আলোচনা, রাজনীতি, সমাজ ও পরিবেশ

ম্যান মেড বন্যার তকমা লাগিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা

Hits: 2

0
(0)

বটুকৃষ্ণ হালদার

এই বিশ্বে মানবসম্পদ শ্রেষ্ঠ সভ্যতা হলেও প্রকৃতিকে উপেক্ষা করার মত কোন পন্থা এখনো পর্যন্ত আবিষ্কার করতে পারেনি। কারণ প্রকৃতি চলে তার নিজের খেয়ালে। ইচ্ছা অনিচ্ছার মালিক সে নিজেই। আর সেই জন্যই তার প্রতি মানব সভ্যতার অত্যাচারের হিসাব নিয়ে চলেছে বারবার। কিছুতেই প্রকৃতি তার রোষানলের গতিপথ পরিবর্তন করছে না। এ যেন এক আলো-আঁধারির লুকোচুরি খেলা চলছে। অবশেষে প্রকৃতির থাবা র কাছে মানবসভ্যতা বিধ্বস্ত। ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে পরিবেশ পরিবর্তনের যাত্রা শুরু। তার ক্রোধে অনবরত মৃত্যুর মিছিল অব্যাহত। এরই মাঝে বেশ কয়েকটা দমকা হাওয়া তছনছ করে দিয়ে গেছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। করোনা র বিষাক্ত ছোবলে মানুষ যখন হাহাকার করে চলেছে, তারই মাঝে বিধ্বংসী ঝড়ের তান্ডব ভেসেছে সুন্দরবন, সহ পুরুলিয়া, বাঁকুড়া সহ উত্তরবঙ্গ। পরিস্থিতি যখন একটু স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করি তখনই বারবার এমন ভাবে হানা দেয় ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস। তার চরম মূল্য চুকাতে হয় ঐ সমস্ত এলাকার সাধারন নাগরিকদের। খাবার পানীয় জলের হাহাকার দেখা দেয়। বন্যার জলে প্রকোপে বিশুদ্ধ পানীয় জল নষ্ট হওয়ার ফলে জল বাহিত রোগের প্রভাব ও বেড়ে যায়। বহু শিশু অজানা রোগে মারা যান। বন্যাকবলিত এলাকা গুলো যুগ যুগ ধরে চিহ্নিত করা আছে। সময় মত উন্নয়ন করার জন্য মন্ত্রীদের তহবিলে কোটি কোটি টাকা আসে। অথচ স্বাধীনতার ৭৪ বছর অতিক্রান্ত তবুও আজও এই সমস্ত লেখা গুলো বন্যায় প্লাবিত হয় প্রতিবছর। তবে এক্ষেত্রে যদি বলা হয় কারো পৌষ মাস তো কারো সর্বনাশ। বেশিরভাগ নেতা-মন্ত্রীরা বন্যাকবলিত এলাকা গুলো উন্নয়ন করতে চায় না কারণ যতবারই এমন ভাবে তাবিত হবে ততবার তাদের তহবিলে টাকা আসবে। সেই টাকা দিয়ে নামমাত্র কিছু ত্রিপল, ত্রাণ সামগ্রী সাধারণ জনগণের হাতে ওঠে। আর বাকি টাকার কোন হিসাব নেই। কোথায় যায় সেই টাকা? আবার কোথাও কোথাও হাটু জলে দাঁড়িয়ে নেতা-মন্ত্রীরা প্রতি বছর একই রকম হবে জনগণের হাতে ভিক্ষাপাত্র তুলে দেন। আর ফলাও করে মিডিয়া সেই ছবিগুলো সংবাদমাধ্যমে পরিবেশন করতে থাকে। আর বছরের পর বছর এই ভাবে অভিনয় করা নেতা-মন্ত্রীরা হয়ে যান জনগণের করুণার পাত্র। কিন্তু প্রশ্ন, জনগণের টাকায় জনগণ কিভাবে ভিক্ষা দেওয়া টা কি সঠিক কাজ?

এই মুহূর্তে বাঙালি সবথেকে বড় উৎসব দুর্গাপূজা আসন্ন। কাশফলের মেলা, নীল সাদা মেঘের ভেলা, চারিদিকে সাজসাজ রব। প্রতিবছরের মতো এবছরও নিয়ম মেনে মা আসছেন। খুশিতে ভরে উঠেছে কচিকাচাদের মন। ঠিক সেই মুহূর্তে বন্যায় ভাসছে বাঁকুড়া পুরুলিয়া মেদিনীপুরের মত জায়গা। মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছে। এ যেন উদ্বোধনের আগেই মায়ের অকালবোধনের পালা চলছে। একদিকে মানুষ যখন নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য হাহাকার করছে অন্যদিকে নেতা-মন্ত্রীদের চলছে রকমারি ফেসবুক পোস্ট। কেউ নাচে কেউ গান গাইছে আবার কারো চলছে গদির জন্য ভোট। চমৎকার সব জনগণের সেবক। এদেরকেই মানুষ ভোট দিয়ে জিতিয়ে নেতা মন্ত্রী বানায়। সাধারণ জনগণ যখন এক বুক জলে দাঁড়িয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন সেই মুহূর্তে কেউ করে নিয়ে কেউ কেউ ট্রেনে করে পরিদর্শন করতে যাচ্ছেন। যাইহোক প্রশ্ন সেটা নয়, যাদের যা কর্ম তারা তাই করবে। এই পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে রাজ্যের একমাত্র জননেত্রী তিনি চমৎকার ভাষণ দিলেন, বললেন এই বন্যা ম্যান মেড। মিডিয়ার সামনে সামনে দোষ চাপিয়ে দিলেন ডিভিসি কে। এই মুহূর্তে এ ওর ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দায়িত্ব মুক্ত হওয়ার যুদ্ধে নেমেছে সবাই। কিন্তু সমস্যা সমাধানের উপায় কেউ বাতলাতে পারছে না। মমতা ব্যানার্জির সরাসরি মিডিয়ার সামনে বলেছে ডিভিসি রাজ্য সরকার কে না জানিয়ে জল ছেড়েছে। আমাদের জানালে আমরা নিশ্চয়ই মানুষগুলোকে নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে যেতাম। এর আগেও সিপিএমের সময় মমতা ব্যানার্জি একইভাবে এই বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এখন নিজেই সুর পরিবর্তন করছে। সম্পূর্ণ দায় চাপানোর চেষ্টা করছে ডিভিসির উপর। কিন্তু এমন ভয়াবহ দুর্যোগের সময় ডিভিসি কি সত্যিই দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ করেছেন চলুন দেখে নেওয়া যাক সেই তথ্য। দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন বিভিন্ন পদ্ধতিতে বাঁধ গুলিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য ডিভিসির বাঁধ গুলি থেকে যে জল ছাড়া হয় তা”দামোদর ভ্যালি রিজার্ভার রেগুলেশন কমিটির(ডিভি আরআরসি) পরামর্শ অনুযায়ী করা হয়, যার নেতৃত্বে আছেন মেম্বার সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশন নিউ দিল্লি। এই ডিভি আরআর সি গঠিত হয় পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ঝারখন সরকার এবং ডিভিসির চিফ ইঞ্জিনিয়ার সমতুল্য পদাধিকারীদের নিয়ে। জল ছাড়ার ক্ষেত্রে ডিভিসি কর্তৃপক্ষ একমাত্র ডি ভি আর আর সির পরামর্শ এবং নির্দেশ পালন করেন এবং জল ছাড়ার ক্ষেত্রে কত পরিমান জল ছাড়া হবে সে ব্যাপারে তাদের কোন ভূমিকা থাকে না। জল ছাড়ার নির্দেশ বাঁধ এর জল ধারণ করার ক্ষমতা র নির্দিষ্ট পরিমাণের উপর নির্ভর করে।

জল ছাড়ার আগে বন্যা সম্পর্কিত সতর্কতামূলক বার্তা অনেক আগে থেকেই চিফ ইঞ্জিনিয়ার পশ্চিমবঙ্গ সরকার, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া জেলা শাসকের এবং সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার এবং এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার দুর্গাপুর পশ্চিমবঙ্গ সরকার এদের কাছে পাঠানো হয়। এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার দুর্গাপুর, পশ্চিমবঙ্গ সরকার পুনরায় এই বার্তা হুগলি হাওড়া জেলা শাসকের এসডিও, এডিএম, বিডিও এবং অন্যান্যদের ফ্লাড ওয়ার্নিং মেমোরেন্ডাম নাম অনুযায়ী পাঠিয়ে দেন। বন্যা সম্পর্কিত বিষয়ে এই প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ করে দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন। এবার জনগণ বুঝবে কে সত্যি বলছে আর কে মিথ্যা।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?

আপনার ভালোলাগা অনুযায়ী স্টার-এ ক্লিক করুন!

এই পোস্টটি রেটিং করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

No votes so far! Be the first to rate this post.