আলোচনা, সমাজ ও পরিবেশ

স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে প্রথম কুমারী পুজো প্রবর্তন করেন

Hits: 53

তুষার ভট্টাচার্য

বাঙালির প্রাণের উৎসব দুর্গা পুজো উপলক্ষে কুমারী পুজোর প্রচলন শুরু হয়েছে সেই মহাভারতের যুগ বা সময়কাল থেকে। ‘মহাভারত ‘ গ্রন্থ থেকে জানা যায় পাণ্ডব চরিত্র বীর শ্রেষ্ট অর্জুনই প্রথম কুমারী পুজো শুরু করেন। ভদ্রকালী বন্দনায় অর্জুন প্রথম কুমারী পুজোর প্রবর্তন করেছিলেন। বস্তুত, কুমারী পুজোর প্রচলন ভারতের বিভিণ্ন প্রান্তের মঠ – মন্দিরে বহু যুগ থেকেই হয়ে আসছে ; তিন সাগর বেষ্টিত ( বঙ্গোপসাগর, আরব সাগর এবং ভারত মহাসাগরের মিলনস্থলে) কন্যাকুমারীকাতে এক সময় স্বয়ং পার্বতী আবির্ভূত হয়েছিলেন কুমারীরূপে। এই জন্যই এই জায়গাটির নাম কন্যাকুমারীকা হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে।

এই প্রসঙ্গে পুরাণে বর্ণিত রয়েছে -যে ত্রিভুবন জয় করে বানাসুর অবশেষে দেবলোক আক্রমণ করলেন। তাঁর এই হঠাত্‍ আক্রমণে দেবতারা প্রমাদ গুনলেন। তাই বিষ্ণুর পরামর্শে দেবরাজ ইন্দ্র যজ্ঞ শুরু করলেন। সেই মুহূর্তে যজ্ঞাগ্নি থেকে আবির্ভূত হলেন এক কুমারী কন্যা। অপরাজেয় বানাসুরকে বধ করবার সমস্ত শক্তি রয়েছে এই কুমারী কন্যার। জন্মের পরে এই কুমারী কন্যা, নীলকণ্ঠ দেবাদিদেব মহাদেবকে স্বামীরূপে পাওয়ার ব্রত বা বাসনা নিয়ে দক্ষিণের সাগরতীরে তপস্যায় বসলেন। কিন্তু দেবী কুমারী না থাকলে বানাসুর নিধন হবে কীভাবে ? তাই দেবর্ষি নারদ অনুরোধ উপরোধ করে দেবীকে রাজি করালেন যতক্ষণ না বানাসুর বধ না হয় ততক্ষণ যেন তিনি বিবাহের জন্য তপস্যা না করেন। সেইমত কুমারী পার্বতী যুদ্ধে দেবাসুরকে পরাজিত করলেন। যুদ্ধের জায়গাটি বানতীর্থ নামে প্রসিদ্ধ লাভ করেছে।

কুমারী পুজো মূলত দুর্গাপুজোরই অঙ্গ এবং দেবী দুর্গা হিসেবেই কুমারীদের পুজো করা হয়ে থাকে ভক্তি উপাচারে। এক থেকে ষোল বছর বয়স পর্যন্ত ঋতুমতী না হওয়া অবিবাহিতা কুমারী কন্যারাই এই পুজো পাওয়ার যোগ্য। তাদের বয়সানুসারে এই কুমারী কন্যাদের শাস্ত্র অনুসারে বিভিণ্ন নামে অভিহিত করা হয়। যেমন এক বছরের কুমারীর নাম সন্ধ্যা, দু’বছরের কন্যার নাম সরস্বতী, তিন বছরের নাম বর্ষা, চার বছরে বালিকা, পাঁচ বছরে সুভগা, ছ’বছরে উমা, সাত বছরে মালিনী, আট বছরে কুঞ্জিকা, নয় বছরে কাল সন্ধ্যা, দশ বছরে অপরাজিতা, এগারোতে রুদ্রাণী, বারোতে ভৈরবী, তেরোতে মহালক্ষ্মী, চোদ্দোতে পঠি নায়িকা, পনেরোতে ক্ষেত্রজ্ঞা এবং ষোলোতে অম্বিকা।

দুর্গাপুজোয় সপ্তমী, অষ্টমী এবং নবমী তিথিতে কুমারী বালিকাকে দেবীজ্ঞানে পুজো করা হয়।

এই পুজোয় কুমারীকন্যাকে স্নান করিয়ে নতুন কাপড়, ফুলের মালা, অলঙ্কার, মুকুট পড়ানো হয় এবং পায়ে আলতা, কপালে চন্দনের টিপ পড়ানো হয়। যতক্ষণ না পুজো শেষ হয় ততক্ষণ কুমারীকন্যাকে উপবাসী থাকতে হয়।

কুমারী পুজো আসলে চিন্ময়ীরূপ হিসেবে কল্পনা করে দেবীদুর্গার আরাধনা।

প্রসঙ্গত, ১৯০১সালের ১৮ অক্টোবর বেলুড় মঠে স্বামী বিবেকানন্দ প্রথম কুমারী পুজো শুরু করেন। এই পুজো করা হয়েছিল স্মৃতি শাস্ত্রকার রঘুনন্দনের সৃষ্টি তত্ব অনুসারে। পুজোর সংকল্প হয়েছিল মা সারদা মায়ের নামে।

আজও বেলুড় মঠে কুমারী পুজোর প্রচলন রয়েছে।