আলোচনা, স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব ও ইতিহাস

জন্মদিনে প্রাতঃস্মরণীয় ভগিনী নিবেদিতার জীবন দর্শন

Hits: 116

4.3
(3)

পাভেল আমান

দেশে জন্মগ্রহণ না করেও ভারতও ভারতবাসীকে যিনি আপন করে নিয়েছিলেন ভগিনী নিবেদিতা তাদের মধ্যে অন্যতম । স্বামী বিবেকানন্দের মন্ত্র শিষ্যা ও তাঁর আদর্শ রূপায়ণের নিরলস একনিষ্ঠ কর্মী বিদেশিনী মার্গারেট এলিজাবেথ ভারতবাসীর কাছে হয়ে ওঠেন সত্যিকারের ভগিনী নিবেদিতা ।পরাধীন ভারতবর্ষে যেখানে মানুষ পরাধীনতার নাগপাশে আবদ্ধ ,অশিক্ষা ও কুসংস্কারের বেড়াজালে জর্জরিত , দারিদ্র্য যখন মানুষের নিত্যসঙ্গী তখন স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মানুষের সেবায় তিনি যেভাবে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন তা আমাদের বিস্মিত করে ।

তাঁর আধ্যাত্মিক অনুভূতি তাকে সর্বদা আত্মজিজ্ঞাসায় আলোড়িত করত; শান্তির সন্ধানে আকুল হতো তাঁর অন্তর । তিনি গৃহ ছাড়া হয়ে বিশ্বমানবের কাছে নিজেকে মেলে ধরতে চেয়েছিলেন ।উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভাঙ্গানন শহরে ১৮৬৭ সালের ২৮ অক্টোবর মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল ওরফে ভগিনী নিবেদিতার জন্ম ।তার বাবা স্যামুয়েল রিচমন্ড নোবেল ছিলেন ধর্মযাজক। মায়ের নাম ছিল মেরি ইসাবেলা। ।পিতামাতার প্রথম সন্তান এই মার্গারেট নোবেল।শিক্ষিকার কাজের সূত্রে তিনি বুদ্ধের দর্শনে আগ্রহী হন এবং পরে স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে ।তিনি সঙ্গীত ও শিল্পকলার বোদ্ধা ছিলেন। বিবেকানন্দের বাণী তাঁকে আকৃষ্ট করে ও ভারতবর্ষকে ই তিনি কর্মক্ষেত্র রূপে বেছে নেন। ১৮৯৮ -র নভেম্বর মাসে তিনি কলকাতায় একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন ও নানা সমাজকল্যাণমূলক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

ভারতের সমস্ত নারীর জীবনযাত্রার উন্নতির লক্ষ্যে তিনি কাজ শুরু করেন ।রবীন্দ্রনাথ ,জগদীশ চন্দ্র বসু, অবলা বসু ,শ্রী অরবিন্দ, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রভৃতি মনীষীগণকে তিনি পেয়ে যান বন্ধু হিসেবে। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ‘লোকমাতা ‘আখ্যা দেন। নন্দলাল বসুও তাঁর ভারতীয় শিল্পকলার ক্ষেত্রে ভগিনী নিবেদিতার প্রেরণাকে স্মরণ করেছেন। স্বাধীনতা আন্দোলনেও তাঁর অবদান যথেষ্ট ।পরাধীন ভারতবর্ষে মানুষ যখন অশিক্ষার নাগপাশে আষ্টেপৃষ্ঠে আবদ্ধ নির্যাতিত ,তখন ভারতের সাধারণ মানুষের বন্ধন মোচন ও দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির জন্য আলোকবর্তিকা নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন ভারতে।১৮৯৮ সালের ২৮ জানুয়ারি মার্গারেট ভারতের মাটিতে পা রাখলেন। ওই বছরের ২৫ মার্চ স্বামীজি মার্গারেটকে ব্রহ্মচর্য ব্রতে দীক্ষা দিলেন। তাঁর নাম দিলেন ‘নিবেদিতা’। ওই দিন স্বামীজি নিবেদিতাকে বলেছিলেন, ‘ভবিষ্যৎ ভারতসন্তানদের কাছে তুমি একাধারে জননী, সেবিকা ও বন্ধু হয়ে ওঠ।’ তাই নিবেদিতার একমাত্র উদ্দেশ্য হল ভারতবর্ষের সেবা করা। ভারতের আধ্যাত্মিকতার আদর্শ জগৎকে চিরকাল কল্যাণের পথ দেখাবে। তাই তাঁর ভারতসেবা আসলে ছিল সমগ্র মানবজাতির সেবা।চার্চের অধীনে প্রথাগত ধর্মজীবনকে তিনি মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। ধর্ম সম্বন্ধে বিভিন্ন বইপত্র পড়ে প্রকৃত ধর্মজীবনের পথ খুঁজতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কিছুতেই শান্তি না পেয়ে ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ছিলেন। তাঁর এই হতাশা দূর হল স্বামী বিবেকানন্দের আবির্ভাবে। স্বামীজির ধর্ম ব্যাখ্যা ও ব্যক্তিত্বে মার্গারেট মুগ্ধ হলেন। মার্গারেট স্বামীজিকে গুরু বলে বরণ করে নিলেন। দুঃখ-দারিদ্রপূর্ণ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, পরাধীন যে ভারতবর্ষ চোখের সামনে রয়েছে তার আড়ালে আছে আধ্যাত্মিকতার ঐশ্বর্যে পূর্ণ ত্যাগ ও তপস্যাময় এক মহান ভারতবর্ষ। চিরন্তন ভারতবর্ষের সেই অতুলনীয় রূপ স্বামীজি মার্গারেটের সামনে তুলে ধরলেন।

ভারতবর্ষকে ভালোবাসতে শুরু করলেন মার্গারেট, ভারতীয় জীবন গ্রহণের দুর্নিবার আগ্রহ তাঁর মধ্যে জেগে উঠল।১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের সময় গোপনে বিপ্লবীদের সাহায্য করতে শুরু করেন নিবেদিতা। এই সময় অরবিন্দ ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশচন্দ্র বসু প্রমুখ বিশিষ্ট ভারতীয় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। এসবের পাশাপাশি নিবেদিতা মডার্ন রিভিউ, দ্য স্টেটসম্যান, অমৃতবাজার পত্রিকা, ডন, প্রবুদ্ধ ভারত, বালভারতী প্রভৃতি পত্রিকায় ধর্ম, সাহিত্য, রাজনীতি, সমাজতত্ত্ব, শিল্প ইত্যাদি বিষয়ে প্রবন্ধ লিখতেন। তার লেখা উল্লেখযোগ্য বইগুলি হল কালী দ্য মাদার, ওয়েব অফ ইন্ডিয়ান লাইফ, ক্রেডল টেলস অফ হিন্দুইজম, দ্য মাস্টার অ্যাজ আই শ হিম ইত্যাদি।ভগিনী নিবেদিতা ভারতের সবচেয়ে প্রভাবশালী মহিলাদের মধ্যে অন্যতম। তার বই মাতৃরূপা কালী পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর “ভারতমাতা” ছবিটি আঁকেন।নিবেদিতার স্বপ্ন ছিল-অখণ্ড ভারতবর্ষ। ভারতের গ্রাম ও নগরকে পুনরুজ্জীবিত করে সমৃদ্ধ ভারতের গঠনে যুবকদের অনুপ্রাণিত করতেন। ভারতের রাষ্ট্রীয় মুক্তিলাভই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য। ভারতের রাষ্ট্ৰীয় মুক্তি তার মতে আত্মিক মুক্তির উপায়মাত্র, তা উপেয় নয়। বিবেকানন্দ-প্ৰদৰ্শিত অদ্বৈতবাদের প্রতি তাঁর একনিষ্ঠ অনুরাগ ছিল। জগদীশচন্দ্ৰ বসু ও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। ভারতের মঙ্গলে নিবেদিতপ্ৰাণ এই বিদেশিনী রোগমুক্তির আশায় দাৰ্জিলিং-এ আচার্য জগদীশচন্দ্র ও লেভী অবলা বসুর আতিথ্য গ্ৰহণ করেন এবং সেখানেই মারা যান। একটা বিদেশী নারী যেভাবে ভারতবর্ষকে ভালোবেসে, দেশের মানুষকে কাছে টেনে নিয়ে, বড় আপন করে, আত্মোন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

তিনি চেয়েছিলেন ভারতবর্ষকে এক সুন্দর শান্তির আনন্দের বিশ্বসেরা দেশে পরিণত করা। তিনি ছিলেন ভারতীয়দের শিক্ষিত করে, সচেতন করে, কুসংস্কারের বেড়াজাল থেকে বের করে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে বিজ্ঞান যুক্তির আলোকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। তিনি চেয়েছিলেন পরাধীনতার শৃংখল থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করা এবং এক শক্তিশালী প্রগতিশীল জাতি হিসাবে ভারতীয়দের বিশ্বের দরবারে পরিচিত করে তোলা। এরকমই এক বহুমুখীন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সেবাব্রত প্রতিভূ ছিলেন ভগিনী নিবেদিতা। জন্মদিনে এই মহীয়সী, সেবিকা, সমাজ সংস্কাকরের স্মৃতির প্রতি রইল অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা ভক্তি ভালোবাসা। আমরা যেন প্রতিনিয়ত তার জীবনাচারণ, দর্শন, আদর্শ মিস্টাকে স্মরণ করতে পারে। করোনাকালে যখন মানুষ অসহায়, সংকটের মুখে আবর্তিত ঠিক সেই মুহুর্তে ভগিনী নিবেদিতার আদর্শ আমাদের সংকটমোচনের নতুন পথ দেখাবে।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?

আপনার ভালোলাগা অনুযায়ী স্টার-এ ক্লিক করুন!

এই পোস্টটি রেটিং করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

No votes so far! Be the first to rate this post.