অপরাধ ও দুর্নীতি, আলোচনা, রাজনীতি

জনসেবা করতে গেলে রাজনৈতিক দলবদল করা কি খুব জরুরি?

Hits: 25

5
(1)

বটুকৃষ্ণ হালদার

রাজনীতি হলো রাজার নীতি অর্থাৎ একটি রাজা প্রজাদের সুখে-শান্তিতে রাখার জন্য বিভিন্ন নিয়মনীতি পালন করে থাকে। তবে বর্তমানে যেমন রাজা নেই তেমন রাজ্য পরিচালনার জন্য সুষ্ঠু নিয়মকানুন ও নেই। এখন রাজ্য গণতান্ত্রিক। গণতান্ত্রিক রাজ্যগুলো এখন রাজ্য পরিচালনা করে নির্বাচন পদ্ধতিতে জনগণের রায়ে যে রাজনৈতিক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। তবে সে সমস্ত রাজনৈতিক দল সংবিধানে প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্র শব্দের মানে কতটা বোঝে সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। বর্তমানে ক্ষমতা ও টাকার জোরে রাজনৈতিক নেতারা যথেচ্ছভাবে দেশের সংবিধানকে ব্যাবহার করে থাকেন। আর গণতন্ত্রকে গলাটিপে হত্যা করে। উদাহরণ হিসাবে বলা যেতে পারে ২০২১ সালে পশ্চিমবাংলায় ভোটপরবর্তী হিংসায় যেভাবে মানুষকে খুন-জখম ও ঘরবাড়ি ছাড়া করা হয়েছে তা এককথায় অকল্পনীয়। তবে বর্তমান রাজনীতি অত্যন্ত ঘৃণ্য নোংরা হয়ে উঠেছে সে বিষয়টা কিন্তু পরিষ্কার। এখনকার রাজনীতিবিদরা জনসেবার নাম করে মিথ্যা নাটক করেন। বেশিরভাগ রাজনৈতিক নেতারা স্বার্থবাদী হয়ে উঠেছে। যে জনগণ ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেয়, তারাই সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। আর সমস্ত সুখ-সচ্ছন্দ বিলাস বৈভব উপভোগ করেন রাজনৈতিক নেতারা। বর্তমানে আরো একটি বিষয় পরিষ্কার যে শিক্ষিত ভদ্রশ্রেণীর মানুষদের রাজনীতিতে কোনও স্থান নেই। সেই জায়গাগুলো দখল করে রেখেছে একসঙ্গে মূর্খ, নির্বোধ, গুন্ডা-মস্তান-সমাজবিরোধীরা। রাজনৈতিক নেতাদের রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যায়। গিরগিটি রঙ বদল করতে সময় নেয়, কিন্তু রাজনৈতিক নেতা-মন্ত্রীরা নিজেদের স্বার্থে রাজনৈতিক দলের জার্সি বদল করতে এক সেকেন্ডও সময় নেন না। এই বিষয়টা বর্তমানে ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন নেতা বা মন্ত্রী বছরের পর বছর রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে কুৎসা অভিযোগ গালিগালাজ করে থাকেন, পরবর্তীতে সেই রাজনৈতিক দলের জার্সি গায়ে দিয়ে পূর্ববর্তী দলের নামে বদনাম করতে থাকবে। অনেকে আবার বলতে থাকে আমি ওই দলের স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করতে পারিনি, বিকেলে বলবে আমার নিজস্ব কোনও স্বাধীনতা ছিল না দল যা বলবে তা আমাকে মেনে নিতে হতো। কিন্তু এখানে আমি স্বাধীনভাবে জনসেবা করতে পারব। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকে যায় জনসেবা করতে গেলে সত্যি কি কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হতে হয়? কিন্তু জনসভা করতে গেলে কোনও রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় না থাকলেও করা যায় তার অন্যতম নজির হল অভিনেতা সোনু সুদ। কোন নেতা, মন্ত্রী না হয়েও জনগণের হৃদয়ে ভগবানের মতো জায়গা করে নিয়েছে।

আমাদের দেশের কিংবা রাজ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর জনসেবার নমুনা নিম্নে পেশ করবো। বিগত প্রায় দেড় বছর যাবৎ অতিমারিতে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে বিশ্বের মানবসভ্যতা। লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেছেন। কান পাতলে শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল স্বজন হারানোর আর্তনাদ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও ভারতবর্ষে যখন গণচিতা, গণকবর সাজানো হচ্ছে ঠিক সেই মুহুর্তে জনসেবকের নামে ভাওতাবাজি রাজনৈতিক দলগুলো পশ্চিমবাংলায় বিধানসভা ভোটের দামামা বাজিয়ে দিলো। তাদের লক্ষ্য একটাই জনগণের জীবন জরুরী নয়, যেকোনও মূল্যেই পশ্চিমবাংলার লাগাম হাতে নিতে হবে। এর নাম কি সত্যিই জনসেবা? এই মুহূর্তে পশ্চিমবাংলায় নির্বাচনটা কি খুব জরুরী ছিল? কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? এই বিধানসভা ভোটের পশ্চিমবাংলায় কয়েকটি জঘন্যতম বিষয় হলো, বাংলার বুকে ৩৪ বছর ত্রাস সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক দল সিপিআইএমের কংগ্রেস ও সেক্যুলার সঙ্গে জোট আর নিজেদের স্বার্থে বাংলার তাবড় তাবড় নেতা-মন্ত্রীদের দলবদলের নোংরা অভিসন্ধি। নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময়ে প্রচারকে কেন্দ্র করে ধুন্ধুমার কান্ড সৃষ্টি হয় এই বাংলায়। চরম অরাজকতা ও উত্তেজনার পারদ মিনিটে মিনিটে চরম শিখরে পৌঁছেছে। ধর্ম, ধর্মের লড়াই লাগিয়ে হিংসার বাতাবরণ সৃষ্টি করেছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো। বহু রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মেরে পুঁতে দেওয়া হয়েছে নয়তো গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে, দিনের-পর-দিন কর্মীরা বাড়ি ছাড়া, এর নাম বুঝি জনসেবা। আবার দেখুন স্বাধীনতার ৭৪ বছর অতিক্রান্ত। এখনও এই ভারতবর্ষে উলঙ্গ মানুষ ঘুরে বেড়ায়। তাদের সভ্য করে তুলতে পারেনি আজও। আজও ভারতবর্ষ বহু মানুষ চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করে। অপুষ্টি অনাহারে রোগে ভুগতে হতে বহু শিশু মারা যান। আর নেতা-মন্ত্রীরা নিজেদের স্বার্থে দলবদল করে জনগণের টাকার সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। এর নাম বুঝি উন্নয়ন? কিন্তু সব থেকে মজার বিষয় হলো, ১৯৮৪ সালে কংগ্রেসের হয়ে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়ে লোকসভায় প্রথম সর্বকনিষ্ঠ সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হন, ১৯৮৯ সালে যাদবপুরে হেরে যান নলিনী ভট্টাচার্যের কাছে, ১৯৯১ ফের কংগ্রেসের হয়ে দক্ষিণ কলকাতায় বিপ্লব দাসগুপ্তকে হারিয়ে নরসিমা রাও সরকারের মানব সম্পদ দপ্তরে মন্ত্রী হন, ১৯৯৭ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করে, ১৯৯৯ সালে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের শরিক হন, ২০০১ সালের প্রথমদিকে একটি রাজনৈতিক মতবিরোধের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এনডিএ-র সঙ্গে সম্পর্ক সাময়িকভাবে ত্যাগ করেন, ২০০১ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর দল জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়, তবে সেবার এই জোট বামফ্রন্টকে পরাজিত করতে অসমর্থ হয়েছিল, ২০০৪ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি আবার এনডিএ-তে ফিরে আসেন এবং কয়লা ও খনি মন্ত্রকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তাঁর পশ্চিমবঙ্গ থেকে নির্বাচিত একমাত্র তৃণমূল সাংসদ, রাজনৈতিক জীবনে নিজে এতবার দল ত্যাগ করার পরে মমতা ব্যানার্জি বর্তমানে পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী। তৃতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন হওয়ার পর, এই পশ্চিমবাংলায় বিজেপি করার অপরাধে বহু মানুষকে মরতে হয়েছে, ঘরবাড়ি ছাড়া হতে হয়েছে। নেতা-মন্ত্রীদের দলবদল করা কোনও অপরাধ নয়, আর সাধারণ মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকারের নিজের পছন্দমত দল করেছে বলে নেমে আসে শাস্তির চরম খাঁড়া। এক্ষেত্রে বলা যায় তুম করো তো চমৎকার, আর জনগন করলেই বলাৎকার। তবে এই ধরনের দুমুখো বা তিন মুখো সাপদের জনগণ ভালোভাবে মেনে নিচ্ছে না। এদেরই কারণে বিজেপির স্বপ্নের উড়ান বিধানসভা ভোটে মাঝপথে মুখ থুবড়ে পড়েছে। আবার সমাজের নেটিজেন তথা বিদ্বজ্জনেরা এই ধরনের বেহায়াদের রাজনৈতিক-বেশ্যা বলে আখ্যায়িত করছেন।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?

আপনার ভালোলাগা অনুযায়ী স্টার-এ ক্লিক করুন!

এই পোস্টটি রেটিং করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

No votes so far! Be the first to rate this post.