- আলোচনা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

মিউকরমাইকোসিস ও তার দমন

শুভজিৎ বসাক

বর্তমানে মিউকরমাইকোসিস রোগ যেটাকে নিয়ে এখন ত্রাহিমাম উঠেছে সেই রোগটার বিষয়ে একটু আলোকপাত করে এর আকৃতি ও পরিসর সম্পর্কে জানা গেলে বোধহয় সবচেয়ে ভাল হয়। সানফ্রান্সিসকোতে এক মিলিয়ন (১২ লক্ষ) জনসংখ্যার মধ্যে ২ জনেরও কম মানুষ আক্রান্ত হয় মিউকরমাইকোসিস রোগে আক্রান্ত হয়। ভারতে সেখানে ০.১০ জন মানুষ প্রতি ১০০০জনে আক্রান্ত হয় মিউকরমাইকোসিস রোগে আক্রান্ত হয় যার মূল কারণ স্যাঁতস্যাঁতে বসবাসের পরিবেশ। ১৮৫৫ সালে প্রথম এই রোগের আবিষ্কার হয়। পরে ১৮৮৫ সালে জার্মান চিকিৎসক খরগোসের দেহে এই ছত্রাক প্রবেশ করিয়ে জানতে পারেন এর দুটো প্রজাতি যথা- Mucor corymbifera (যা স্নায়ুতন্ত্র, অন্ত্রকে আক্রান্ত করে) এবং Mucor rhyzopodiformis (ধানজাতীয় শস্যকে আক্রান্ত করে)। 1885সালে বিজ্ঞানী আর্নল্ড প্যালটফ একে “Mycosis Mucronia” নাম দেন। পরে অবশ্য দেখা যায় যে রোগটা সাইন্যাস ট্র্যাক্টের মাধ্যমে মস্তিষ্ক হয়ে অন্ত্রে গিয়ে বিস্তার লাভ করে তাই নাম বদল করে রাখা হয় “Mucormycosis”। এটি Aspargillas নাম ছত্রাক সংক্রমণের পরেই পর্যায়ভুক্ত হয়। এটির রোগ বিস্তার ক্ষমতা নিস্তব্ধে হয়। এর আণুবীক্ষণিক আকার সুতোর মত দেখতে যাদের “mucorales” বলা হয়। এদের মাথাটা গোল আর দেহ সরু হয়ে আলপিনের মত দেখতে হয় যাকে “zygomecetes” গ্রুপের পর্যায়ভুক্ত করা হয় অর্থাৎ সরু দেহটা লম্বা হয়। এরা ক্ষতস্থান বা নাক দিয়ে দেহে প্রবেশ করে এই লম্বা দেহাকৃতি দিয়ে রক্তনালিকাগুলো বেঁধে ফেলে যাতে প্রথমে কোনও উপসর্গ থাকে না। পরে এই নালিকাগুলোকে নষ্ট করে ফেলে। এভাবে রোগটা নিঃস্তব্ধে বাসা গড়ে।

রোগটা বর্তমানে ভারতে কিছুটা ছড়িয়ে পড়েছে তার মূল কারণ আদ্র অক্সিজেন, অ্যান্টিবায়োটিকের বেশী ব্যবহার। আমাদের নাক, থুথু, অন্ত্র ইত্যাদিতে বেশ কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে যা বাইরে থেকে প্রবেশ করা জীবাণু ও ছত্রাককে মারতে সক্ষম। অথচ কোভিডের মুহূর্তে এগুলির বহুল ব্যবহারে এই ব্যাকটেরিয়াগুলি মারা যায়। মিউকরমাইকোসিস নাকের মাধ্যমে আগেও দেহে প্রবেশ করেছে তবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলির জন্য। তবে এবারে তার অভাবে এরা নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ছে। তবে দ্রুত এর চিকিৎসা শুরু হলে লম্বা দেহাকৃতিগুলির কার্যক্ষমতা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। মানুষ সুস্থ হয়। এছাড়াও হাইপারব্যারিক অক্সিজেন প্রবাহে দেহে নিউট্রোফিল বেড়ে এই ছত্রাকঘটিত রোগকে ধ্বংস করে।

কেন এই ছত্রাকের প্রাদুর্ভাব তা যদি পর্যালোচনা করা যায় তা এরকম হতে পারে-

১) যে রোগী বহুদিন আদ্র অক্সিজেন, স্টেরয়েড পেয়েছে তার নিজস্ব দৈহিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে আক্রান্ত হতে পারে।

২) একই মাস্কের দীর্ঘদিন ব্যবহারকে মিউকরমাইকোসিসের আদর্শ আঁতুড়ঘর হিসাবে গণ্য করা যেতে পারে।

৩) মানুষের মধ্যে কোভিড নিয়ে ভীতি এসেছে যে হাসপাতালে ভর্তি না হলে ভালো হওয়া অসম্ভব। এর জেরে সে নামী-বেনামী যে হাসপাতালে চাপ বাড়ে। হাসপাতালে বিভিন্ন রোগের স্ট্রেন পাওয়া যায় যার ফলে দৈহিক প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি মিউকরমাইকোসিসের উৎকর্ষ জারণ ঘটাতে সক্ষম।

৪) মেডিকেল অক্সিজেন সিলিন্ডার খালি হয়ে গেলে তৎক্ষণাৎ সিলিন্ডার বদল করতে হবে তা না হলে মেডিকেল অক্সিজেনের অভাবে কেবল হাওয়া শ্বাসনালিতে ঢুকবে যার মধ্যে মিউকরমাইকোসিস ছত্রাকও থাকে। এছাড়াও সাধারণতঃ আমরা বাতাসে অক্সিজেন নেওয়ার সাথে নাইট্রোজেন, হাইড্রোজেনের মত গ্যাসগুলোও গ্রহণ করি যা শ্বাসপ্রক্রিয়ার ব্যাপনে ভীষণ জরুরী। অথচ মেডিকেল অক্সিজেন তার ঘাটতি মেটায় না তাই বিভিন্ন উপসর্গ এর জন্য দায়ী। তাই বারবার বলা হয় যে শুধু অক্সিজেন দেহের জন্য বিষ একপ্রকার।

৫) বাণিজ্যিক অক্সিজেন এই কোভিডে ব্যবহার হলেও তা প্রয়োগ না করাই ভাল কারণ আমাদের দেহের জন্য এই অক্সিজেন বিষ একপ্রকার এবং এই ছত্রাক বিস্তারের উৎকৃষ্ট মাধ্যম। এছাড়াও বাণিজ্যিক অক্সিজেন প্রস্তুতকারকদের FDA কর্তৃক নিয়ম মেনে অক্সিজেন তৈরি করতে নির্দেশ দেওয়া হোক কারণ এই সিলিন্ডারগুলি Sterility বা জীবাণুনাশক পদ্ধতি না মেনেই বহন করা ও ভর্তি করা হয় যা রোগীর জন্য ক্ষতিকারক। সবচেয়ে বড় কথা বাণিজ্যিক অক্সিজেনের জন্য তৈলাক্ত একটা চেম্বার ব্যবহৃত হয় যার জেরে বাণিজ্যিক স্তরে কাজে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব তবে ঐ তৈলাক্ত চেম্বার স্বাস্থ্যক্ষেত্রে অপকারী বস্তু।

৬) হাসপাতালে অক্সিজেন চেম্বার থেকে তা পাইপলাইনে প্রবাহ হতে শুকনো থাকে। অক্সিজেন চেম্বারের বাইরে বরফ জমে তা ভাঙ্গাটা প্রয়োজনীয় কারণ এতে বাইরের আদ্রতা এতে মেশে না যা অবিকৃত অবস্থায় দেহে প্রবেশ করলে শুষ্ক অক্সিজেন মিউকাসের ক্ষতি করে যা মিউকরমাইকোসিসের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। অতএব এই বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি দিতেই হবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষদের।

৭) এছাড়াও স্যাঁতস্যাঁতে, সূর্যের আলো প্রবেশে নিষিদ্ধ ঘর, ভেজা মাটি, গোবর মিউকরমাইকোসিসের বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে।

অতএব রোগটা আগেও ছিল কিন্তু তার থেকে নিজস্ব দৈহিক প্রতিরোধক ক্ষমতা বাঁচিয়ে দিয়েছে তবে এখন সেটা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত নিজেদের ভুলেই এবং তাকে শুধরে নিলে এই মিউকরমাইকোসিসের প্রাদুর্ভাব নষ্ট হবে। এর আগে ২০০৪ সালে সুনামী ও ২০১১ সালে আমেরিকায় টর্নেডোর পরে এই রোগ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হলেও সঠিক সচেতনতা এর গতিকে রুদ্ধ করেছিল। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক ঘটনা হল ভারত ৮৫ শতাংশ ক্ষমতাশালী এই মিউকরমাইকোসিসের বৃদ্ধি রুখতে তাই একে নিয়ে অযাচিত ভয়ের কারণ নেই। চিকিৎসকদের কথা মতো চলুন, তাদের ওপর বিশ্বাস রাখুন তবেই দেখা যাবে কোভিড যেমন নিঃশেষ হচ্ছে একে আরও দ্রুত নিঃশেষ করা সম্ভব হবে। গুজব ও অবৈজ্ঞানিক কথায় এই বিষয়ে কান দেবেন না। এই রোগ ছোঁয়াচে নয়। সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, ভালো রাখুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *