আলোচনা, সমাজ ও পরিবেশ

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষজন ও তাদের অধিকার

Hits: 145

0
(0)

আশিকুল আলম বিশ্বাস

তৃতীয় লিঙ্গ বা তৃতীয় যৌনতা হল একটি মতবাদ যাতে এমন ব‍্যক্তিদের শ্রেণীভুক্ত করা হয়, যারা হয় নিজে অথবা সমাজের দ্বারা পুরুষ বা নারী কোনটাই হিসেবে স্বীকৃত নয়। এটি পাশাপাশি কিছু সমাজের একটি সামাজিক শ্রেণীকে বোঝায়, যে সমাজগুলো তিন বা ততোধিক লিঙ্গের শ্রেণীবিভাগ করেন। তৃতীয় পরিভাষাটি সাধারণত অন‍্য বোঝাতে ব‍্যবহৃত হয়। কিছু নৃতত্ত্ববিদগন এবং সমাজবিজ্ঞানীরা চতুর্থ এবং কিছু লিঙ্গের বর্ণনা দিয়েছেন। পাশ্চাত্য মতবাদের শ্রেণীবিভাজনগুলোর মাঝে তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ও কিছু লিঙ্গকে বোঝা যেকোনো ভাবে কঠিন হয়ে উঠতে পারে। জীববিজ্ঞান নির্ধারণ করে দেয় যে মানুষের ক্রোমোজোম এবং শারীরিক যৌনতার দিক থেকে দুধরনের হয়।, যেমন-পুরুষ, মহিলা বা এই যৌন দ্বি-দ্বন্দ্বের বাহিরে একটি অসাধারণ বৈচিত্র্য মানব সমাজে লক্ষ্য করা যায় যা কিনা আন্তঃলিঙ্গ হিসেবে পরিচিত। যাইহোক, স্বতন্ত্রভাবে নিজেকে শনাক্ত করা বা সমাজ দ্বারা চিহ্নিত করা হচ্ছে যে একজন পুরুষ, একজন নারী বা অন‍্যটি সাধারণত বিশেষ লিঙ্গের পরিচয় হিসেবে যা নির্দিষ্ট সংস্কৃতিতে লিঙ্গের ভূমিকা দ্বারা সংজ্ঞায়িত হয় যেখানে তারা বাস করে। যদিও সব সংস্কৃতিতে কঠোরভাবে লিঙ্গ ভূমিকা নির্ধারণ করা হয় না।

করোনাকালে বাবা-মায়েরাই শিশুদের প্রকৃত মননসঙ্গী

বিভিন্ন সংস্কৃতিতে তৃতীয় বা চতুর্থ লিঙ্গ খুব আলাদা জিনিস হিসেবে উপস্থাপিত হতে পারে। হাওয়ায় এর আদিবাসী মাও, যাদেরকে পুরুষ ও মহিলার মাঝামাঝি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, এমনকি তারা উভয়লিঙ্গ হিসেবে পরিচিত। দক্ষিণ পশ্চিম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঐতিহ‍্যবাহী ডিনে চার লিঙ্গের মানুষকে মানুষ হিসেবে স্বীকার করা হয়।, যেমন-স্ত্রী লিঙ্গ নারী, পুংলিঙ্গ নারী, স্ত্রী লিঙ্গ পুরুষ, পুংলিঙ্গ পুরুষ। তৃতীয় লিঙ্গ শব্দটিও ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে হিজড়া হিসেবে বর্ণনা করা হয় যারা আইনি পরিচয় অর্জন করেছে। বেশ কয়েকটি অ-পশ্চিমা সংস্কৃতিতে পাওয়া তৃতীয়, চতুর্থ এবং কিছু লিঙ্গ ভূমিকার ধারনা পশ্চিমা সংস্কৃতি এবং ধারনাগত চিন্তাধারার মূল ধারায় এখনও কিছুটা নতুন। ধারনা করা হয় যে আধুনিক এলজিবিটি বা কুইয়ার উপ-সংস্কৃতিতে বা জাতিগত সংখ্যালঘু সংস্কৃতির মধ্যে রয়েছে যা উত্তর আমেরিকার আদিবাসী সংস্কৃতির মতো বৃহত্তর পশ্চিমা সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ‍্যমান, যাদের মধ্যে দুটি আত্মার মানুষের ভূমিকা রয়েছে। মূলধারার পশ্চিমা পণ্ডিতরা, বিশেষভাবে নৃতাত্ত্বিকরা যারা নেটিভ আমেরিকান এবং দক্ষিণ এশিয়ার ‘লিঙ্গ বৈকল্পিক’ মানুষ সম্পর্কে লিখতে চেষ্টা করেছেন, তারা প্রায়ই আধুনিক এলজিবিটি সম্প্রদায়ের ভাষাতে তৃতীয় লিঙ্গ শব্দটি বোঝার চেষ্টা করে, বিশেষত আদিবাসী পণ্ডিতদের মতে, তারা সাংস্কৃতিক বিষয়গুলি না বোঝার কারনেই তৃতীয় লিঙ্গ মানুষকে ভূলভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

করোনা কেড়ে নিয়েছে শেষ সম্বল, চরম সঙ্কটে রোজগারহীন ছৌ-শিল্পীরা

বৃহন্নলা, হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা সমাজে এখনও নানাভাবে বিড়ম্বনা এবং বৈষম্যের শিকার। তবে তাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে। সরকারও তাদের সুখ স্বাচ্ছ‍্যন্দের দিকে নজর দিতে শুরু করেছে। ভারতে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর পথে বাধা বা চ‍্যালেঞ্জ এক নয়, একাধিক। সমাজ তাদের দেখে থাকে, হয় হাতের তালি মেরে, মারের ভয় দেখিয়ে ট্রেনে, বাসে টাকা আদায় করার মানুষ, কোনও বাড়িতে বাচ্চা জন্মানোর খবর পেয়ে, বাচ্চা নাচিয়ে, টাকা আদায়ের মানুষ, না হয় যৌনকর্মী কিংবা ঢোল বাজিয়ে বিয়ে বাড়িতে গান গেয়ে বেড়ায় তাদের সমগোত্রীয় হিসেবে। তবে ধীরে ধীরে তৃতীয় লিঙ্গের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানসিকতায় পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। কেরালার কোচি মেট্রো রেল কোম্পানি ভারতের মধ্যে প্রথম সংস্থা, যেখানে এই প্রথম কিছু তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থীকে চাকরি দেওয়া হয়েছে। সেখানে তৃতীয় লিঙ্গের কর্মিরা তাদের ইচ্ছামত নারী বা পুরুষের ইউনিফর্ম পরতে পারে। ভারতের সুপ্রিমকোর্ট ট্রান্সজেনডার, অর্থাৎ হিজড়া বা কিন্নর গোষ্ঠীর মানুষদের পুরুষ ও মহিলার বাইরে একটি তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সুপ্রিমকোর্টের রায়ের মাধ্যমে তৃতীয় লিঙ্গকে আইনি স্বীকৃতি দেবার পর থেকে শুধু সরকারই নয়, ভারতের অনেক বেসরকারি সংস্থা লিঙ্গ নিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করছে। সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্র ও রাজ‍্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেদের সরকারি চাকরিতে বিশেষ সুবিধা কিংবা ভোটার কার্ড, পাশপোর্ট, আধার কার্ডের ব‍্যবস্থা করতে হবে। হিজড়া সম্প্রদায় এই রায়কে ঐতিহাসিক বলে বর্ণনা করে শীর্ষ আদালতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।

রাজ্যেও করোনার ডেল্টা এবং ইউকে ভ্যারিয়েন্ট, বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন!

বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন এই রায়ের ফলে হিজড়াদের প্রতি ভারতীয় সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর পথ প্রশস্ত হতে পারে। ভারতে এতদিন সরকারি চাকরির আবেদনপত্র থেকে শুরু করে যেকোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ফর্মে আবেদনকারীর লিঙ্গের জায়গায় কেবল দুটিই বাক্স থাকত, পুরুষ বা মহিলা। এখন তৃতীয় লিঙ্গ জুড়ে, তিনটি জায়গা থাকছে। সুপ্রিমকোর্টের রায়ে হিজড়া বা কিন্নরদের আলাদা একটি লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় তাকে ঐতিহাসিক বলে বর্ণনা করেছেন ট্রান্সজেনডারদের আইনজীবী সঞ্জীব ভাটনগর। তিনি বলেছেন, পুরুষ ও মহিলার পর এরা এখন তৃতীয় একটি লিঙ্গের বলে চিহ্নিত হবেন। সেইসঙ্গে সরকারকে বলা হয়েছে, চাকরি বা ভর্তির ক্ষেত্রে ওবিসি বা সমাজের অনগ্ৰসর শ্রেণীর লোকজন যেসব সুবিধা পান, তার সবই এদেরকেও দিতে হবে। পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্স তো বটেই, রেলওয়ে স্টেশনেও তাদের জন্য আলাদা শৌচাগারের ব‍্যবস্থা করতে হবে-কারণ এই সংরক্ষণগুলো তাদের প্রাপ্য, জানান মি. ভাটনগর। সুপ্রিমকোর্ট আরও বলেছে, তৃতীয় লিঙ্গের লোকজনের জন্য সরকারকে যেমন বিশেষ সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প চালু করতে হবে, তেমনি হিজড়া বা কিন্নরদের সমাজে যে নিচু নজরে দেখা হয় সেটা পাল্টানোর জন্য জনসচেতনতা অভিযানও শুরু করতে হবে। সমাজে এককালে এই হিজড়াদের সম্মান ছিল, কিন্তু এখন প্রতি পদে পদে হেনস্থা ও বৈষম্যের শিকার হতে হয় বলেও মন্তব্য করেছেন বিচারপতি কে এস রাধাকৃষ্ণন ও এ কে সিক্রির বেঞ্চ। বিচারপতিরা তাদের রায়ে পরিষ্কার জানিয়েছেন কোনও দেশের উন্নতি বা উন্নয়ন নির্ভর করে সে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর, মানুষ কতটা অধিকার পাচ্ছেন তার উপর।

আচার্য বললেন–ভাবো, বোঝো এবং কাজে লেগে যাও

তৃতীয় লিঙ্গের সামাজিক ও আইনি অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন ডঃ স্মরজিৎ জানা, তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, হিজড়াদের অধিকার প্রতিষ্টায় আদালত ও সমাজ, দুয়েরই ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ডঃ জানার মতে, সামাজিক ও আইনি অধিকার দুটো আসলে একটা আর একটার পরিপূরক-একটাতে বদল এলে অন‍্যটাতে বদল আনাও অনেক সহজ হয়। অষ্ট্রেলিয়ার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, যেহেতু সেখানে তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি আছে তাই অন‍্য দেশের তুলনায় সেখানে ট্রান্সজেনডাররা অনেক বেশি অধিকার সচেতন। শিক্ষা ও কাজের সুযোগেও তারা মোটেও পিছিয়ে নেই। এমনকি ভারতের তামিলনাড়ু রাজ‍্যেও, সেখানে তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি না থাকা অবস্থায়ও হিজড়াদের জন্য আলাদা বোর্ড আছে। তাই ভারতের অন্য রাজ‍্যের তুলনায় তামিলনাড়ুতে তাদের অবস্থা অনেক ভালো, বলছিলেন স্মরজিৎ জানা।

মেনে চলুন, সংক্রমণকে আটকানো যাবে

হিজড়াদের পক্ষে ভারতের ন‍্যাশনাল লিগাল সার্ভিস অথরিটির করা জনস্বার্থ মামলায় সুপ্রিমকোর্ট যেভাবে এগিয়ে এসেছে, তা অভূতপূর্ব। কিন্তু আদালতের বাইরে বৃহত্তর ভারতীয় সমাজ এখন হিজড়াদের প্রতি সেই উদারতা ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিতে পারে কিনা, সেটাই এখন দেখার। ভারতে ২০১১ আদমসুমারি অনুযায়ী হিজড়াদের সংখ্যা ৫ লাখ বলা হলেও এখন তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ২০ লাখ। আমাদের রাজ‍্যে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হিসেবে ডঃ মানবী বন্দোপাধ্যায় প্রথম কৃষ্ণনগর সরকারি কলেজের অধ‍্যক্ষা হিসেবে ২০১৫ সালে যোগদান করেন। পূর্বে তিনি সোমনাথ বন্দোপাধ্যায় নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি আমাদের গর্ব। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা থাকা খুব দরকার। সুপ্রিমকোর্টের রায়কে মান‍্যতা দিয়ে তাদের সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে। তবেই আমরা সুনাগরিক হতে পারবো।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?

আপনার ভালোলাগা অনুযায়ী স্টার-এ ক্লিক করুন!

এই পোস্টটি রেটিং করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

No votes so far! Be the first to rate this post.