আলোচনা, বিনোদন

তবে কি গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার বাংলাদেশের অভিনেত্রী পরিমণি?

Hits: 413

2.7
(3)

বাংলাদেশের আইন-কানুন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আস্থা রেখেই আমার এই নিবেদন

তন্ময় সিংহ রায়

বাংলাদেশের র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন সে দেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী পরিমণিকে গ্রেপ্তার করেছে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ কুটনৈতিক এলাকা হিসেবে পরিচিত ঢাকার বনানী মডেল টাউনে তাঁর নিজস্ব বাড়ি থেকে। কেন তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন? কি এমন হেভি ওয়েটের অপরাধ তিনি করে ফেলেছেন যে তাঁকে দাগি আসামিরূপে পুলিশি হেফাজত থেকে রিমান্ড, ও সেখান থেকে আদালতে নিয়ে ইচ্ছেমতন করা হয়েছে এবং হচ্ছে ময়নাতদন্ত?

প্রথমত তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে জিন, রাশিয়ান ভদকা, টাকিলা, হুইস্কিসহ বহু মূল্যবান রেড ওয়াইন পেয়েছে র‍্যাব, অর্থাৎ অভিনেত্রীর সে বাড়িতে আবিষ্কৃত হয়েছে ছোটোখাটো একটা বার’ও বলা যেতে পারে। যদিও অভিনেত্রীর কাছে আছে এর বৈধ লাইসেন্স, যেটা দুর্ভাগ্যবশতঃ রিনিউ করা হয়ে ওঠেনি।

এখন ভারত-বাংলাদেশসহ বহু দেশে বহু উচ্চবিত্ত বা সেলিব্রিটিদের বাড়িতেই তো রয়েছে এমন সব ছোটো-বড় বা মাঝারি বার। আর আপাতত যদি ধরা হয় শুধু বাংলাদেশেই, তো বহু অর্থবান, উচ্চবিত্ত বা সেলিব্রিটির বাড়িতেই কিন্তু থাকতে পারে এ ধরণের বা আরও বড় এবং সাজানো-গোছানো বার? তবে এই সূত্র ধরে শুরু হোক দেখি তাঁদের বাড়িতেও র‍্যাব তল্লাশি অভিযান? সেখানেও বেরিয়ে তো আসতেই পারে অবৈধ বহুকিছু? আইনের চোখ তো আর কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে মটরের দানা, ও কারো ক্ষেত্রে ফুটবল নয়? বা এই সূত্র ধরে সম্পূর্ণ বাংলাদেশে তল্লাশি অভিযানটাও হবে না বোধহয় নিছক বোকামি কিংবা ভুলভাল কিছু? বরং এই অভিযানে ইচ্ছেস্বাধীন বিশেষত মুসলিমদের মদ পান, ইচ্ছেস্বাধীন বিদেশি মদ সংগ্রহ, বিক্রি, এমনকি লাইসেন্স না থাকা কিংবা মৃত অবস্থায় এসব দিনের পর দিন নির্দ্বিধায় ও অবৈধভাবে চালিয়ে যাওয়া, গড়গড় করে মুখস্থ বেরিয়ে আসার সম্ভাবনাটাই অত্যন্ত প্রবল। আর দ্বিতীয়ত রিমান্ডের জিজ্ঞাসাবাদে নাকি অভিনেত্রী স্বীকার করেছেন যে, ২০১৬ সাল থেকেই নিয়মিত অ্যালকোহল সেবনের পাশাপাশি নিষিদ্ধ মাদক হিসেবে কখনও কখনও এল এস ডি ও আইস ড্রাগও নিতেন তিনি। এখন এই ড্রাগ বিশেষ করে বাড়িতে রাখার ব্যাপারটা অস্বাভাবিক কিছু না হলেও, ঠিক কতটা সত্যি? তা আমার কাছে অন্তত এক বড়সড় সন্দেহের বিষয়। না গরীব থেকে বড়লোক হয়ে ওঠায় এবং কারো স্বার্থে নিদারুণ আঘাত লাগায় এর চুড়ান্ত প্রতিশোধস্বরূপ, রাগ, ঈর্ষা ও হিংসাবশতঃ এই অভিনেত্রীকে হতে হয়েছে এক গভীর ষড়যন্ত্রের স্বীকার? আর এসব নিষিদ্ধ মাদক তো থাকতে পারে বাংলাদেশের অন্য কোনো সেলিব্রিটি বা দুষ্কৃতকারীদের বাড়িতেও?

যাইহোক অভিনেত্রীর নিয়মিত মদ্য ও সিগারেট পানের বিষয়টা অনেকেরই জানা থাকলেও, এখন এই নিষিদ্ধ মাদক সত্যিই তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাড়িতে সেবন করতেন ও রাখতেন কি না? কিংবা তল্লাশি গতিশীল থাকাকালীন বাইরে থেকে এই নিষিদ্ধ ড্রাগ এনে তাঁর ঘরে রেখে দিয়ে তাঁকে হয়েছে কি না পূর্বপরিকল্পিতভাবে বেমালুম ফাঁসানো, তাই বা আবার কে জানে? অথবা সর্ষের মধ্যেই ভূত ছিল কি না? আর এখনও পরিষ্কারভাবে এসব কিছুই জানতে পারেনি বা পারছেনা বিশেষত দু’দেশেরই সাধারণ মানুষ। প্রায় সব দেশের আইনেই বোধকরি এত গভীরে জানার অধিকারও সাধারণত দেওয়া হয়না আম জনগণকে, এবং ক্ষেত্রবিশেষে মিডিয়ারাও অবশ্যই নিষ্ক্রিয় হতে বাধ্য। পরিমণির তৃতীয় অপরাধ যেটুকু জানতে পারলাম, চলচ্চিত্র জগতের আড়ালে তিনি নাকি নাম লেখান নিষিদ্ধ পর্নো ব্যবসায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে ‘পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২’ অনুযায়ী বেআইনি ও নিষিদ্ধ করা হয়েছে সে দেশে পর্নোগ্রাফি উৎপাদন, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ, বহন, সরবরাহ, ক্রয়-বিক্রয় ও প্রদর্শন প্রভৃতি। এখন অভিনেত্রী পরিমণি তদন্তে যদি প্রকৃতভাবে বেরিয়ে আসে যে, তিনি তাঁর নিজের দেশেরই কোথাও যুক্ত ছিলেন পর্নো ব্যবসার সাথে, বা বাজারজাতকরণ, সরবরাহ, ক্রয়-বিক্রয় ও প্রদর্শন ইত্যাদি, তবে বোধহয় হবে সেটা অপরাধ, অন্যথা নয়। আর উৎপাদন, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ, বহন, সরবরাহ, ক্রয়-বিক্রয় ও প্রদর্শন এসব যদি ধরতেই হয় তো সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে এই পর্নো মার্কেটের আজও এত রমরমা কেন? যেখানে উৎপাদন, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ থেকে ক্রয়-বিক্রয়, সরবরাহ ও প্রদর্শন, এসবই তো প্রতিদিন দৌড়-ঝাঁপ করছে ঝড়ের গতিতে।

২০১৪ সালের জুন মাসে টিপু কিবরিয়া নামে এক শিশুসাহিত্যিককে আটক করে সিআইডি। কি কারণ? কারণ ন’বছর ধরে তিনি বাংলাদেশের ঢাকার মুগদাপাড়ায় একটি স্টুডিও বানিয়ে তৈরি করে আসছিলেন শিশু পর্নোগ্রাফি। আর এ বিষয়ে আদালতে তিনি স্বীকারোক্তিও দিয়েছেন৷ সহায়তা করার নামে তিনি তাঁর তিন সহযোগীকে নিয়ে, পথশিশুদের স্টুডিওতে এনে পর্নো ছবি তৈরি করে সেগুলো বিক্রি করতেন ইন্টারনেটের বিভিন্ন পে-ওয়েবসাইটে। আর সেইসব শিশু পর্নো বিদ্যুৎ গতিতে সরাসরি পৌঁছে যেত জার্মানি, সুইৎজারল্যান্ড প্রভৃতিতে চুক্তির ভিত্তিতে। কানাডা, জার্মানি, সুইৎজারল্যান্ড, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, মধ্য ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের নাগরিক বা গ্রাহক ছিলেন তো এই স্টুডিওরই। আর এভাবেই গ্রেপ্তার হওয়ার ঠিক আগ পর্যন্ত এক ফটোগ্রাফিক সোসাইটি গড়ে তুলে, এর ছায়ায় এভাবেই পর্নোগ্রাফির ব্যবসা চালিয়ে যান টিপু কিবরিয়া৷ মাসে তাঁর আয় ছিল ১০ লাখ টাকারও বেশি৷ যদিও পরবর্তীতে তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন।

এদিকে কিছু বছর আগেই, বাংলাদেশের এক ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটরের এক জরিপ থেকে উঠে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। সেখানে দেখা যায় ঢাকার অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা পর্নোগ্রাফির নেশায় বুঁদ। তাঁরা ছবি, ভিডিও, অডিও এবং টেক্সট আকারে এগুলোকে ব্যবহার করে, যার বড় অংশই তৈরি এই বাংলাদেশে। এই শিক্ষার্থীরা পর্নোগ্রাফি দেখে প্রধানত মোবাইল ফোন, ট্যাব ও ল্যাপটপে। আবার পেনড্রাইভ ব্যবহার করে তা করেও বিনিময়। আর পরিমণি প্রসঙ্গের রেশ টেনে র‍্যাব তো নিজেই নাকি স্বীকার করেছে যে, পরিমণি ছাড়াও ঢাকার শোবিজ জগতের প্রায় ডজনখানেক অভিনেত্রী জড়িত এই নিষিদ্ধ পর্ণ ব্যবসার সাথে।

বাংলাদেশের এক অত্যন্ত জনপ্রিয় নিউজ পেপারে ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে দেখছিলাম যে, বাংলাদেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগে মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত বিধিমালার খসড়া চূড়ান্তের কাজ সেরে ফেলেছে। কি সেই চূড়ান্ত খসড়ার এক উল্লেখযোগ্য লিখিত ঘোষণা? না মুসলিমদের জন্য মদ থাকছে অবৈধ আর অমুসলিমরা এক্ষেত্রে পড়বেন না কোনো প্রকার নিষেধাজ্ঞায়, আর ঠিক এ কারণেই আমি উপরে উল্লেখ করেছি ‘বিশেষত মুসলিমদের মদ পান, সংগ্রহ ও বিক্রি’ বাক্যটা। যাইহোক, এদিকে বিভিন্ন সংবাদ মিডিয়াতে বইছে পরিমণির পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন যুক্তি-তর্কের সাইক্লোন। তবে বিষয়টা আমার কাছে পরবর্তীতে একজন শুধুমাত্র প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী হিসেবে নয়, সে দেশের একজন স্বাধীন নাগরিক বা মানুষ হিসেবে, এ ধরণের বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত করে দেশের এই পরিস্থিতিতে তাঁকে গ্রেপ্তার থেকে রিমান্ড বা জেল, আদালত কতটা যুক্তিসংগত, সেখানেই। এ সমস্ত পদক্ষেপ আরো উপযুক্ত তদন্ত ও ফাইনাল নোটিশ দেওয়ার পরে নিলে কি খুব খারাপ কিছু হত? সর্বশেষ আমার যা মনে হয়েছে, পরিমণির প্রথম অপরাধ, তিনি কোনো সন্ত্রাসী নন, নেই তাঁর কোনো বাহিনীও। দ্বিতীয় অপরাধ, তিনি একজন বাবা-মা হারা, সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠা প্রায় নিঃসঙ্গ এক মেয়ে মাত্র, যিনি আরো সফলতার জন্যে হয়তো বাধ্য হতেন সিনেমার বাইরে গোপনেই বিশেষত বিভিন্ন বিত্তশালীদের সাথে শারীরিকভাবে ঘনিষ্ঠ হতে। আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের উপরে কারণে-অকারণে কর্তৃত্ব ফলানো তো আজ হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের জন্মগত এক অধিকার হয়ে।

তবে এই ‘আরো চাই, আরো চাই’ ধ্বনি, প্রায় দিবারাত্রি সমগ্র মন জুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ধীরে ধীরে অভিনেত্রীকে যে টেনে-হিঁচড়ে অবৈধ ও অন্ধকার জগতে নিয়ে যাচ্ছিল বা প্রায় গেছিল, এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও ইনডিসিপ্লিনড্ জীবনযাত্রা এবং আচরণ যে তাঁর আজকের এই পরিস্থিতির জন্যে অনেকাংশেই দায়ী, তা বোধহয় বেশ সত্যি। তবে বহুজনকে টাকার জন্যে ব্ল্যাকমেইল করতেন কি না? এর কোনো সঠিক তথ্য-প্রমাণ আমি এখনও উঠিনি পেয়ে। তবে দেখার এটাও যে, পরিমণির ঘনিষ্ঠদের তালিকায় উঠে এসেছে যে পুলিশ কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, আমলা, রাজনীতিবিদসহ বহু প্রভাবশালীদের নাম, তাঁদের ঠিক চিত্রটা সমাজে ঠিক কেমন? ও এনাদের অপরাধ কতটা বা তার শাস্তি কি হয়? কিংবা আদৌ এনারা অপরাধে জড়িত কি না? উল্টে অভিনেত্রী এনাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করছেন কি না?

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?

আপনার ভালোলাগা অনুযায়ী স্টার-এ ক্লিক করুন!

এই পোস্টটি রেটিং করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

No votes so far! Be the first to rate this post.