আলোচনা, সমাজ ও পরিবেশ

শারদোৎসবের সর্বজনীন তাৎপর্য ও প্রাসঙ্গিকতা

Hits: 51

0
(0)

পাভেল আমান

আপামর বাঙালি মানস আজ মেতে উঠেছে শারদোৎসবের অনাবিল আনন্দে উচ্ছাসে। প্রত্যেকের মধ্যেই স্পষ্ট প্রতীয়মান খুশির পরম অনুভূতি। সারাবছর হাপিত্যেশে বসে থেকে আবারো দুর্গা পুজোর আনন্দ চেটেপুটে নিতে সবাই কেমন আত্মহারা। যতই থাকুক মানসিক যন্ত্রণা, শারীরিক দুর্বলতা, অসুস্থতা, সামাজিক অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা ও বিবিধ সমস্যাবলী বাঙালিরা শরতের আগমনে অধীর আগ্রহে দিন গুনতে থাকে সর্বশ্রেষ্ঠ দুর্গাপুজোর।

শারদোৎসবের আবহমান ঐতিহ্য লোকাচার, ধর্মীয় রীতিনীতি, পরম্পরা বজায় রেখে বাঙালি যেন জাত ধর্ম নিমিষে ভুলে গিয়ে মানবতার বন্ধুনে একাকার হয়ে যায়। দুর্গাপুজো আজ সমগ্র বাঙালির আত্ম পরিচয়ের, পারস্পরিক মেলামেশার, সম্প্রীতির, সৌজন্যের বার্তাবাহক। এখানেই দুর্গাপুজো ধর্মীয় গণ্ডি অতিক্রম করে সর্বসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সর্বজনীন উৎসবে পরিণত। কথা বলার অপেক্ষা রাখে না দুর্গাপুজো তথা শারদোৎসব আজ রাজ্য দেশের গণ্ডি অতিক্রম করে বিশ্বের বাঙালিদের কাছে অন্যতম সর্বজনবিদিত, জনপ্রিয় উৎসবে পরিণত। যদিও বিগত বছরের মারণ ভাইরাসের নিরবধি সংক্রমনের ছোবলে মানবজাতিতে নেমে এসেছে বিপর্যয়, শঙ্কা, বিষন্নতা, হতাশা, নিদারুণ অস্থিরতার ছায়া। কর্মসংস্থানহীনতায় সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা শোচনীয় দুর্বিষহ। সামাজিক জনজীবন প্রচন্ড ক্ষতিগ্রস্ত ভারসাম্যহীন।

বিগত বছর থেকেই উৎসব পার্বণে নেমে এসেছে চরম জৌলুসহীনতা, নির্লিপ্ততা, উচ্ছ্বাসহীনতা এবং খাঁড়া হিসাবে সংক্রমণ প্রতিরোধের নিত্য সতর্কতা। অতিমারির বাড়বাড়ন্তে মানুষের জীবন আজ বড় অসহায়, নাজেহাল। সুরক্ষা বিধির আবর্তেই কেটে যাচ্ছে জীবনযাপন। তবুও অতিমারিকে সাঙ্গ করেই মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুটি গুটি পায়ে পথ চলা। এক বুক আশা, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, ভালোবাসাকে আঁকড়ে ধরে মানুষ বেঁচে আছে। সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকায় আবশ্যিকভাবে জুড়ে গেছে উৎসবের ভূমিকা। শুধু খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাটাই মানুষের জীবন নয়, হাসি আনন্দে, বিনোদন উপভোগ, মানসিক চাহিদা পূরণের মধ্য দিয়েই মানুষের জীবনযাপন। বেঁচে থাকার সার্থকতা। নৈরাশ্য, বিস্তীর্ণ শূন্যতা, পিছুটানকে ঝেড়ে ফেলে মানুষ আবারো নতুন ভাবনায় শান দিয়ে এগিয়ে চলেছে কাঙ্খিত লক্ষ্যে অভিমুখে। চলমানতায় জীবন।

তবে একটি কথা আমাদের সকলের মানতেই হবে জীবনের সুরক্ষা, সাবধানতা সর্বোপরি সংক্রমণের ভয়াবহতা থেকে নিজেদেরকে নিরাপদ রাখার স্বাস্থ্য বিধানের মেনে চলার প্রয়োজনীয়তা। সংক্রমণ এই মুহূর্তে কম থাকলেও এখনো বিলীন হয়নি। যতদিন না টিকাকরণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছেছে, সামাজিক ভারসাম্য স্থিতিশীল না হচ্ছে ততদিন জীবন-জীবিকার সুবিধার্তে আমাদের কোভিড বিধি মানতেই হবে। মুখাবরণ পরা, দূরত্ব বিধি মানা, ভীড় পরিহার করা, অকারণে বাইরে না বের হওয়া, আত্মসচেতনতা, সংযম অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার প্রচেষ্টা করতেই হবে। এখনো দীর্ঘ পথের অভিযান। সে দিক থেকে আমাদের উৎসবের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ও আনন্দটাকে নিয়ন্ত্রিত করতে হবে।

আমাদের গণ সচেতনতা, সাবধানতা, প্রতিরোধে ভাইরাস অনেকটাই কোণঠাসা, সংক্রমণহীন। আমাদের অসাবধানতা, লাগামছাড়া মনোভাব, ভিড়ের সমারোহে আবারো পূর্ণশক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে ভাইরাসের সংক্রমণ ক্ষমতা। ইতিমধ্যে দুর্গোত্সবের চতুর্থী পঞ্চমী ষষ্ঠীতে আমরা শহর মফস্বলে দেখলাম মানুষের জনজোয়ার। প্রতিমা প্যান্ডেল দর্শনের আকাঙ্ক্ষায় মানুষ বেরিয়ে পড়েছেন রাস্তাঘাটে। সেখানে নেই কোন দূরত্ব বিধির খতিয়ান। অনেকে ভাবছেন ডবল ডোজের প্রতিষেধকের রক্ষাকবচে অদৃশ্য ভাইরাসকে কাছে ভিড়তে দেবো না। কিন্তু প্রতিষেধক গ্রহণ করার পরেও দেখা গেছে অনেকে আবারো আক্রান্ত হয়েছেন। প্রতিষেধক আমাদের জীবনের বিপন্নতা, ঝুঁকিটাকে কমাবে কিন্তু সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচাবে না। সেই বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিয়ে আমাদের এবারের শারোদৎসবকেও বিধি-নিষেধের মধ্যেই পালন করতে হবে।

বিপর্যয়, সংকট, দুর্যোগ, অতি মারি একদিন কেটে যাবে, পৃথিবীতে ফিরে আসবে সুস্থতা, ভারসাম্য, স্নিগ্ধতার নির্মল পরিবেশ। আবার মানুষ হেসেখেলে আনন্দে ভেসে যাবে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে। প্রতিটি প্রাণে, মননে, জীবন ধারায় বইবে সজীব ফল্গু ধারা। ফুলে ফলে ভরে উঠবে প্রতিটি উজ্জীবিত মনুষ্যত্ব। বিধ্বস্ত, বিমূর্ষ পৃথিবী আবারো হয়ে উঠবে চিরসবুজ প্রাণবন্ত। ফিরে পাবে তার হারানো গৌরব। মনুষ্য সত্তায় জেগে উঠবে প্রাণের বিকাশ। মনুষ্য সভ্যতা আবারো হয়ে উঠবে উদ্বেলিত বিকশিত। মানুষ আবারো ফিরে পাবে উৎসব পার্বণ অনুষ্ঠানের মননশীল আনন্দ। খুশিতে মাতোয়ারা জীবনগুলো আবারও যেন চিকচিক করবে।

সামাজিক জীব মানুষ বড় অনুভূতিশীল, কর্তব্যনিষ্ঠা, বিবেকবান। পরিশেষে আবারো আমরা আপামর বাঙালিরা শারদ উৎসবের রোশনাই কে মননে মেখে সুরক্ষা বিধির মধ্যেই উপভোগ করি। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা প্রার্থনা করি মা দুর্গা যেন অসুর নাশের মতই করোনাসুরকে মানব জাতির কাছ থেকে তার দৈবশক্তি তে পরাস্ত করুক। নেমে আসুক ধরণীতে মানবিক ভারসাম্য, স্থিতিশীলতা। মলিনতা, জীর্ণতা, অসারতা, তমসার দূরীকরণে গড়ে উঠুক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সংহতি, সৌভ্রাতৃত্ব, সর্বোপরি বিশ্বমানবতা। ভুলে যাই হিংসা বিদ্বেষ, বিভাজন, জিঘাংসা সংকীর্ণতা। একে অপরের সাথে মিলেমিশে হাতে হাত রেখে গড়ে তুলি মানববন্ধন। সবার মনেই ধ্বনিত হোক মানবতার জয়ধ্বনি। উৎসব ঘুচিয়ে দিক যত বৈষম্য, বিভেদ প্রাচীর।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?

আপনার ভালোলাগা অনুযায়ী স্টার-এ ক্লিক করুন!

এই পোস্টটি রেটিং করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

No votes so far! Be the first to rate this post.