আলোচনা, সমাজ ও পরিবেশ

মৃত্যুদণ্ড নয়, প্রয়োজন এক গভীর সামাজিক ও পারিবারিক আন্দোলনের

Hits: 0

0
(0)

সাইদুর রহমান

২০০৪ সাল। অষ্টাদশী হেতাল পারেখকে ধর্ষণ করে খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত ও দোষী সাব্যস্ত ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়কে চৌদ্দ বছর জেল খাটার পর ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল। সেই সময় ধর্ষণ করে খুনের ঘটনায় কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় কম হয়নি। মৃত্যুদণ্ড কী ধর্ষণ কমাতে পারে? – এই প্রশ্নে তখন দেশের নাগরিক সমাজ দুটো শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। একদল সুনাগরিক মনে করেছিলেন ধর্ষণের কঠিনতম শাস্তি একমাত্র মৃত্যুদণ্ডই পারে দেশজুড়ে ধর্ষণ করে খুনের মতো নিকৃষ্টতম ঘটনা বন্ধ করতে। আর একদল মনে করেছিলেন ধর্ষণ করে খুনের মতো নিকৃষ্টতম সামাজিক ব্যাধি বন্ধ করতে মৃত্যুদণ্ড কোনও সমাধান নয়। এরজন্য দরকার প্রচণ্ড এক সামাজিক আন্দোলনের। ধর্ষণ করে খুনের মতো ঘটনাকে তাঁরা ধর্ষকের মানসিক ও সামাজিক ব্যাধি হিসেবে মনে করেছিলেন। তাই তাঁরা সমাজ ও মননের সুস্থ ও গঠনশীল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ধর্ষণ করে খুনের মতো সামাজিক ব্যাধি দূর করার উপর জোর দিয়েছিলেন। তারপর গঙ্গা, যমুনা দিয়ে লক্ষ কোটি গ্যালন জল গড়িয়েছে। ধর্ষণ ও খুনের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বিতর্ক আরও বেড়েছে বই কমেনি। ২০০৪ থেকে আজ আমরা ২০২০ তে এসে দাঁড়িয়েছি। এবং সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে বছর শুরুতেই আমরা ধর্ষণ করে খুনের ঘটনায় একজোড়া ফাঁসি দেখতে পাব। জানুয়ারী মাসের ২২ তারিখ দিল্লীর নির্ভয়ার ধর্ষক খুনিদের ফাঁসি দেওয়া হবে। আর ঠিক এই সময়েই গত সপ্তাহে দেশের জনগণের অস্বস্তি বাড়িয়ে এনসিআরবি (ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো)২০১৮ সালের দেশজুড়ে ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলা নারী ধর্ষণ, অপহরণ ও খুনের একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখানো হয়েছে আমাদের দেশে প্রতিদিন গড়ে ৯১টি ধর্ষণ, ৮০টি খুন, আর ২৮৯টি অপহরণের ঘটনা ঘটে। এনসিআরবি আরও জানিয়েছে শুধু ২০১৮ সালে সারা দেশে ৩৩, ২৫৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৭৯৭টি বেশি। আর সার্বিক ভাবে দেশজুড়ে মহিলাদের উপর অত্যাচারের ঘটনা ২০ হাজার, যদিও বেসরকারী মতে এই সংখ্যাটা আরও বেশি বলে ধরা হয়েছে। এনসিআরবি কেবল এফআইআর- এর ভিত্তিতেই তাদের পরিসংখ্যান পেশ করেছে। প্রসঙ্গত, থানায় ধর্ষণ, খুন ও অপহরণের যে লিখিত অভিযোগ করা হয়, এনসিআরবি- র মতে তার মাত্র ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে পুলিশ এফআইআর করে ঘটনার তদন্তে নামে। তাই এনসিআরবি-র দাবী সব অভিযোগ এফআইআর হলে ধর্ষণ, অপহরণ ও খুনের পরিসংখ্যান আরও বেড়ে যেত।

এর আগেও ধর্ষণ করে খুনের ঘটনায় ধর্ষকের ফাঁসি হয়েছে। আগামীতেও হবে। তারপরেও যে প্রশ্নটি বার বার উঠে আসে, এত কঠিন শাস্তি, মৃত্যুদণ্ডের পরেও নারী ধর্ষণ, ধর্ষণ করে খুনের মতো ঘটনা কমবে তো! এতদিনের তথ্য ও সাম্প্রতিক প্রবণতা কিন্তু বলছে কমবে না।

ধর্ষণ ও খুন দুটোই জঘন্য অপরাধ। এই অপরাধের সাথে জড়িয়ে থাকে অপরাধীর সামাজিক ও মানসিক রুচি ও বিকৃতিবোধ। অধিকাংশ অপরাধীর মনে প্রতিনিয়ত একটা কাম প্রবৃত্তি জেগে থাকে – যা অন্যকে জোর করে, নির্যাতন করে যৌনসুখ লাভের চেষ্টার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। তাদের মধ্যে ধর্ষণ ও খুন সম্পর্কে কোনও অপরাধ বোধ থাকেনা। একটি গবেষণায় দেখা গেছে বেশিরভাগ ‘সাইকোপ্যাথি’তে আক্রান্ত লোকেরা ধারাবাহিক ধর্ষণের সাথে বেশি জড়িত থাকে। ধর্ষকদের মনে মেয়েদের প্রতি তীব্র অশ্রদ্ধা, ঘৃণা, রাগ, প্রতিহিংসা ও আক্রমণাত্বক মনোভাবকেও নারী ধর্ষণের এক অন্যতম মানসিক কারণ হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। তাছাড়া মেয়েরা সহজলভ্য, ভোগ্যপণ্য, পুরুষের দাসী, যৌনসঙ্গী, অবলা – মেয়েদের সম্পর্কে এই সমস্ত সামাজিক ধারণাবোধ ধর্ষকের মনোজগতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এছাড়া নানান সামাজিক হতাশাবোধ, একাকিত্ববোধ, অপমানজনক অনুভূতি, অপ্রাপ্তি, ব্যক্তিজীবনের ব্যর্থতা ধর্ষকের জীবনে ধর্ষণের আকাঙ্ক্ষাকে বাড়িয়ে তোলে। তখন তারা জোর করে ধর্ষণ, খুন ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে আত্মতৃপ্তি অনুভব করে থাকে। নারীদের সম্পর্কে সামাজিক ও পারিবারিকভাবে পাওয়া উচ্চতর বোধ না থাকাও কিন্তু নারী ধর্ষণ ও নির্যাতনের অন্যতম একটি কারণ। আমাদের দেশে এখনও নারী পুরুষের মধ্যে অবাধ মেলামেশার সুযোগ সমাজ ও পরিবার অনুমোদন করেনা। ফলে আমাদের সমাজে নারী ও পুরুষ খোলামেলা ভাবে তাদের মনের আবেগ ও ভাবনাগুলোকে পরস্পর আদান প্রদান করতে পারেনা। তাদের মনের আবেগ, অনুভূতি ও যৌন চাহিদাগুলি মনের অবচেতনে জমে থাকে যা অনেক সময় ধর্ষণের মত নিকৃষ্ট অপরাধের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। যুগ যুগ ধরে চলে আসা নারীর প্রতি পুরুষের সামাজিক আধিপত্যবাদও সমাজে ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটাতে সাহায্য করে। দাম্পত্য জীবনে যৌন অতৃপ্তিও ধর্ষণের অন্যতম কারণ। বেশিরভাগ ধর্ষক ও ধর্ষণের সমালোচনাকারীগণ ধর্ষণ বন্ধে নারীদের দিকে আঙ্গুল তুলে অনেক সময় মেয়েদের পোশাকের দিকে ইঙ্গিত করে। এক্ষেত্রে তারা মেয়েদের অশালীন বা ছোট পোশাক, ধর্মচ্যুত হওয়া বা অনেক রাত করে বাড়ি ফেরার দিকে আঙ্গুল তোলে। এগুলোও অপরাধীর এক ধরণের মানসিক সমস্যা বলে ধরা হয়ে থাকে। ধর্ষিতার দিকে আঙ্গুল তুলে তারা নিজেকে নিপরাধ মনে করে এক ধরণের মানসিক তৃপ্তি লাভ করে।

প্রতিটি শিশুর সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা, বিশ্বাস ও আচরণ অর্জনের প্রথম ও প্রধান স্থান হল তার পরিবার। একমাত্র পরিবারই পারে একজন শিশুকে পরিপূর্ণভাবে সামাজিক জ্ঞান দিতে, তার মানসিক বিকাশ ঘটাতে। এছাড়াও আমাদের চারপাশের সামজিক পরিবেশ, ইন্টারনেট কেন্দ্রিক রঙিন দুনিয়া, হাত বাড়ালেই নীল জগত, ক্রমাগত বেড়ে চলা মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক হতাশাবোধ, দেশ ও সমাজের সামনে নারীকে ভোগ্যপণ্যে পরিণত করা, শিশু ও কিশোরের সামনে নারী শরীরের অবাধ প্রদর্শন – এগুলো বন্ধ হওয়ার প্রথম ও আশু প্রয়োজন। এরজন্য প্রয়োজন এক গভীর সামাজিক ও পারিবারিক আন্দোলনের। সামাজিক ও পারিবারিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিটি শিশুর মনোজগতে জগৎ ও জীবন সম্বন্ধে, নারী সম্বন্ধ্বে শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা বোধ, সম্মানবোধ জাগিয়ে না তুললে পরিসংখ্যানে দিন দিন নারী ধর্ষণ, অপহরণ ও খুনের মতো ঘটনা বেড়েই যাবে। তা কখনো কমবে বলে মনে হয় না।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?

আপনার ভালোলাগা অনুযায়ী স্টার-এ ক্লিক করুন!

এই পোস্টটি রেটিং করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

No votes so far! Be the first to rate this post.