- আলোচনা, সমাজ ও পরিবেশ

অবিলম্বে শুরু হোক শিক্ষার্থীদের বিকল্প পদ্ধতিতে পাঠদান

পাভেল আমান

শিক্ষা আনে চেতনা চেতনা আনে মুক্তি। প্রকৃত শিক্ষায় আমাদের দেশ সমাজ রাষ্ট্র তথা সভ্যতাকে প্রকৃত উত্তরণের অভিমুখে চালিত করে। সেই শিক্ষা প্রদানের মহৎ দায়িত্ব ও কর্তব্যকে সুনিপুণভাবে পালন করে আসছে আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সমাজ।

মানব সভ্যতার সৃষ্টি লগ্ন থেকেই শিক্ষকেরা নিরলস ও সুষ্ঠুভাবে পাঠদান বা শিক্ষাদানের ধারাবাহিকতা পালন করে আসছে। যথার্থ শিক্ষায় সমাজ দেশ রাষ্ট্র গঠনের পথকে সুন্দর, বিকশিত ও স্বাভাবিক করে তোলে। মহান শিক্ষকগণ আমাদের শিক্ষা দেন, ব্যাখ্যা করেন, ভাষা থেকে সংস্কৃতি কৃষ্টি ঐতিহ্য ইতিহাস ভূগোল বিজ্ঞান মানব-জীবনাচরণ আদর্শবাদ, অর্থনীতি, দেশ, কাল রাজনীতি ও বিবিধ সমস্যার সমাধানের উপায়। তাঁদের হাতেই মানব সমাজ এগিয়ে চলেছে যুগ ব্যাপী। শিক্ষকরাই নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার কসরতে সুস্থ সবল ভাবে গড়ে তোলেন আগামীর প্রজন্মকে। বর্তমান পৃথিবীর ভবিষ্যৎ বাবা-মায়েদের-শৈশব তাঁদের হাতেই সযত্নে প্রতিপালিত হয়। এই পবিত্র মহান দায়িত্ব পালনে তারা যথেষ্ট আন্তরিক, সংবেদনশীল ও মহানুভবতার যথার্থ স্বাক্ষর রেখেছে। আমরা যারা ছাত্র-ছাত্রী, অভিভাবক-অভিভাবিকা; তারা শিক্ষকদের সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে সমাসীন করতে চাই, তাঁদের মহার্ঘ স্নেহাশীষ ও আশীর্বাদ পেতে চির লালায়িত, আকাঙ্ক্ষিত। বিদ্যালয় যেমন আমাদের দ্বিতীয় গৃহ; তেমনি শিক্ষক শিক্ষিকাগণ আমাদের পিতা মাতার আসনে বিরাজিত। তারাই শিক্ষার্থীদের জীবন বিকাশের অন্যতম কারিগর। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মননে শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিসীম। শিক্ষাদানের পারিপার্শ্বিক আদর্শ, নীতি শিক্ষা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, প্রকৃত মনুষ্যত্বের অধিকারী হয়ে মানুষ হওয়ার সহজপাঠ দিয়ে থাকেন আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় ও জ্ঞানতাপস শিক্ষকগণ। প্রকৃতার্থে তারাই গড়ে তোলেন দেশ গঠনের আদর্শ নাগরিক। কিন্তু বর্তমান অতিমারির সঙ্কটে কালে, মার্চ ২০২০ থেকে প্রায় ১৫ মাস যাবৎ, আমাদের দেশের অন্তত আমাদের রাজ্যের বেশিরভাগ শিক্ষকগণ চাল আলু চিনি মুসুরির ডাল ছোলা পরিমাপে এবং বিতরনে ব্যস্ত। “কোন কাজই ছোট নয়” একথা শিক্ষকরাই আমাদের মনের মধ্যে গেঁথে দেন। তাই অবশ্যই চাল ডাল আলু চিনি ওজন করে প্যাকেটজাত করা এবং তা বিতরণ করা মোটেও ছোট কাজ নয়; কিন্তু পাশাপাশি এই কাজ আর কতদিন শিক্ষকদের মাথার উপর চেপে থাকবে। মিড ডে মিলের দায়িত্বটা সেই কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গ্রুপকেই অর্পণ করা হোক। শিক্ষকদের এই কাজ থেকে এবার অন্তত মুক্ত করা হোক।

কারণ, এটা শিক্ষকের কাজ নয়। তাঁদের কাজ ধারাবাহিক নিরবচ্ছিন্নভাবে শিক্ষাদান করা; কুসুম মতি ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষিত করে তুলে কঠোর বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করানো। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পুরোপুরি দেশ জাতি ও রাষ্ট্রের কান্ডারী করে আদর্শ নাগরিক রূপে গড়ে তোলা। আবহমানকাল ব্যাপী তারা এই মহান কাজেই নিবেদিতপ্রাণ। শিক্ষাদানের কাজ যেকোনো আর পাঁচটা কাজের থেকে একেবারে ভিন্ন ধরনের। বাগানের মালি যেমন চারাগাছের নিবিড় ভাবে যত্ন ঠিক তেমনি শিক্ষকতা কাজ ও শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মানুষ করে তোলে দেশ গঠনের কাজে শামিল করা। এজন্যই শিক্ষকদের মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে স্মরণ করা হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না শিক্ষকেরা এই কাজ যথাযোগ্য আন্তরিকতা গুরুত্ব দিয়ে পালন করে চলেছে।

প্রতিনিয়ত শিক্ষকদের নির্বাচন সহ অন্যান্য অনেক সামাজিক সমীক্ষা ও পরিসংখ্যানের কাজ তো এমনিতেই করানো হয়; তাতেও পঠন-পাঠনের ও গবেষণার ক্ষতি হয় যথেষ্ট। এরপরেও যদি তাদেরকে চাল আলু পরিমাপে ও বিতরণে সময় ব্যয় করতে হয় তাহলে মানবসম্পদের অবনমন হতে বাধ্য। প্রয়োজনে স্বনির্ভর গোষ্ঠী গুলিকে এই দায়িত্ব দেওয়া যেতেই পারে। তারাই চাল ছোলা ডাল আলু চিনি কেনা পরিমাপ ও বিতরণ করতে পারবে। সম্ভবত এই বিতরনের সবচেয়ে সুষ্ঠু সমাধান এভাবেই হতে পারে। বিগত মার্চ ২০২০ থেকেই, পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। মাঝে কিছুদিন নবম দশম একাদশ দ্বাদশ শ্রেণির পঠন-পাঠন সম্ভবত শুরু হয়েছিল, কিন্তু কয়েক মাস পরেই আবার বন্ধ হয়ে গেছে সংক্রমণ নির্বাচনের জন্য। এই সুদীর্ঘ ১৫ মাস ছাত্র-ছাত্রীরা সম্পূর্ণভাবে স্কুল শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। সম্ভবত অনেকেই তাদের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের চেহারাও ভুলে গেছে। এভাবেই তারা এক ক্লাস থেকে অপর ক্লাসে বিনা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ‌ হয়ে গেছে। স্কুল শিক্ষকদের সঙ্গে তাদের আর কোনো যোগাযোগ নেই। এমতাবস্থায়, অবিলম্বে, বিকল্প পদ্ধতিতে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কথোপকথন এবং শিক্ষা পদ্ধতি প্রচলনের দাবি জানাচ্ছি। স্তব্ধ হয়ে যাওয়া, ঝিমিয়ে পড়া, পড়াশোনা বন্ধ রাখা ছাত্র-ছাত্রীরা যাতে আবারো এই করোনা আবহে বিকল্প পদ্ধতিতে শিক্ষক-শিক্ষিকার ভার্চুয়াল সংস্পর্শে পাঠদানের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে সেই জরুরী বিষয়ে শিক্ষক শিক্ষিকা, অভিভাবক অভিভাবিকা, শিক্ষা দপ্তর কে পারস্পরিক সহযোগিতা সমন্বয়ের ভিত্তিতে সঠিক দিশা খুঁজে বার করতে হবে। যেখানে প্রযুক্তির সহযোগিতায় ছাত্র-ছাত্রীরা অনলাইন পাঠদানের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। অর্থাৎ এই প্রক্রিয়াতে আর খুব বেশি বিলম্বিত করা যাবে না। এমনিতে ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে রাজ্যের অগণিত পড়ুয়াদের। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার কথা ভেবে চালু করতে হবে বিকল্প পদ্ধতিতে পাঠদান। পরিশেষে অতিমারির সংক্রমণে চারিদিকে আজ বিপর্যয় বিপন্নতার প্রতিচ্ছবি। সেইসঙ্গে স্তব্ধ হয়ে গেছে পাঠশালা, বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীরা আজ বড় অসহায়। তাদের পড়াশোনার জীবনে নেমে এসেছে স্তব্ধতা’। ইতিমধ্যেই অনেকটা সময় আমরা পার করে এসেছি। এই মুহূর্তে রাজ্যের অগণিত ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনার মননকে উজ্জীবিত, উদ্বেলিত, আন্দোলিত, বিকশিত করে তুলতে বিকল্প পদ্ধতিতে পাঠদানের প্রক্রিয়া অবশ্যই শুরু করতে হবে। সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন সাফল্যমন্ডিত করে তুলতে শিক্ষক সমাজের ভূমিকা অপরিসীম। শিক্ষা দপ্তরকে অগণিত পড়ুয়াদের স্বার্থে অবিলম্বে বিকল্প পদ্ধতিতে পাঠ প্রদান প্রক্রিয়াকে কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রায় নিয়ে যেতে মাননীয় শিক্ষক সমাজকে অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে নির্দেশিকা উৎসাহ প্রদান করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *