দুর্গাপুজো নয়, লক্ষ্মীপুজোর সময় বাড়ি ফেরেন ঘরের ছেলেরা

পিয়া গুপ্তা চক্রবর্তী: দুর্গাপুজো নয়, লক্ষ্মীপুজোর সময়ই বাড়িতে ফেরেন ঘরের ছেলেরা। এলাকার বাসিন্দাদের অনেক আত্মীয়-পরিজনই লক্ষ্মীপুজোর সময়ে টেনহরিতে আসেন পুজো ও মেলার টানে। এবার কিন্তু অনেকেই ফিরতে পারছেন না বাড়িতে। বাইরে থেকে আত্মীয়দের আসতে মানা করে দিচ্ছেন বাসিন্দারাই। প্রতিবছরই লক্ষ্মীপুজো অত্যন্ত ধুমধাম করে পালিত হয় রায়গঞ্জ ব্লকের মারাইকুড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের টেনহরি গ্রামে। তবে এবছর করোনা আবহে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের পকেটে ব্যাপক টান পড়েছে। তাই পুজোর বাজেটেও অনেকটাই কাটছাঁট করা হয়েছে। তবুও নিজেদের সাধ্যমত বাড়ি বাড়ি লক্ষ্মীপুজোর আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে। আর টেনহরির লক্ষ্মীপুজোর মূল আকর্ষণ হল লক্ষ্মী প্রতিমা নিয়ে মেলা। এবার করোনা অতিমারীর প্রভাব পড়েছে সেই মেলাতেই। এবছর লক্ষ্মীপুজো উপলক্ষে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী মেলা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে টেনহরি বারোয়ারি পুজো কমিটি।

বৃহস্পতিবার এলাকায় গিয়ে দেখা গেল,গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই সাজো সাজো রব। বাড়ির নিকোনো উঠানে পুজোর প্রস্তুতি ও ছোট ছোট মণ্ডপ তৈরির কাজ চলছে। চলছে লক্ষ্মী প্রতিমা তৈরির শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। বাড়ির মণ্ডপ সাফসুতরো করার কাজে হাত লাগিয়েছেন পরিবারের মহিলা-পুরুষ, সকলেই। এলাকার বহু পুরনো বাসিন্দা দাস পরিবারের গৃহবধূ জ্যোৎস্না দাস বলেন, বিয়ে করে আমি এই গ্রামে এসেছি প্রায় ৪৫ বছর হতে চলল। তখন থেকেই দেখে আসছি, অত্যন্ত ধুমধাম করে এখানে লক্ষ্মীপুজোতে শামিল হন এলাকার আপামর মানুষ। আমার শ্বশুরমশাই, স্বর্গীয় সুধন্যচন্দ্র দাস আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে এই প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় লক্ষ্মীপুজোর সূচনা করেছিলেন। তিনি ওপার বাংলায় ঢাকা জেলার সমরসিং এলাকার মানুষ ছিলেন। শুনেছি, সেখানেও বড় করে পুজোর আয়োজন হতো। এদেশে আসার পর এই এলাকার প্রত্যেকটি গরীব মানুষের ঘরে যাতে সম্পদ আসে, সেই কামনায় লক্ষ্মীপুজোর আয়োজন করেছিলেন তিনি।

এলাকার অশীতিপর বৃদ্ধা বিমলরানি দাস বলেন, আমাদের এখানে লক্ষ্মী মায়ের সঙ্গে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারায়ণেরও পুজো করা হয়। লক্ষ্মী-নারায়ণের পাশে জয়া ও বিজয়ার উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যায়। বিকেল বেলায় প্রতিটি বাড়ির লক্ষ্মী প্রতিমা টেনহরি ময়দানে এনে রাখা হয়। সেখানে বিশাল মেলার আয়োজন করা হয়। পোড়ানো হয় বাজি-পটকাও।

এবছর অবশ্য সেসব কিছুই হচ্ছে না। টেনহরি বারোয়ারি পুজো কমিটির সদস্য বকুলচন্দ্র দাস বলেন, করোনার সংক্রমণ রুখতে এবার গ্রাম পঞ্চায়েতের তরফে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে মেলার আয়োজন করা যাবে না। আমরাও তা মেনে চলছি।
রায়গঞ্জ ব্লকের বর্ধিষ্ণু গ্রাম টেনহরির পুজো এতটাই খ্যাতি অর্জন করেছে যে, শুধু রায়গঞ্জ শহর নয়, মালদহ থেকে শুরু করে দক্ষিণ দিনাজপুর এমনকি বিহারেরও প্রচুর মানুষ এখানে প্রতিবছরই লক্ষ্মীপুজোর উৎসব দেখতে আসেন। কিন্তু এবছর স্থানীয় গ্রামবাসীদের আত্মীয়-পরিজনরাও কেউ এখানে আসছেন না করোনার কারণে। তাই এবছর অনেকটাই জৌলুসহীন হয়ে পড়েছে পুজো। এলাকার বাসিন্দা কলেজ ছাত্রী পায়েল দাস, প্রিয়াঙ্কা দাসরা বলেন, দুর্গাপুজো নয়, আমাদের গ্রামের সবচেয়ে বড় উৎসব এই লক্ষীপুজো। প্রতিবছর আমাদের স্কুল কলেজের বন্ধু-বান্ধবীরা গ্রামে পুজো দেখতে আসে। কিন্তু এ বছর তাদের আমরা আসতে মানা করে দিয়েছি।

সাতসকাল ফিচার
সাতসকাল ই-পেপার
সাতসকাল নিউজ
error: Content is protected !!