আলোচনা, রাজনীতি

অবশেষে আফগানিস্তানের ভাগ্য নির্ধারণ করবে তালিবান জঙ্গিগোষ্ঠী

Hits: 203

5
(1)

বটুকৃষ্ণ হালদার

স্বাধীনতা হলো জনগণের কাঙ্খিত ফলাফল। বহু জনগণের আত্ম ত্যাগের ফলে স্বাধীনতা আসে। স্বাধীনতার আনতে যাঁরা মৃত্যুবরণ করেন, ফাঁসি কাঠে ঝোলেন এই ভেবে স্বাধীনতার পর আমার দেশের জনগণ সুখে শান্তিতে নিরাপত্তায় জন্ম ভূমিতে বসবাস করবেন। দেশে সংবিধান গঠিত হবে, আইন ব্যবস্থা চালু হবে। কিন্তু আফগানিস্থানের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ল না। আইন ব্যাবস্থা তো দূরের কথা সেই দেশের জনগণের ইচ্ছা অনিচ্ছার মূল্য নির্ধারণ করবে জঙ্গিগোষ্ঠী তালিবান। যাদের মূল আইনর উৎস হলো বন্দুক। এক কথায় আফগানিস্থানে জনগণ কার্যত দাসে পরিণত হলো। নারী পুরুষ উভয়ের স্বাধীনতা হরণ করা হলো। এই জঙ্গি গোষ্ঠী দের কোন লিখিত আইন নেই। তাদের মুখের কথা হলো আইন। নিজেরা যথেচ্ছ ভাবে তা ব্যাবহার করবে। জনগণ কোন প্রতিবাদ করতে পারবে না। এটা কি একটা সুস্থ রাষ্ট্রের সংজ্ঞা হতে পারে? আধুনিক যুগে এসে আমরা কেউ দাসে পরিণত হওয়ার কথা চিন্তা করতে পারি না।

করোনা কেড়ে নিয়েছে শেষ সম্বল, চরম সঙ্কটে রোজগারহীন ছৌ-শিল্পীরা

এক্ষেত্রে আফগানিস্তানের তৃতীয় অংলো-আফগান যুদ্ধটি ১৯১৯ সালে সংগঠিত হয়। তিন মাস স্থায়ী হওয়া এই যুদ্ধটি সাম্যতা বজায় রেখে সমাপ্ত হয়। এ বছরেরই ৮ আগস্ট ব্রিটেন এবং আফগানিস্তান রাওয়ালপিন্ডি চুক্তি স্বাক্ষর করে, যাতে আফগানিস্তানের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয়া হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হয় ১৯ আগস্ট তারিখে। তবে ১৯২১ সালে ব্রিটিশরা সম্পূর্ণভাবে আফগানিস্তানের হাতে বৈদেশিক বিষয়গুলির নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেয়। স্বাধীনতা লাভের পর আফগানিস্তান সেজে উঠেছিল রঙিন আলোর ধারায়। ষাট সত্তরের দশকে আফগানিস্তানে ছিল সোনালী স্বপ্নের দিন। ধর্মান্ধতা নয়, আধুনিক শিক্ষায় হাতিয়ার করে তারা স্বাধীনভাবে বাঁচতে শিখে ছিল। তখন নারী-পুরুষ উভয়ের স্বাধীনতা সংরক্ষণ করা হয়েছিল। আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে রেডিও স্টেশনের বাইরে, রাস্তাঘাট সহ স্কুলে পশ্চিমা ধাঁচের পোশাক পড়ে নারীরা হেটে বেড়াত। সত্তর দশকে আফগান শিক্ষা কেন্দ্র গুলোতে মেয়েদের বিচরণ স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। ২০০৩ সালে আফগান সংবিধানের নারী ও পুরুষ উভয়ের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। আশির দশকে হিজাব বোরকা ছাড়াই মহিলারা সন্তানদের নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে ন। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তান সোভিয়েতের দখলে ছিল তখনো ও কাবুলের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে আফগান শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। সেই প্রশিক্ষণ দিতেন সোভিয়েতের প্রশিক্ষকরা। তৎকালীন সময়ে আফগান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বহু অধ্যাপক অধ্যাপনা করেছেন। সে সময় গুলো ছিল আফগানিস্তানের সোনালী দিন ছিল তা বর্তমানে দুঃস্বপ্নের অতীত হয়ে দাঁড়িয়েছে। আফগানিস্তান তৎকালীন সময়ে এক উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় দেশ গড়ে উঠেছিল। বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের সঙ্গে আফগানিস্তান ধীরে ধীরে নিজেদের গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু গত শতকের নব্বইয়ের দশকে উগ্র ইসলামপন্থী তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর সবকিছু বদলে যায়। অন্ধকারের কালো আকাশের নিমজ্জিত হয় আফগানিস্তানের সম্ভ্রম। পুরুষদের অধিকার কিছুটা খর্ব করা হলেও নারীরা চলে যায় পর্দার আড়ালে। সমস্ত কিছু থেকে তাদের অধিকার বঞ্চিত করা হয়। এমনকি শিক্ষাক্ষেত্রেও। এরপর থেকে নারীরা হিজাব বোরকা ছাড়া জনসমক্ষে যেতে পারতেন না। সত্তরের দশকের কুড়ি বছর পর শিক্ষা কেন্দ্র গুলোতে মেয়েদের পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তবে ২০০১ সালে তালেবান ক্ষমতা পতনের ১৫ বছর পরেও হিজাব বোরকা পরার চিত্র বদলাইনি।

পঁচাত্তরের ভাবনায় মাতঙ্গিনী ও নেতাজি

ইতিমধ্যে আফগানিস্তান নিয়ে বেশ হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে। সামনের কয়েকদিনের মধ‍্যেই বাজারে চলে আসবে – ‘কেন আফগানিস্তান, রুক্ষ আফগানিস্তানের দুঃখ কিসে” আফগান কি গান গায়?’, ‘সাতদিনে আফগানি শিখুন( এর লেখক দূর থেকে জনাকয়েক কাবুলিওয়ালা দেখেছেন আর ছোটবেলায় কাবুলিওয়ালা সিনেমা দেখেছেন। ব্রাহুই, কালাস নাম শোনেননি)’… এমনতর এক ফর্মা থেকে ৫০০ পাতার বই। আফগানিস্তান সবচেয়ে বিখ‍্যাত যে জিনিসটার জন‍্যে, সেটা লাজুলি। লাপিস লাজুলি। পৃথিবীর বৃহত্তম লাপিস লাজুলির সংগ্রহ এখানকার খনিতে আছে। আজ থেকে নয়, প্রায় ৭০০০ বছরের কয়েকটা খনিও এখানে আছে। এই লাপিস লাজুলি ওখানকার অভ‍্যন্তরীণ রাজনীতির একটা বড় অংশ। কি হয়না? মারামারি, দখল, মুক্তিপণ আদায়- সব। এজ‍ন‍্যে লাপিসকে অনেকসময়_”conflict mineral” বলে। প্রাচীন সভ‍্যতায় এই লাপিস ছিল আভিজাত‍্যের অহংকার। সিন্ধু-সরস্বতী সভ‍্যতা সারা পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দিতো এই লাপিস দিয়ে। একে গুঁড়ো করে পাওয়া আল্ট্রামেরিন নীল দিয়ে ভ‍্যান গগ তাঁর_”Starry night” ছবি এঁকেছিলেন। সবাই এখন আফগানিস্থানের ক্ষেত্রে অতীত।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুরা নিরাপদে বেড়ে উঠুক

নব্বইয়ের দশকে তালিবান ক্ষমতা থাকাকালীন আফগানিস্তানের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। সেখানকার মানুষজন তালিবান জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছিল। মনে পড়ে মালালা ইউসুফজাইয়ের কথা। যিনি শুধুমাত্র নারীদের শিক্ষার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল, তাকে গুলি খেতে হয়েছিল। ২০০১ সালে তালিবানের ক্ষমতার পতনের প্রধান কারণ ছিল আমেরিকা। আমেরিকা এযাবৎকাল আফগানিস্তানের নিরাপত্তা দিয়ে এসেছে। আমেরিকা বৈদেশিক শক্তির নিরাপত্তায় হস্তক্ষেপ করবে না, এই ভেবে সেনা প্রত্যাহার করতে ই পুনরায় তালিবান জঙ্গিগোষ্ঠী আফগানিস্তান দখল করে নেয়। এরমধ্যে আমেরিকার বহু সৈন্যবাহিনী ও কর্মকর্তা মারা গেছেন আফগানিস্তানে। আফগানিস্তানের সৈন সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। সেখানে মুষ্টিমেয় ৮০ থেকে ৮৫ হাজার তালিবান জঙ্গী কিভাবে আফগানিস্তান দখল করে নেয়? তবে কি আফগান সরকার এমনটাই চেয়েছিলেন? মুষ্টিমেয় কিছু জঙ্গি গোষ্ঠীর কাছে একটা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আত্মসমর্পণ করা মানে লজ্জা নয়, কাপুরুষতামিও বটে। তালিবানবান জঙ্গী গোষ্ঠীর অবস্থান দখল করার পর তারা উন্মাদ হয়ে উঠেছে। অতীতে তালেবান শাসন আর বর্তমান সময়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক। বর্তমানে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর আরো ভয়ঙ্কর ও বর্বর হয়ে উঠেছে। সমস্ত আফগান প্রায় রক্তাক্ত হয়ে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সাংবাদিক ও নারীদের অবস্থান অত্যন্ত দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে উঠেছে। ১৫ বছরের নিচে ও বিধবা মহিলাদের তালিকা চাওয়া হচ্ছে। একের পর এক নারীদের ধর্ষণ করে খুন করা হচ্ছে। নির্দ্বিধায় অকারণে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে। এলাকা দখল করতে তালিবানরা শিশু ও বয়স্কদের অপহরণ করে লড়াই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। বিদেশীরা তো বটেই সঙ্গে আফগানিস্তানের স্থানীয় জনগণ জীবন বাঁচাতে জন্মভূমি থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। চাচা আপন প্রাণ বাঁচা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্তান বাবা-মা স্ত্রী-পুত্র কেউ কারো কথা চিন্তা করছে না। তালেবানরা বিমানবন্দরগুলো কব্জা করে রেখেছে। ইতিমধ্যেই জোড়া বিস্ফোরণের জেরে রক্তাক্ত হয়ে উঠল কাবুল বিমানবন্দর চত্বর। কাবুল বিমান ভয়াবহ বিস্ফোরণে সরকারি খবর অনুযায়ী ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে এছাড়া প্রায় ১২০ জনেরও বেশী আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি। বিস্ফোরণের তীব্রতা ধ্বংস হয়ে যায় বিমানবন্দর চত্বর। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায় একাকী রক্তাক্ত মৃতদেহ। যাদের দেখে চেনার উপায় নেই। রক্তের স্রোতে ভাসছে কাবুল বিমানবন্দর আর একদিকে মানুষের তীব্র আর্তনাদ ভরে উঠেছে আকাশ বাতাস। যে মর্মান্তিক ও ভয়ংকর চিত্র দেখে স্তম্ভিতও হতবাক সমগ্র বিশ্ববাসী। আফগানিস্তানে বর্তমানের শান্তি অন্তরালে মুখ ঢাকছে। তালিবান ত্রাসে খানখান হচ্ছে আফগানিস্তানের ইতিহাস। বিভিন্ন জায়গায় প্রাচীন স্থাপত্য গুলোকে ক্রেন দিয়ে ভেঙে দিচ্ছে। সবথেকে লজ্জাজনক বিষয় হলো রাষ্ট্রের নিরাপত্তার দায়িত্বে যে সমস্ত রাষ্ট্রপ্রধানরা ছিলেন তারা পরিস্থিতি বুঝে জনগণের কথা না ভেবে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। এমন রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রকাশ্যে গুলি করে মারা উচিত।

শিক্ষক শিশু পাচারে অভিযুক্ত হলে সমাজ আজ সত্যি অন্ধকারে

একটি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান হলেন সেই রাষ্ট্রের অভিভাবক। রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো দেশের নাগরিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা। সে যেকোন মূল্যেই হোক, এমনকি নিজের জীবনের বিনিময়ে তা পালন করা তার প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু সাধারণ মানুষ বিচলিত হলেই যে রাষ্ট্রপ্রধানরা বিচলিত হবেন তেমন মনে করার কোন কারণ নেই। কারণ রাষ্ট্র যখন বিপদের মুখে অসীম ঠিক সে সময়ে রাষ্ট্রপ্রধানরা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে ন। বর্তমানে আবহে স্থানে এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে দেশের রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন সাংসদরা নিজেদের জীবন বাঁচাতে জনগণের জীবনকে বাজি ধরেছেন। গণতন্ত্রবিরোধী ধর্মীয় আচা রের হিংস্র ও বিকৃত প্রকাশের স্বতঃসিদ্ধ, নারীবিদ্বেষী, মৌলবাদী তালিবানপন্থীদের সারা পৃথিবীর মানুষ আজ স্পষ্টতই বিচলিত। যুক্তিহীন তালিবানি বর্বরতা অত্যাচার অসভ্যতা মি দেখে পৃথিবীর মানুষ যখন হতবাক তখন বেশ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এই বড় বড় উন্মাদ শক্তির পাশে দাঁড়িয়েছে। তালিবানি জঙ্গি গোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতির ঝড় বইছে। অথচ ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস যারা আজ জীবন ও মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে যে আফগান নাগরিক রা তাদের জন্য তাদের কাছে সহানুভূতি একটি বাক্য নেই। কথায় আছে কারো পৌষ মাস তো

মহিলা সমাজে দৃষ্টান্ত বহরমপুরের টোটোচালক সোনালী

কারো সর্বনাশ। একদিকে অসহায় আফগান বাসি রা চোখের সামনে প্রিয়জন হারানোর বেদনা নিয়ে চোখের জলে জন্ম ভিটে ছাড়ছেন, অন্য দিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মতো অনেকেই এই সর্বনাশের দিনে আরাম কেদারায় দোলনা দুলছে। আর পর্দার আড়াল দিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে হায়নার হাসি হাসছে। বহু বিদ্য জন, বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গ রা ভারতবর্ষ কে মুসলিমদের জন্য অসহিষ্ণু দেশ ঘোষণা করে কাদা ছিটিয়েছে। ভারতের ভাবমূর্তি কালিমা লিপ্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে, অথচ মুসলিম অধ্যুষিত দেশে মুসলিমদের দ্বারা অত্যাচারিত নির্যাতিত রক্তাক্ত মুসলিমদের জন্য সেই সমস্ত ব্যাক্তিদের খরচ করার জন্য একটি ভাষা নেই।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?

আপনার ভালোলাগা অনুযায়ী স্টার-এ ক্লিক করুন!

এই পোস্টটি রেটিং করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

No votes so far! Be the first to rate this post.