আলোচনা, সমাজ ও পরিবেশ, স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব ও ইতিহাস

বিদ্যাসাগর মুক্ত মনের মানুষ তৈরি করতে চেয়েছিলেন

Hits: 9

0
(0)

নরেন্দ্রনাথ কুলে

মুক্তমনা মানুষ বলতে আমরা বুঝি খোলা মনের মানুষ। খোলা মন অর্থাত্ যার মনে কোনো সংস্কার বাসা বেঁধে থাকে না, সে জাত, ধর্ম, বর্ণ যাই হোক না কেন, সবকিছুতে যা সর্বদা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর যুক্তি খুঁজে বেড়ায়। আজকে এই অন্তর্জাল যুগে ‘মুক্তমনা’ শব্দটি উচ্চারণ করতে হচ্ছে। শুধু তাই নয় তা চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ সারা বিশ্বজুড়ে এই ‘মুক্তমন’ ধ্বংস করার খেলায় মেতে আছে যারা তাদের এখানে পরিচয় না দিলেও কারও বুঝতে অন্তত অসুবিধে নেই।

রাজা রামমোহন রায়ের হাত ধরে এ দেশে নবজাগরণের যে আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল সেই আবহাওয়ায় ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত কিছু মানুষ তদানীন্তন কুসংস্কারযুক্ত ধর্মকে কিছুটা সংস্কার করে তার একটা আধুনিক ধারা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন বা করেছিলেন। সেই সময়ের বিচারে সেই মানুষগুলো মুক্তমনা ছিলেন। তাঁরা গোঁড়ামিকে সরিয়ে ধর্মীয় ভাবধারাতে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইলেন। ঠিক এর পরবর্তী সময়ে বিদ্যাসাগর এলেন এবং সমাজকে ধর্মীয় ভাবধারা থেকে মুক্ত করতে চাইলেন। তাঁর এই কাজের সাথে আর একজনের নাম করতেই হয় যিনি হলেন অক্ষয় কুমার দত্ত। বিদ্যাসাগরের সামাজিক আন্দোলনের যিনি একজন সক্রিয় সমর্থকই শুধু ছিলেন না, তিনি বিদ্যাসাগরের পথেই হেঁটেছিলেন।

বিদ্যাসাগর এবং অক্ষয়কুমার দত্ত, এই দুটি মানুষ উনবিংশ শতাব্দীতে যখন ধর্মীয় গোঁড়ামিতে ব্রাহ্মণ্যবাদের পরাকাষ্ঠে সমাজ আবদ্ধ হয়ে আছে, তখন তাঁরা সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হাঁটলেন কি করে। অথচ এই দুজন পাশ্চাত্য থেকে শিক্ষা নিয়ে আসেন নি। শুধু তাই নয়, অক্ষয়কুমার দত্ত কোনো প্রথাগত ডিগ্রি অর্জন করেন নি। অল্প বয়সে সাংসারিক জোয়াল কাঁধে নিয়েও নিজের চেষ্টায় আপ্রাণ জানার চেষ্টা করেছেন। অনুসন্ধিত্সু মনে বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে ধর্মকে, শাস্ত্রকে যাচাই করার সাহস দেখিয়েছিলেন। পাশ্চাত্য শিক্ষার যে ঢেউ আছড়ে পড়েছিল সেই ঢেউয়ে এ দেশের নুড়ি-পাথর ধুয়ে পরীক্ষা করার সাহস দেখিয়েছিলেন। যে সাহসে তাঁরা খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানকে, খুঁজে পেতে চেয়েছেন সত্যকে। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে যে যুক্তির সোপানে তাঁরা নিজেদের যে মুক্তমনের পরিচয় দিয়েছেন তা আজকের সময়ে আমাদের না ভাবিয়ে পারে না। শুধু নিজেদের মুক্ত মনের পরিচয় দেননি, মুক্ত মনের মানুষ গড়তে চেয়ে এ দেশের সাতপুরো মাটি চেঁছে মানুষের চাষ করতে চেয়েছিলেন যেখানে গড়ে ওঠে প্রকৃত মনুষ্যত্ব।

ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান হিসেবে সংস্কৃত, বেদ, বেদান্তের মধ্যে পাণ্ডিত্য অর্জন করেও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা প্রচলনের জন্য আজীবন নিরলস পরিশ্রম করেছেন বিদ্যাসাগর। অথচ মানুষটিকে দেখতে নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণের মত, অথচ ব্রাহ্মণের কোনো আচার-আচরণ নিয়ে চলতে তাঁকে কেউ দেখেন নি। পাশ্চাত্য পোশাক-আশাকে চলাফেরা না করেও কেবল দেশীয় পোশাকে তিনি ছিলেন একজন আধুনিক মানুষ। বিশ্বকবি বলেছেন, ‘–আমরা সাধারণত প্রবল সাহেবি অথবা প্রচুর নবাবি দেখাইয়া সম্মানলাভের চেষ্টা করিয়া থাকি। কিন্তু আড়ম্বরের চাপল্য বিদ্যাসাগরের উন্নত কঠোর আত্মসম্মানকে কখনো স্পর্শ করিতে পারিতেছে না। ভূষণহীন সারল্যই তাঁর রাজভূষণ ছিল। ‘ এই সরল ভূষণেই কুসংস্কার ও শাস্ত্রের বাঁধন থেকে মানুষকে মুক্ত করার জন্য শিক্ষা সংস্কার করতে আজীবন নিরলস ভাবে কাজ করে গেছেন। শিক্ষা সংস্কারের মধ্যে গড়তে চেয়েছিলেন গোঁড়ামিমুক্ত সমাজ। তিনি বুঝেছিলেন এই সমাজ গড়া ততক্ষণ সম্ভব নয় যদিনা নারীরা সচেতন হয়। তাই নারী শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছিলেন প্রথমেই। কারণ তদানীন্তন সময়ে কুসংস্কার ও শাস্ত্রের বাঁধনে সবথেকে অবহেলিত ছিল নারীরা। নারীদের দুঃখ তিনি হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছিলেন। কুসংস্কারগ্রস্থ সমাজে গোঁড়া পন্ডিতদের বিরোধিতা সত্ত্বেও তার কোমল হৃদয়ের বাস্তববোধ বিচক্ষণতা ও যুক্তিবাদী মনের বলিষ্ঠতায় অতি দক্ষতার সাথে শিক্ষার আলো সমাজের কোণায় কোণায় জ্বেলে দিতে এগিয়ে এসেছিলেন। শুধু নারী শিক্ষা নয়, তাঁর চিন্তা যে কত আধুনিক ছিল তার প্রভাব সার্বিক শিক্ষাপ্রসারেও তা পড়েছিল।

বিদ্যাসাগর এদেশে বিজ্ঞানভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন, সেই শিক্ষা সম্পর্কে তার যে উন্নত ধারণা তা আজও আমাদের উপলব্ধির বিষয়।

অধ্যক্ষ পদে বসার পর পাঠ্যসূচী কেমন হবে সেই পরিকল্পনা তার ‘নোটস অন সংস্কৃত কলেজ’ থেকে বোঝা যায় তিনি কতটা বাস্তব যুক্তিসম্মত শিক্ষাবিদ ছিলেন। “কতগুলি কারণে সংস্কৃত কলেজে বেদান্ত সাংখ্য পড়াতেই হয়…। এইগুলি যখন পড়াতেই হবে তখন তার প্রতিষেধক হিসেবে ছাত্রদের ভালো ভালো ইংরেজি দর্শন শাস্ত্রের বই পড়ানো দরকার। ” তাই তিনি জন স্টুয়ার্ট মিলের লজিক পড়াতে চেয়েছেন কারণ মিলের লজিক জ্ঞান তত্ত্বের ক্ষেত্রে ইম্পিটিসিজনের সংগে ব্যক্তির সামাজিক দায়িত্ব ও নৈতিক বোধের মেলবন্ধন ঘটেছিল। পাশ্চাত্যের আধ্যাত্মবাদী বার্কলের দর্শন পড়ানোর বিরোধিতা করেছেন কারণ বেদান্ত ও সাংখ্যর মতো এটিও একইধরনের বই যা ইউরোপেও খাঁটি দর্শন হিসেবে আর বিবেচিত হয় না। শুধু তাই নয় সেযুগের আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির ইতিহাসবিদ গুইজ্যোটের বই লাইব্রেরিতে কেনার জন্য বেছেছিলেন। এই ধরনের শিক্ষা দিতে যিনি চান তিনিই বলতে পারেন, ” শিক্ষা বলতে শুধু রিডিং রাইটিং আর অ্যারিথমেটিক নয় যথার্থ পুর্ণ শিক্ষা দাও। ” যে শিক্ষার দ্বারা গড়তে চেয়েছেন যথার্থ মানুষ, গড়তে চেয়েছেন উন্নত সমাজ। কারণ তদানীন্তন শিক্ষিত সম্প্রদায় মানুষের যে গোঁড়ামি দেখেছেন তার বিবরণ তিনি দিয়েছেন–” একথা বলতে আমি লজ্জাবোধ করছি যে ভারতবর্ষের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের গোঁড়ামি আরবের থেকে কোনো অংশেই কম নয়। তারা বিশ্বাস করে যে, তাদের শাস্ত্রগুলো গড়ে উঠেছে সর্বজ্ঞ ঋষিদের মধ্য থেকে এবং সেই জন্যই তা অভ্রান্ত হতে বাধ্য। যখন কোনো আলোচনা বা তর্ক বিতর্কের মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় বিজ্ঞান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নতুন কোনো সত্য তাদের সামনে তুলে ধরা হয় তখন তারা হাসে এবং উপহাস করে। ইদানীং ভারতবর্ষের এই অংশের..শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে এরকম একটা অনুভূতি প্রকাশ পাচ্ছে যে যখন তারা নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক সত্যের কথা শোনে যার আভাস হয়তো তাদের শাস্ত্রে রয়েছে তখন সেই সত্যের প্রতি সম্মান দেখানোর পরিবর্তে তারা উল্লসিত হয় এবং তাদের নিজেদের কুসংস্কারগ্রস্থ শাস্ত্রের সম্পর্কে শ্রদ্ধাবোধ দ্বিগুন হয়ে যায়। ”

ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারে আবদ্ধ পরিবেশ থেকে বেড়ে ওঠা মানুষটির শিক্ষা যে ধর্ম বিশ্বাস থেকে পুরোপুরি মুক্ত ছিল তাঁর এই বিচক্ষণতা থেকে পরিষ্কার। সবদিক থেকে এ পর্যন্ত তিনিই একমাত্র মানুষ যিনি মুক্ত মনের মানুষ তৈরি করতে চেয়েছিলেন।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?

আপনার ভালোলাগা অনুযায়ী স্টার-এ ক্লিক করুন!

এই পোস্টটি রেটিং করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

No votes so far! Be the first to rate this post.