আলোচনা, রাজনীতি

রাজনীতির সেকাল একাল

ওহিদ রেহমান

‘Man is by nature a political animal’ খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে এই শব্দবন্ধ লিখেছিলেন অ্যারিস্টটল তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “The Politics (Vol.1)” এর পাতায়। মূলত তিনি সেখানে বলতে চেয়েছিলেন, মানুষের রাজনৈতিক সংযোগ অতীব স্বাভাবিক এবং প্রায় অবশ্যম্ভাবী একটি বিষয়। আজ একবিংশ শতকে সেই বৌদ্ধিক বিশ্লেষণ একইরকম প্রাসঙ্গিক। রাজনীতি আজ সর্বত্র। উৎসব, উপহার নিত্য প্রয়োজনে, আজ রাজনীতি হাজির আপনার, আমার পাশবালিশ হয়ে। ভোটবাবুদের টাইমিং বিরাট কোহলির কভার ড্রাইভের থেকে কোন অংশে কম যায় না। আর রাজনীতির ইস্যু যদি হয় রুটি, কাপড়, তাহলে তো তথাকথিত রাজনীতির কারবারিদের টিআরপি চড়ে চড়চড়িয়ে। তাই তো, শুক্রবার বক্স অফিসে নতুন ছায়াছবি মুক্তির মতোই আমাদের সংসদীয় রাজনীতির আঙিনায় আত্মপ্রকাশ ঘটছে নতুন নতুন রাজনৈতিক দলের। এই মুহূর্তে দেশে নির্বাচন কমিশনে নথিভুক্ত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা প্রায় ২৬০০। জাতীয় দল ৮, প্রাদেশিক দল ৫৩। এছাড়াও, আপনার, আমার নেক নজর এড়িয়েও জাতির সেবায় নিবেদিত প্রাণ হয়ে রয়েছে ২৫০০ এর অধিক রাজনৈতিক দল। আমার বিশ্বাস, এই তথ্য আপনাকে অবাক করেনি। কারন, আপনি মহাশয়, সব সহ্য করার ক্ষমতা রাখেন।

আসুন, এবার একটু রাজনীতির রিং-এ ঢুঁ মারা যাক। গণতন্ত্র ও সামাজিক ব্যবস্হাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম রাজনীতি। এর চর্চা বিস্তৃত ও বিবিধ। বর্তমানে ক্ষুদ্র গোষ্ঠী থেকে আন্তর্জাতিক আঙিনা, রাজনীতি রাজ করছে রাজকীয় ভাবে। এই প্রক্রিয়ার মূল অংশীদার সরকার, রাজনৈতিক দল এবং জনগণ। রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সরকার যেন আদ্যোপান্ত অধিনায়ক। সে নজর রাখে জনগণের বিবিধ চাহিদার উপর। জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা থেকে রাষ্ট্রের নীতিমালা নির্ধারণ, সর্বত্রই সরকার পালন করে অভিভাবকের ভুমিকা। আসুন, রাজনীতি নিয়ে বিশিষ্টজনদের মতামতে একটু চোখ বুলিয়ে নিই। ১৯১৯ সালের জানুয়ারি মাসে, বিশিষ্ট সমাজ বিজ্ঞানী ও দার্শনিক ম্যাক্স ওয়েবার বলেছিলেন, রাজনীতি একটি ভিন্ন ধরনের কার্যপ্রক্রিয়া, যার নিজস্ব নিষ্ঠুর নিয়মকানুন আছে। রাজনৈতিক দলে নেতা ও দলীয় অভিজাতদের মধ্যে একধরনের ‘ক্ষমতার দ্বন্দ্ব’ চলতে থাকে অবিরাম। যাঁরাই রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন, তাঁরাই একটি ‘অতি মন্দ ঘরানার ক্ষমতার’ সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। রাজনীতিবিদদের দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো কোনও কর্তৃপক্ষ থাকে না এবং রাজনীতিতে থেকে কারও পক্ষে নিখাদ পবিত্র থাকা সম্ভব নয়। অন্যদিকে, বার্নার্ড ক্রিকের মতে, “রাজনীতি হল নীতিমালার একটি স্বতন্ত্র রূপ, যার দ্বারা মানুষ নিজেদের পার্থক্য মিটিয়ে ফেলার জন্য, বৈচিত্রময় আগ্রহ ও মূল্যবোধ উপভোগ করার জন্য এবং সাধারণ প্রয়োজনের বিষয় পরিচালনায় সরকারি নীতি তৈরির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মিলেমিশে কাজ করে”। বামপন্থী ভ্লাদিমির লেনিনের মতে, “রাজনীতি হল অর্থনীতির সবচেয়ে ঘণীভূত বহিঃপ্রকাশ”। আমাদের দেশে বিভিন্ন ভাবধারার রাজনৈতিক দল পরিলক্ষিত হয়। স্বাভাবিকভাবেই, তাদের কর্মসূচীর মধ্যে ভিন্নতা স্পষ্টতই প্রতীয়মান। মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আর্থ-সামাজিক স্হিতাবস্হা বজায় রাখার প্রবনতা যেমন রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে বৈপ্লবিক ধারণার পৃষ্ঠপোষক বামপন্থী কিছু দল। এই বৈচিত্র্যের ফলেই রাজনৈতিক তরজায় থাকে ভিন্ন ভিন্ন বুলি। কেউ বলে গনতান্ত্রিক উদারবাদের কথা। আবার কেউ পক্ষ নেয়, নব্য উদারনীতির। আবার কেউ দুমড়ে মুচড়ে উপড়ে ফেলতে চায় সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা।

রাজনীতির তাত্ত্বিক আলোচনা থেকে বেরিয়ে এসে, আসুন এবার একটু চোখ রাখা যাক এই সময়ের ‘নব্য’ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে। রাজনীতির ‘নীতি’-তে এখন Everything is fair for sake of Power. প্রাক নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে আহ্লাদে গদগদ জনতার, নির্বাচন-উত্তর সময় কাটে আক্ষেপের ‘জাবর’ কেটে।
গগনচুম্বী ব্যক্তিস্বার্থে হাবুডুবু নেতার কাছে, আমজনতার আবেগ খায় না মাথায় দেয় (!), বোঝা বড়ই দুস্কর। এসময়ের রাজনীতিতে দলত্যাগ বিষয়টি যেন একটা ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। এ যেন রাজনীতি নয়, নতুন নতুন কর্পোরেট হাউসে মোটা মাস মাইনের চাকরি। ১৯৬৭ পরবর্তী ভারতবর্ষের রাজনীতিতে, এই জার্সি বদল এক নতুন পরিভাষা প্রচলন করে, ‘আয়ারাম-গায়ারাম’। বর্তমানে, চায়ের পেয়ালায় তুফান তোলে ‘Horse-Trading’ শব্দবন্ধ। লাখ লাখ টাকার লগ্নি হচ্ছে নির্বাচিত সাংসদ, বিধায়কদের দল ভাঙ্গানোর জন্য। জননেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ (১৯০২-১৯৭৯) একদা বলেছিলেন, “Defection are a fraud upon the electorate”। অথচ, দেশের সংবিধানের ৫২তম সংশোধনীর মধ্য দিয়ে ১৯৮৫ সালের ১লা মার্চ সর্বসম্মতিক্রমে দলত্যাগ-বিরোধী আইন সংসদে পাস হয়েছে। হ্যাঁ, ওইটুকুই। দেশসেবার বুলি আউড়িয়ে (আদতে ব্যক্তিস্বার্থ) রং বদলের এই রাজনীতির চর্চা এই দেশে সুবিদিত। আচার্য কৃপালনী থেকে চরণ সিং, অজয় মুখার্জী থেকে ভজনলাল এই তালিকায় নাম চলে আসবে প্রবাদপ্রতিম পোড়খাওয়া রাজনৈতিক চরিত্রের। একসময় মোরারজি দেশাই, কে কামরাজদের সঙ্গে মনমালিন্যের জেরে দল ত্যাগ করেন স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধী। পথচলা শুরু হয় ইন্দিরা (কং) দলের।

অন্যদিকে, এই সময়ের রাজনীতিতে, নির্বাচনের বুনিয়াদি ইস্যুগুলো প্রতিনিয়ত অদ্ভুতভাবে হোঁচট খাচ্ছে। জনগণের বুনিয়াদি ইস্যু ‘রোটি, কাপড়া অউর মাকান’ আজ ধর্মীয় স্লোগানের বাউন্সারে হিমঘরে সমাহিত। সদ্য সমাপ্ত, এই বঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে আমরা তা আবার চাক্ষুস করলাম। অথচ, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য বৃদ্ধি, আজ দেশের সিংহভাগ মানুষের যাপিত জীবনে হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। রান্নার গ্যাস থেকে ভোজ্যতেল, কাঁচা শাক-সব্জি থেকে ডাল জাতীয় শস্য, আমাদের প্রকাশ্যে ছ্যাঁকা দিচ্ছে নিত্যদিন। করোনাকালে, দেশের যাতায়াতের ‘লাইফ লাইন’ ট্রেন পরিসেবা বন্ধ। সেই সুযোগে, গণপরিবহনের যাত্রীভাড়া বাঁধনহারা। আর, এসব নিয়ে প্রশ্ন করলেই ধেয়ে আসে ‘অ্যান্টি ন্যাশনাল’ গোলা। অদ্ভুতভাবে, আমাদের এই আহাজারি ভোট বাক্সে প্রভাব ফেলছে না। ধর্মের মোহে বু্ঁদ হয়ে রয়েছে আমজনতা। দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল সুকৌশলে এই দ্বেষের পাঠ দিয়ে চলছে জনমানসে এবং তাঁরা তাঁদের স্বীয় উদ্দেশ্যে সফল। তাই একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতির দায়ভার কিছুটা হলেও জনগণের উপর বর্তায় বৈকি। বর্তমানে, দেশের শাসক দল ‘সরকার এবং দেশ’কে সমর্থক রূপে প্রতিপন্ন করতে প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আদতে বিষয়টি ‘ভাবের ঘরে চুরি’। সঙ্গত কারণেই, বিভিন্ন মঞ্চ থেকে সরকার বিরোধী প্রশ্ন উঠলেই দেগে দেওয়া হচ্ছে ‘দেশ বিরোধী তকমা’। তাই, দেশের স্বার্থে জনগণের রাজনৈতিক বোধের বিকাশ আজ অতীব জরুরী। রাজনৈতিক ব্যবস্থার কৌশলগত ব্যবহার জনজীবনে ফল্গু ধারা বয়ে আনতে পারে। তাই, রাজনৈতিক সচেতন জনতার প্রার্থনা, রাজনীতি ফিরে পাক তার হৃত গৌরব, শিষ্টাচার এবং বুনিয়াদি ইস্যু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *