- আলোচনা, সমাজ ও পরিবেশ

সামনে তো বহু পথ পড়ে ছিল

সৌরভ দত্ত

ধরা যাক, এবছরের একজন মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী মাধ্যমিক পরীক্ষা বাতিলের ঐতিহাসিক তথা নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত শুনে নিজের বাড়িতে রুদ্ধদ্বার কক্ষে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। বলাবাহুল্য, এলাকায় তথা স্কুলে মেধাবী বলে সুপরিচিত ছিল সে। এলাকায় রীতিমতো শোকের ছায়া। ঐ বাড়ি ঘিরে কোভিডের আবহেও শোকসন্তপ্ত মানুষের ভিড়। অসহায় মা-বাবাকে সামলানোই দায়। ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে তাঁদের বুকফাটা আর্তনাদ।

এমন কোনও খবর আপনি সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক মাধ্যমের দৌলতে এরমধ্যে শুনেছেন কি? একটুখানি কান পাতুন, চোখকান খোলা রাখুন, নিশ্চয়ই শুনতে পাবেন। যদি সত্যিই এমনটা শুনে থাকেন, শোনামাত্রই আপনি খুব ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন নিশ্চয়ই? ব্যাকুল হওয়ারই তো কথা। মেধাবী ছাত্র বা ছাত্রীর এই মর্মান্তিক পরিণতি শোনার পর আপনার ব্যাকুল হয়ে ওঠার মধ্যে তো বিন্দুমাত্র অস্বাভাবিকতা নেই। সত্যিই তো, কত স্বপ্ন দেখেছিল সে! মেধাতালিকায় তার নাম থাকবে। টিভিতে ব্রেকিং নিউজে তার নাম জ্বলজ্বল করবে। সংবাদমাধ্যম ঝাঁপিয়ে পড়ে তার কাছে জানতে চাইবে তার এমন মাথা ঘুরিয়ে দেয়া সাফল্যের রসায়ন। ফলাফল ঘোষণার পরমুহূর্ত থেকে সারাদিন ধরে ঘুরিয়েফিরিয়ে টিভির পর্দা জুড়ে দৃশ্যায়িত হবে তার সাক্ষাৎকার। তার বাড়ির খবরাখবর জানবে সবাই। তার মা-বাবার কথা, তার শৈশব থেকে বেড়ে ওঠার কাহিনী, তার শখ-আহ্লাদ, কী খেতে সে ভালোবাসে, কোন কার্টুন চরিত্র তার প্রিয়, আইপিএল সে দেখে কিনা, নেটফ্লিক্স সে করে কিনা, সবকিছু নিয়ে সচিত্র খবর বেরোবে পরদিনের কাগজের পাতা জুড়ে। এতসব প্রাপ্তিসুখে রীতিমতো উল্লসিত হতে পারত সে। অথচ এতকিছুর বদলে গোটা পরীক্ষাটাই কিনা বাতিল। কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি সে। তাই স্বপ্নভঙ্গের একরাশ মানসিক যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে সে এই জীবনে বেঁচে থাকাটাই অর্থহীন মনে করেছে। অতএব নিজেকে শেষ করে দেয়া ছাড়া ঐ মুহূর্তে আর কিছুই মাথায় আসেনি তার।

সে ভুলে গিয়েছিল অনেক কিছু। সে ভুলে গিয়েছিল, দেড়-দুবছরের ব্যবধানে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা হয়তো পরীক্ষার মতো করেই হবে, যাতে মেধাতালিকায় থাকবার একটি সু্যোগ সে পেতে পারত। সে ভুলে গিয়েছিল, পছন্দের বিষয় নিয়ে দাপিয়ে সে পড়াশোনা করতে পারত কলেজজীবনের তিনটি বা চারটি বছর। সে ভুলে গিয়েছিল, কলেজ শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা হোক, বা অন্য কোনও পেশাদার কোর্স, তাতে জমিয়ে পড়াশোনা করে তাক লাগানো ফলাফল তাতেও করতে পারত সে। সে ভুলে গিয়েছিল, মেধা, যোগ্যতা, বুদ্ধিমত্তা, নিষ্ঠা ও ক্রমবর্ধমান অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে খুব সুন্দর একটি পেশাদার জীবন অতিবাহিত করতে পারত সে। সর্বোপরি, আপেক্ষিক সাফল্য বা ব্যর্থতার চুলচেরা বিশ্লেষণ একদিকে সরিয়ে রেখে, সে ভুলে গিয়েছিল কোনও এক মহাপুরুষের অমৃতকথা, ‘মরিতে চাহি না এই সুন্দর ভূবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।’

এবারে একটু অন্য ভাবে ভাবুন তো। ধরা যাক, মাধ্যমিক পরীক্ষা বাতিল হয়নি। এরপর নির্ধারিত সূচী মেনে যথাসময়ে পরীক্ষা সুসম্পন্ন হলো পরীক্ষার মতো করে। লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়েদের মতো সে-ও পরীক্ষা দিল। পরীক্ষার পর প্রশ্নপত্র মিলিয়ে মিলিয়ে সে হিসেব করে চললো কোন কোন বিষয়ে কতটুকু করে নম্বর কাটা যাবে, বা বিশেষ কোনও একটি বা একাধিক বিষয়ে আদৌ কোনও নম্বর কাটা যাবে কিনা। সব মিলিয়ে কখনও হিসেবে এলো ৯৯.৫০ শতাংশ, কখনও এলো ৯৯.২৫ শতাংশ। এরপর যথাসময়ে ফলাফল ঘোষণা হলো। সে তার মেধার ভিত্তিতে, ধরা যাক, ‘সবেমাত্র’ ৯২.৭৫ শতাংশ নম্বর পেয়ে মেধাতালিকার ত্রিসীমানায় গেল না, কিংবা ‘মাত্র’ ৯৬.৯৫ শতাংশ নম্বর পেয়ে সে কিছু নম্বরের জন্য মেধাতালিকায় ঢুকতে পারলো না। তার এরকম ‘হতাশাব্যাঞ্জক’ ফলাফলের পর আপনি হলফ করে বলতে পারবেন যে সে আত্মহননের পথ বেছে নিত না? কারণ সে তো একটি সযত্নে লালিত স্বপ্নকে পাখির চোখ করে এগিয়ে চলছিল, এবং তা হলো তথাকথিত ‘মেধাতালিকা’-ভুক্ত হওয়া। পরীক্ষা বাতিলের মধ্য দিয়ে অঙ্কুরেই স্বপ্নভঙ্গের পরিণাম যদি তার কাছে আত্মহননের পথ বেছে নেওয়াই হয়, আশানুরূপ ফল না করতে পেরেও সে অনায়াসে আত্মহত্যা করতে পারত। সুতরাং তার আত্মহত্যার শোকে ব্যাকুল হওয়ার আগে অন্ততঃ এটুকু বলে নিজেকে সান্ত্বনা আপনি দিতেই পারেন যে, মাধ্যমিক পরীক্ষা বাতিল না করা হলেও সে ফলাফলের চরম হতাশা থেকেও আত্মহত্যা করতে পারত। তিল তিল করে নিজের মননে সে স্বপ্নের জাল বুনেছিল, লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীদের সাথে প্রতিযোগিতা করে সে রীতিমতো প্রথম বা দ্বিতীয় হবে বা নিদেনপক্ষে মেধাতালিকায় থাকবেই।

প্রতিবেদনের এই পর্যন্ত পড়ে পাঠকের মনে হতে পারে যে সদ্য নিজেকে শেষ করে দেওয়া একজন মেধাবী ছাত্র বা ছাত্রীর অকাল মৃত্যুতে সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে না দিয়ে উল্টে সে বেঁচে থাকলেও ভবিষ্যতে যে একই কাজ করতে পারত, এমনটা বুঝিয়ে আদতে তাকেই সমালোচনায় বিদ্ধ করা হচ্ছে। তার মৃত্যুজনিত সব শূন্যতা-আবেগ-হাহাকারকে একদিকে সরিয়ে রেখে বলতে হয় আদতে সমস্যাটি বৃহত্তর।

মাধ্যমিক হোক, বা উচ্চ মাধ্যমিক, ফল বেরোনোর পর থেকে মুদ্রিত তথা বৈদ্যুতিন গণমাধ্যমে ফলাফলের ভিত্তিতে সারা রাজ্যের প্রথম দশে থাকা পরীক্ষার্থীদের নিয়ে যে পর্যায়ের হৈচৈ শুরু হয়, তা নজিরবিহীন। তর্ক হতেই পারে, গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় দেশের সাধারণ নির্বাচনের আগে বা পরে জয়ী প্রার্থীদের সাফল্যের সম্ভাবনা বা সমীকরণ নিয়ে যদি সংবাদপত্রের পাতার পর পাতা বা টিভি চ্যানেলের ঘন্টার পর ঘন্টা টেলিকাস্টিং সময় খরচ করা হয়, এসবের চেয়ে ঢের হালকা মশলাদার কোনও বিষয় নিয়ে যুক্তি-তর্ক-গল্প টিভিতে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে করা যায়, তবে মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকের মতো রাজ্য স্তরের পরীক্ষায় লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীদের পেছনে ফেলে মেধাতালিকায় স্থান পাওয়া ছেলেমেয়েদের নিয়ে এক-দুদিনের জন্য চর্চা হবে না কেন? হবে না কেন, নিশ্চয়ই হবে, কিন্তু তুলনামূলক ভাবে কম নম্বর যারা পায় তাদেরকেও তুলে ধরার দায়িত্ব সেই সংবাদমাধ্যমকেই নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, পরীক্ষার ফলাফল-পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিবিশেষের সাফল্য নিয়ে হৈচৈ করতে গিয়ে সংবাদমাধ্যম এমন কোনও ভাবধারা যেন সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া ছেলেমেয়েদের মধ্যে সঞ্চারিত না করে ফেলে যে, সাফল্যের এক ও অদ্বিতীয় মাপকাঠি হলো অর্জিত নম্বর। যে প্রেক্ষিতে শিক্ষামহলের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ছাত্রছাত্রীদের প্রাপ্ত নম্বর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রকাশের বদলে শ্রেনী ভিত্তিক ফল প্রকাশ করতে উৎসাহিত করছে, ঠিক সেখানে দাঁড়িয়ে শতাংশের হিসেবে সামান্য এদিকসেদিক হয়ে যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পটভূমিতে মেধাতালিকা প্রকাশ পায়, তার ভিত্তিতে হৈচৈ করা আর বাকিদের পরোক্ষভাবে হীনমন্যতার অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার মধ্যে, আর যা-ই থাকুক, দূরদর্শিতা নেই।

ছেলেমেয়েদের মানসিকতা গঠনের মূল কারিগর যারা, আমরা অভিভাবকরা, তাদের ভূমিকা এক্ষেত্রে কার্যত সবচাইতে বেশি। জীবনের সাফল্য যে কোনওভাবেই বিশেষ একটি পরীক্ষা ভিত্তিক নয়, বা ঘুরিয়ে বললে, বিশেষ একটি পরীক্ষায় অর্জিত বিরাট সাফল্যই যে জীবনযুদ্ধের শেষ কথা নয়, বাস্তবতা যে পরীক্ষায় শতাংশের হিসেবে অর্জিত নম্বরগুলোর বাইরেও অনেক কিছু, তা বুঝিয়ে দেওয়ার দায় বর্তায় অভিভাবকদেরই। পড়াশোনায় অমনোযোগী ছেলেমেয়েদের পড়ালেখায় উৎসাহিত করার দায়িত্ব যেমন অভিভাবকদের, এমনিতেই পড়াশোনার প্রতি অসম্ভব যত্নশীল ছেলেমেয়েদেরকে পরীক্ষার ফলাফলই যে শেষ কথা নয়, এই সত্যটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট অভিভাবকদেরই। দুনিয়া অনেক বড়। জীবনের ব্যাপ্তি নেহাত কম নয়। একটি বিশেষ পরীক্ষায় সাফল্য, ব্যর্থতা, কিংবা একটি বিশেষ পরীক্ষা হওয়া, না হওয়া কিছুই জীবনের একমাত্র পথনির্দেশক হতে পারে না। সামনে তো বহু পথ পড়ে ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *