আলোচনা, সমাজ ও পরিবেশ

উত্তরপ্রদেশে গোরু-মহিষের মতই নাকি নারী নিরাপদ

Hits: 4

0
(0)

পাঠক মিত্র

উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর অতি সম্প্রতি এক মন্তব্য সব মহলেই সমালোচনার ঝড় তুলেছে। ঝড় ওঠারই কথা। কিন্তু সেই ঝড় তাঁর রাজ্যে কতটা প্রভাব ফেলবে তা হয়তো সময় বলবে। তাঁর মন্তব্য ‘গোরু, মহিষ ও নারী’ আগের থেকে তাঁর রাজ্যে অনেক নিরাপদ। গোরু, মহিষ তাঁর রাজ্যে নিরাপদ, সে কথা বলা যায়। কারণ গো-রক্ষক বাহিনী তাঁর রাজ্যে বেশ সতর্ক। সেই সতর্কতার সঙ্গে গোরুর নিরাপত্তার কারণে তাঁরা স্বজাতীয় মানুষকে খুন করতে দ্বিধা করেনি। এখানে স্বজাতীয় মানে মনুষ্য জাতির কথা ভাবতে হবে। তার অন্যথা ভাবলে হবে না। তাই বলা যায় গোরু বাঁচাতে যারা মানুষ মারতে পারে, সেখানে-যে গোরু-মহিষ নিরাপদ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু গোরু, মহিষের এই নিরাপত্তার সাথে রাজ্যে নারী সুরক্ষিত বলার অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় না। গো-রক্ষা বাহিনীর মত তাঁর রাজ্যে কি নারী-রক্ষা বাহিনী আছে ? তা কিন্তু জানা যায়নি বা তিনি জানাননি। বা নারীকে রক্ষা করতে কেউ গো-রক্ষা বাহিনীর মত মানুষকে মেরে ফেলেছে, সে-ঘটনাও জানা যায়নি। বরং তার উল্টো ঘটনা তাঁর রাজ্যে ঘটেছে। নারীকে শারীরিক অত্যাচার করে খুন করেছে। আর যারা খুন করেছে তাদের রক্ষা করার লজ্জাজনক প্রয়াস চোখে পড়েছে সবার। হাথরাসের ঘটনা মানুষের স্মৃতিতে জ্বলছে। কুলদীপ সেঙ্গার নামের এক বিজেপি বিধায়কের উন্নাও কান্ড কেউ ভোলেননি। ভুলে যায় নি কারণ, সেখানে নারী শুধু নির্যাতিত হননি, তাঁর জীবন কেড়ে নেওয়ার ঘটনায় মানুষ হতবাক হয়ে গিয়েছিল। মানুষ হতবাক হয়ে গেলেও, বিজেপি নেতারা হতবাক হননি। হতবাক হননি বলে হাথরাস কান্ডের পরিপ্রেক্ষিতে বিজেপির জনপ্রতিনিধিদের নারী সম্পর্কে যেভাবে মন্তব্য প্রকাশ পেয়েছে তা শুধু নারীদের অসম্মান হয়নি, সেখানে পুরো সমাজকে ঠেলে দিতে পারে এক অস্থিরতায়। যদিও তাঁদের কাছে সমাজের ভাবনায় ‘পুরো’ কথাটার মর্যাদা নেই। তাঁদের মন্তব্য তাই প্রমাণ করে। এমনকি দলিত আর উচ্চবর্ণের যে বিভাজন আজও কদর্যভাবে বেঁচে আছে, উত্তরপ্রদেশের ধর্ষণকান্ড চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। হাথরাস কান্ডে উচ্চবর্ণের অভিযুক্ত মানুষের পক্ষ নিয়ে যে আন্দোলন দানা বেঁধেছিল তা শাসকদলের নেতার সরাসরি সমর্থন সেই বিভাজনকেই সমর্থন করে। এরই পাশাপাশি এক জনপ্রতিনিধির মন্তব্য, ‘নারীদের সংস্কার আর মূল্যবোধ শেখালেই ধর্ষণ রোখা সম্ভব। ‘ আর এক জনপ্রতিনিধির মন্তব্য, ‘এ ধরনের মেয়েদের দেহ কেন বাজরার ক্ষেতে মেলে বলুন তো ? নিশ্চয়ই ওর কোনও প্রেমের সম্পর্ক ছিল, নিজেই হয়তো প্রেমিককে বাজরার ক্ষেতে ডেকেছিল। ‘ আর বলেন ‘সে মায়ের সঙ্গে ঘাস কাটতে গিয়েছিল। বাজরার ক্ষেতে ত ঘাস হয় না। বিপদ বুঝে চেঁচালো না কেন ? আর জবরদস্তি হলে ধ্বস্তাধ্বস্তির কোনো চিহ্ন নেই কেন ?’ সত্যিই এই মানুষগুলো ধর্ষণের ঘটনায় নারীই দোষী আর ধর্ষক নিরপরাধ কত সহজে প্রমাণ করে দেন।

বিজেপির নেতাদের এই মন্তব্যের পাশাপাশি আর এস এস প্রধানের এক মন্তব্য যদি উল্লেখ করা হয়, তাহলে প্রমাণ হয় যে আর এস এস আর বিজেপির চিন্তাভাবনা পরস্পরের পরিপূরক। আর এস এস প্রধানের মতে বৈবাহিক ডিভোর্সের সংখ্যা বাড়ার একটি প্রধান কারণ নাকি নারীর শিক্ষার হার বেশি। তাঁর মতে নারীর শিক্ষা আর আর্থিক স্বচ্ছলতা নাকি নারীকে স্বেচ্ছাচারিতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। যাঁদের চিন্তাধারার এই রূপ তাঁদের কাছে নারী প্রগতি বলতে কি বোঝায় তা আর আলাদা করে না বললেও চলে। পরিসংখ্যান বলছে সারা পৃথিবীতে নারী শিক্ষার হার যেখানে 82%, সেখানে ভারতে 60% এর মত। শিক্ষার এই পরিসংখ্যানে আপনার আমার সন্তুষ্টি যেমন নেই, তেমন আর এস এস প্রধানও সন্তুষ্ট নন। অবশ্য তিনি সন্তুষ্ট নন এই কারণে যে তাঁর মতে নারী শিক্ষার এই হার অনেক বেশি হয়ে গেছে। তাই নারী স্বেচ্ছাচারিতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে তাঁর মন্তব্য।

তাহলে এই নেতাদের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে উত্তরপ্রদেশের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য নারীকে গোরুজ্ঞানে দেখেন কিনা তা নিয়ে তর্ক ও প্রতিবাদ চলতে পারে। যদি তাই হত তাহলে গো-রক্ষা করার যে উদ্যোগ সেই মত নারীকে রক্ষা করতে দেখা যেত। তা কিন্তু হয়নি। গোরুকে মাতা হিসেবে পূজা করা মানেই মাকে পূজা করা। তাই সেই মাকে রক্ষা করতে মানুষের প্রাণ নিতে পর্যন্ত পিছপা হতে দেখা যায়নি। গো-মাতার সন্তানদের কাছে নারী মাতা কিনা তা নিয়েও তর্ক চলতে পারে। তবে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর গোরু ও মহিষের নিরাপত্তার সঙ্গে নারীর নিরাপত্তার প্রসঙ্গের মন্তব্যে সব তর্কের অবসান হতে পারে।

আজকের এই সময়ে নারী স্বাধীনতার কথা বলা আর পরক্ষণেই নারীদের সম্পর্কে এমন মন্তব্য পুরুষতান্ত্রিকতার চেতানায় প্রাচীন স্তরকে প্রকাশ করে। তাই আজও বহুলাংশে নারীর মুক্তি কেবল কথার কথা। এ ব্যাপারে শরৎচন্দ্রের একটি কথার অংশ বলতে হয়, ‘ মেয়েদের মুক্তি, মেয়েদের স্বাধীনতা ত আজকাল নরনারীর মুখে মুখে, কিন্তু ঐ মুখের বেশি আর এক-পা এগোয় না ..। ‘

মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী নারীদের মুক্তি, স্বাধীনতা চায় কিনা তা বলেন নি, কিন্তু নিরাপত্তার কথা ত বলেছেন। নিন্দুকেরা কি বলল তা নিয়ে তাঁর কিছু যায় আসে না।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?

আপনার ভালোলাগা অনুযায়ী স্টার-এ ক্লিক করুন!

এই পোস্টটি রেটিং করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

No votes so far! Be the first to rate this post.