- আলোচনা, রাজনীতি, সমাজ ও পরিবেশ

বিনামূল্যে টিকার সিদ্ধান্ত, কারণ যাই হোক

পাঠক মিত্র

কেন্দ্রীয় সরকারের টিকানীতি নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। এমনকি আদালতে মামলা পর্যন্ত চলছে। কারণ সকলের জানা। একই টিকার ভিন্ন দাম এবং পঁয়তাল্লিশ বছরের নীচে সমূল্যে টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তে অতিমারিতে মানুষকে বাঁচতে হবে মূল্যের বিনিময়ে। রাষ্ট্রের কোনও দায় নেই। তাই সরকারের এমন সিদ্ধান্ত দেশে বিদেশে সমালোচনার ঝড় তুলেছিল। কিন্তু সব ঝড় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থামিয়ে দিলেন। টিকাকরণের সব দায় রাষ্ট্র নিল। তাতেও যে সমালোচনা থামে তা নয়। তবে এ সমালোচনা বলছে ঠিক এই মুহুর্তে সকল মানুষ যেটা চেয়েছেন তিনি তা রাখলেন, কেন ? অনেকে বলছেন, বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর চাপে, অনেকে বলেছেন সব বিরোধী দের চাপে। বিরোধীদের চাপে এই কেন্দ্রীয় সরকার যে কোনও কাজ করেছেন বা তাঁর কোনও সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে গেছেন তা কিন্তু এখনও পর্যন্ত দেখা গেছে বলে মনে হয়নি। এই মূহুর্তে কৃষকদের আন্দোলন সে কথাই বলে। এই সরকারের কথা নড়চড় হয় না। তাঁরা যা মনে করেছেন এবং তাই যে করতে পারেন, এ সম্পর্কে নিশ্চয় কোনও দ্বিমত হবে না। সে দ্বিমত থাকুক আর না থাকুক, আজকের টিকাকরণের এই সিদ্ধান্ত প্রকৃত মানুষের পক্ষেই। সেখানে বিরোধীদের চাপে হোক আর অন্য কারণ হোক। তবে শুধু বিরোধীদের যে চাপ ছিল তা নয়, বিজেপি শাসিত রাজ্যও চেয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের টিকাকরণের এই সিদ্ধান্ত।

আর অন্য কারণ হিসেবে অনেকেই বলছেন উত্তরপ্রদেশে আগামী বিধানসভা ভোটের দিকে তাকিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা। এই কথাটা শুধু কি বিজেপি সরকার করে আর কোনও সরকার যেন করে না। তা তো নয়। বাংলার বিধানসভা ভোটের সময় তৃণমূল সরকারের ‘দুয়ারে সরকার’ প্রকল্পটি ভোটের দিকে তাকিয়ে যে হয়নি তা কি কেউ বলতে পারে। ভোটের দিকে তাকিয়ে যে সরকার তাঁর প্রকল্প ঘোষণা করে এটাই স্বাভাবিক এখন। তবু সমালোচনা ওঠে। টিকাকরণের এই সিদ্ধান্তে কেন্দ্রীয় সসরকারের তাই সমালোচনা হচ্ছে। আসলে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সরকারের আত্মনির্ভরতাকে যে বেসামাল করে দিয়েছে তা দেশে বিদেশে সমালোচিত হয়েছে। যদিও দেশের চৌকিদারের আর এক সঙ্গী এই দ্বিতীয় ঢেউ সামলানোর কৃতিত্ব চৌকিদারকেই দিয়েছেন। নিজেদের ঢাক নিজেরা পেটালেও তার আওয়াজ মানুষের কাছে বিরক্তিকরই লাগে। দ্বিতীয় ঢেউয়ে বেসামাল দেশের জন্য নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন সরকারকে দোষী করেছেন। সরকারের মানসিক অবস্থা সংশায়চ্ছন্ন বলে তিনি ‘স্কিৎজোফ্রেনিয়া’ শব্দটি উচ্চারণ করেছেন। যা ঝড় তুলেছে বিশিষ্ট মহল থেকে রাজনৈতিক মহল সর্বত্র। অনেকে বলেছেন এই শব্দ উচ্চারণে মানসিক রোগীদের ছোট করা হয়। আর বিজেপি নেতারা যাকে রাজনৈতিক বলে মনে করেছেন। তবে কোনও মৃত্যু সরকারের কাছে উদ্বেগ সৃষ্টি করেনি। সে দিল্লির দাঙ্গা হোক, কৃষক আন্দোলনে হোক। উদ্বেগ কাদের থাকে না, নির্লিপ্ত কে থাকে। তাই অর্থনীতিবিদের শব্দ উচ্চারণে সেই কথাটাই প্রকাশ পায়। তর্ক যাই থাক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা সব তর্ককে নস্যাত্ করে দিল। সরকারের সিদ্ধান্ত যখন সব মানুষের উপকার করে, তখন তার পিছনে সরকারের যাই মোটিভ থাকুক তা মানুষের জন্য পজিটিভ কিনা সেটাই আসল। কেন্দ্রীয় সরকারের টিকাকরণের নীতি এখন যে সব মানুষের জন্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

তবে এটাও ঠিক আঠারো থেকে পঁয়তাল্লিশ বছরের মানুষ সমূল্যে টিকা নিলে ভোটে যে তার প্রভাব পড়বে না তা বলা যায় না। ভোটের শতাংশে তাঁরা অবশ্যই একটা ফ্যাক্টর। আর এই বয়সের মানুষ মাত্রেই যে স্বাবলম্বী, সমূল্যের টিকার সিদ্ধান্ত তাই বলেছিল। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। বেকার সমস্যা যে কি তা পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। আর পরিসংখ্যানের বাইরেও তার ছায়া বিস্তার করে আছে।

এই টিকানীতি যে সকলের জন্য তা বলা যায়। তবু প্রশ্ন এসে যায় তার সরবরাহে। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই বছরের মধ্যে সব মানুষের টিকাকরণ সম্ভব হবে কিনা তা সন্দেহ থেকে যায়। বেসরকারি ক্ষেত্রে যে ব্যবস্থা (সমূল্যে) তা যদি শুধু স্বাভাবিক থাকে তাহলে তার দায় কেন্দ্র না রাজ্যের। এই তর্কে যে যেখানে ক্ষমতায় আছে সে জিতবে নিশ্চয়। তবে মানুষ বঞ্চিত হলে কোনও জেতাই জেতা নয়।

শেষ পর্যন্ত সকলের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্ত সকল মানুষের জন্য তা আর একবার বলতে হয়। তার জন্য কেউ বলছে যে গাধা সেই জল খেল তবে ঘুলিয়ে। আবার বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন যে দেরিতে হলেও বোধোদয় হল।

ভোটের কথা ভেবে হোক, অমরত্বের কথা ভেবে হোক, ইতিহাস গড়ার কথা ভেবে হোক, যাই হোক শেষ পর্যন্ত মানুষের কথা ভাবলেই মানুষের মঙ্গল। আর সেই ভাবনা যখন কাজে সার্থক হয়ে ওঠে, মানুষের আরও মঙ্গল। বিরোধীরা বলছে বলেই তার বিরোধী হতে হবে তা কিন্তু সবসময় সঠিক ভাবনা নয়। এমন ভাবনা যে অনেক সময় মানুষেরই বিরোধীতা করে তা হয়ত কেন্দ্রীয় সরকার বুঝতে পেরেছে। অন্তত টিকাকরণের ক্ষেত্রে। যার জন্য অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের উচ্চারিত শব্দ থেকে মুক্ত হতে পেরেছে আর তাই হয়তো শেষ পর্যন্ত বোধোদয় ঘটল। এই একটা ব্যাপারে ইগো বিসর্জন দিতে পেরেছে সরকার। কারণ যাই থাক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *