অপরাধ ও দুর্নীতি, আলোচনা, সমাজ ও পরিবেশ

পুলিশের অত্যাচার ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে উঠছে

Hits: 105

0
(0)

নরেন্দ্রনাথ কুলে

হরিয়ানায় পুলিশের লাঠির আঘাতে আন্দোলনরত এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। আরও দশ জন কৃষক হাসপাতালের বিছানায়। কৃষকদের অপরাধ তাঁরা বিজেপি নেতা ও মুখ্যমন্ত্রীদের পথ অবরোধ করে প্রতিবাদ করেছে। নেতা মন্ত্রীদের পথ অবরোধ করলে পুলিশকে তৎপর হতে হবে। আবার তাঁদের এই তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে এক উচ্চপদস্থ আমলার আদেশে। আমলা ও পুলিশ কোনো না কোনো নেতামন্ত্রীদের আর তাঁদের সরকারের। এখন সবাই তা জানে। তাই কৃষক কৃষক থাকে, শ্রমিক শ্রমিক থাকে। তাঁদের পাশে আমলা বা পুলিশ-যে থাকবে তা সবসময় বলা যায় না। আসলে কৃষক-শ্রমিক-সাধারণ মানুষ থাকবে, কিন্তু তাঁরা যেন নেতামন্ত্রীদের বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। আর বাধা হয়ে দাঁড়ালে পুলিশ ও আমলার মাথা ঠিক থাকে না। এঁদের কাজ নেতামন্ত্রীকে রক্ষা করা। তাতে সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক নির্যাতিত হলে কিছু যায় আসে না। তাই নেতামন্ত্রীদের অসুবিধে বা বাধা সৃষ্টি হলে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার কথা তাঁরা ভুলে যায়। পুলিশের এই কাজে নিন্দার ঝড় উঠলেও তাঁরা কিন্তু সবসময় আদেশ পালন করে। আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখাই তো তাঁদের কাজ। নেতামন্ত্রীদের বাধা সৃষ্টি করা তো আইন ভাঙার মত কাজ। পুলিশ তখন কি চুপ করে বসে থাকবে। আর এমন অবস্থাতে তখন পুলিশ লাঠিচার্জ থেকে গুলি চালানো যা কিছু করতে পারে। তখন মনে হয় পুলিশ যেন মানুষ-সম্প্রদায়ের বাইরে। আসলে অপরাধী হলে পুলিশ শাস্তি দেবে, এ তো সবাই জানে। অপরাধের অভিযোগে পুলিশের ধরার অধিকার আছে, কিন্তু দোষ প্রমাণ হয় আদালতে। তবু কখনও পুলিশ দোষীর বিচার করে নিজেই। নিরস্ত্র জনতার প্রতিবাদ সামলাতে কখনও তাঁকে লাঠিচার্জ করতে হয়, আবার কখনও গুলি চালাতে হয়। এ ঘটনা স্বাধীনতার পর থেকে একটার পর একটা ঘটে চলে। কখনও খাদ্য চাইতে গিয়ে গুলি খেয়েছে মানুষ, আবার অন্য কোনো দাবি আদায়ে গুলি খেয়েছে। প্রশাসনের তরফ থেকে একটার পর একটা মন্তব্য করা হয় যে পুলিশ বাধ্য হয়েছে গুলি চালাতে, লাঠি চালাতে। এ ঘটনা গুজরাট থেকে বাংলা হয়ে আসাম-ত্রিপুরা পর্যন্ত একই।

তবে কি গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার বাংলাদেশের অভিনেত্রী পরিমণি?

তখন সেই পুলিশের বিচার নিয়ে প্রহসন চলে, কিন্তু শেষপর্যন্ত মানুষ আর জানতে পারে না। মানুষ কিছু জানুক আর না জানুক, মানুষ এটা জানে পুলিশ কার। তাই পুলিশ নিরীহ মানুষের ওপর কংগ্রেসের শাসনে গুলি করে, বামফ্রন্টের আমলে গুলি করে আর এখন বিজেপির শাসনে তাই, তৃণমূলের শাসনেও তাই।

বিচারের আগে পুলিশের হাতে সাধারণ মানুষের মৃত্যুদণ্ডের তালিকা কম নয়। এমনকি গুন্ডা দমনের নামে এনকাউন্টার একটা সাধারণ ব্যাপার হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি সে উত্তরপ্রদেশের এনকাউন্টার থেকে হায়দ্রাবাদ থেকে বাংলার শীতলকুচি। তবে উত্তরপ্রদেশে এই এনকাউন্টারের রেকর্ড সবথেকে বেশি। গত পাঁচ বছরে প্রায় সাড়ে আট হাজারের মত এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটেছে উত্তরপ্রদেশে। যার মধ্যে তিন হাজার তিনশোরও বেশি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আর আর মারা গেছেন একশো ছেচল্লিশ জন। স্বাধীন দেশের পুলিশ সুসংসগঠিত ক্রিমিনাল বাহিনী বলে মন্তব্য করেছিলেন এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি এ মুল্লা। সালটা 1961। সেই সময় তিনি আরও বলেছিলেন, ‘ দেশে এমন কোনো বেআইনি সংগঠন নেই যাদের অপরাধজনিত রেকর্ড সংগঠিত পুলিশ বিভাগের অপরাধের থেকে বেশি। ‘ আজকের সমাজে অপরাধ জগতের জন্য পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা আর এক অন্য কথা বলে। কারণ রাজনীতির এক অন্ধকার অপরাধের সঙ্গে মিশে থাকে। এটা আর এখন গোপন নেই। পুলিশের স্বাধীনতা ঠিক এই জায়গাতেই অনেকটা হারিয়ে গেছে।

তাই নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর রাগে গর্জে উঠে তাঁরা তাঁদের ক্ষমতা দেখায়। করোনাকালে মানুষের আইন ভাঙা আটকাতে প্রথমে পুলিশ অমানবিক হলেও পরে তাঁদের মানবিক মুখ দেখা গিয়েছিল।

দুর্বিসহভাবে দিন কাটাচ্ছেন যাত্রাশিল্পীরা

এ সবকিছু পুলিশের লকআপের বাইরের ঘটনা। আবার লকআপে পুলিশের অত্যাচার সিনেমা-নাটকে যা দেখা যায় তা কি তার বাস্তবেও ঘটে। ঘটে এবং তা দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। সরকারি হিসেব অনুযায়ী 2017 থেকে 2019 এর মধ্যে পুলিশ হেফাজতে অত্যাচরিত হয়েছেন এক হাজার একশো আশির বেশি। আবারা মানবাধিকার কমিশনের 2019এর রিপোর্টে বলছে এক হাজার সাতশো তেইশ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে পুলিশ হেফাজতে। তাঁদের 2020 সালের রিপোর্টে বলছে, পুলিশ ও জেল হেফাজতে মানুষের মৃত্যু হয়েছে সতেরো হাজারের বেশি। এই পরিসংখ্যানে আঁতকে উঠতে হয়। ন্যাশানাল ক্যাম্পেন এগেনস্ট টর্চার নামে একটি সংস্থা বলেছে দেশে এখন দৈনিক গড়ে পাঁচ জন মানুষের মৃত্যু ঘটে পুলিশ হেফাজতে।

পুলিশের অত্যাচারের অনেক কাহিনী চাপা পড়ে যায়। আবার অনেক অত্যাচার পুলিশ নিষ্ক্রিয় থেকে তাকে সহযোগিতা করে। এই চিত্র অবশ্যই অধিকাংশ রাজনৈতিক মদতপুষ্ট যার পরিসংখ্যান নথিভুক্ত হয় না। খোদ কলকাতার বুকে এক বিরোধী দলের মামুলি নেতাকে দিনের আলোয় যেভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে, তা দেখে মনে হয়েছিল সেই নেতা হয়তো হার্ডকোর ক্রিমিনাল। আসলে ক্ষমতা রাজনৈতিক ছায়ায় পুলিশ ভুলে যায় তাঁর আসল কাজ। এই ছায়ার বৃত্ত কিন্তু এখন আর গোলকধাঁধা নয়। তবু মানুষের কাছে সেই ধাঁধা চেনা। তার উত্তর তাই মানুষকেই দিতে হবে।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?

আপনার ভালোলাগা অনুযায়ী স্টার-এ ক্লিক করুন!

এই পোস্টটি রেটিং করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

No votes so far! Be the first to rate this post.