই সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ১৯৭২ সালের ৫ জুন থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত জাতিসংঘ মানবিক পরিবেশ সম্মেলন(United Nations Conference on the Human Environment) অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই অনুষ্ঠানটি জাতিসংঘের সমস্ত সদস্যরাষ্ট্রগুলির অনুমতি নিয়েই করা হয়েছিল। পরিবেশ রক্ষা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা এবং পরিবেশ দূষণ সহ প্রকৃতি ও পরিবেশের নানান সমস্যার সমাধান বের করার উদ্দেশ্যে এই অনুষ্ঠানটি জাতিসংঘের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠিত করা হয়। এই অনুষ্ঠান বা সম্মেলনটি বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম পরিবেশ-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৭৩ সালে উল্লেখিত সম্মেলনের প্রথম দিন অর্থাৎ ৫ই জুনকে জাতিসংঘ ‛বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। এর এক বছর পর অর্থাৎ ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতি বছর এই দিবসটি সারা বিশ্বজুড়ে ‛বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। প্রতিবছরই এই দিবসটি আলাদা আলাদা শহরে আলাদা আলাদা প্রতিপাদ্য বিষয় বা থিম নিয়ে পালন করা হয়। যেমন ১৯৭৪ সালের প্রথম বিশ্ব পরিবেশ দিবস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের স্পোকেন শহরে পালিত হয় যার থিম ছিল ‛Only One Earth during Expo ’74’। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৭৫ সালে ‛Human Settlements’ থিম নিয়ে এই দিবসটি পালন করা হয় বাংলাদেশের ঢাকায়। এভাবেই, ২০১৮ সালে ‛Beat Plastic Pollution’ থিম নিয়ে আমাদের দেশের রাজধানী নিউ দিল্লিতে ও গতবছর ২০১৯ সালে চীন দেশে ‛Air Pollution’ থিম নিয়ে বিশ্ব পরিবেশ দিবস অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবছর, কোভিড-১৯-এর আবহে এই দিবস সেভাবে পালন করা সম্ভবপর হয়নি। এই ছিল বিশ্ব পরিবেশ দিবসের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। প্রকৃতি আমাদের জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা হয়তো অনেকেই করোনা অতিমারীর পর কিছুটা বুঝতে পেরেছি। কিন্তু পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে বহু বছর ধরে। তাও এখন অনেকেই জেনে বুঝে এড়িয়ে চলেন সেই সচেতন বার্তা। অতিমারির দ্বিতীয় তরঙ্গতে যখন চারিদিকে আবারো মনুষ্য সমাজের দুর্বিষহ বিপর্যয়ের বিধ্বংসী ছবি প্রতিভাত তখন ভাবতে অবাক লাগে আমরা শ্রেষ্ঠ জীব হয়েও আর কতদিন পরিবেশের প্রতি উদাসীন, অমনোযোগী, দায়িত্বজ্ঞানহীন, খামখেয়ালী আচরণ করতে থাকবো। প্রকৃতি মানে শুধু বৃক্ষ বা অরণ্য নয়, মানুষও এ প্রকৃতির অংশ। সবাই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। একে অপরকে বাঁচতে, বাঁচাতে সাহায্য করে। এই বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবসের থিম ‘বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার করা’। বর্তমান অন্ধকারময় পরিস্থিতিতে অতীতকে ফেরানো সম্ভব নয় ঠিকই। কিন্তু আমড়া গাছ লাগাতে পারি, আমাদের আশেপাশের শহরকে আরও সবুজ করতে পারি,বাড়ির বাগান পুনর্নির্মাণ করতে পারি, নিজেদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে পারি এবং নদী ও উপকূল পরিষ্কার রাখতে পারি। আমরা এমন একটি প্রজন্ম যারা এই সবের মাধ্যমে প্রকৃতির শান্তি বজায় রাখতে পারি। আর সেই জন্যেই এবছর এই থিমটি বেছে নেওয়া হয়েছে। আসন্ন বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমরা আমাদের চিরসবুজ সুন্দর বাসযোগ্য পৃথিবীকে অমলিন, সুস্থতায় ভরিয়ে তুলতে, জীববৈচিত্রের ভারসাম্য অটুট রাখতে, সর্বোপরি বিধ্বংসী দূষণের হাত থেকে পরিবেশের সজীবতাকে রক্ষা করতে অবশ্যই জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবতার ঐক্যে আবদ্ধ হয়ে। শুধুমাত্র ফি বছর আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করলেই হবে না পরিবেশের সর্বজনীন গুরুত্ব, প্রাসঙ্গিকতা উপলব্ধি করে এই করোনার অতিমারিতে আমাদের মনুষ্যত্বের বোধোদয়ে বিশ্ব মানব জাতির স্বার্থে বাঁচাতে হবে পরিবেশের চিরায়ত শাশ্বত উপাদানগুলিকে। শতাব্দীর প্রাণঘাতী অদৃশ্য ভাইরাসে যখন মানব সমাজ বিপর্যয়ের কবলে, ভেঙ্গে যাচ্ছে জীবনের স্থিতিশীলতা ঠিক সেই মুহুর্তে আমাদের প্রাণের স্পন্দন, জীবনধারাকে গতিশীল, ছন্দময়, প্রাণবন্ত, বিকশিত করে তুলতে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যকে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে উপলব্ধি করে পরিবেশের প্রতি নিজেদের দায় বদ্ধতায় যথেষ্ট মানবিক হতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *