আলোচনা, সমাজ ও পরিবেশ

গৃহবন্দী গ্যালিলিও, গৃহবন্দী তসলিমা, না গৃহবন্দী মনুষ্যত্ব?

Hits: 113

0
(0)

তন্ময় সিংহ রায়

ধর্ম বনাম বিজ্ঞান, সাপ আর নেউল-এর এই তীব্র দ্বন্দ্ব আজ আর নতুন কোনো বিষয় নয়, এর উৎকৃষ্ট এক ঐতিহাসিক সাক্ষী হয়ে আজও অনড় দাঁড়িয়ে আছেন সেই গ্যালিলিও গ্যালিলেই। ফলস্বরূপ শেষ পর্যন্ত বিজয়ের শিরোপাটা ছিল কিন্তু সেই বিজ্ঞানেরই। এমনকি একবিংশ শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী ও বিগ ব্যাং তত্ত্বের প্রবক্তা বিশ্বখ্যাত পদার্থবিদ স্টিফেন হকিংও পর্যন্ত এই বিতর্কে অবস্থান নিয়েছিলেন বিজ্ঞানের পক্ষেই। আর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গিলেটিনের চাপে পড়ে জীবন ও মহৎ লক্ষ্য পূরণের নিদারুণ ইচ্ছের ধড় থেকে মুন্ডু আলাদা হয়ে যাওয়াটাও নিছক নতুন কোনো ঘটনা নয়, যার উল্লেখযোগ্য ও জীবন্ত নজির হয়ে আছেন সেই গ্যালিলিও, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, বর্তমানে তসলিমা নাসরিন প্রভৃতি। এ হল কিছু চরম স্বার্থান্বেষী ও অন্ধ মানুষ দ্বারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সৃষ্ট, সেই প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা ঈর্ষা এবং হিংসার এক অতি উত্তপ্ত ও ধ্বংসাত্মক আবহাওয়া।

বিশ্বভারতীর উপাচার্যের কাছে কবিগুরুর আদর্শ নেই

মানবদেহ যেমন ৬০ শতাংশ পরিপূর্ণ জলে, ঠিক তেমনই, আনুমানিক ধর্মের প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পরিপূর্ণ কল্পনায় এবং এগুলো বংশপরম্পরায় চলে আসা এক দৃঢ় বিশ্বাস। পাশাপাশি বিজ্ঞান হল সঠিক পর্যবেক্ষণ, কারণ অনুসন্ধান, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সঠিক তথ্য-প্রমাণ ও যুক্তির সংমিশ্রণ, যেখানে কল্পনার স্থান সীমিত।

খ্রিস্টীয় ২ শতাব্দীতে টলেমী বলেছিলেন, ‘পৃথিবী স্থির রয়েছে, আর সূর্যসহ সব গ্রহ আবর্তিত হচ্ছে একে ঘিরে। ‘ পরবর্তীকালে বিশ্ববিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর বিশ্বপ্রসিদ্ধ ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছাত্র অ্যারিস্টটলও বলে গেছেন সেই একই কথা, বা পোষণ করেছেন একই ধারণা। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, এই ভ্রান্ত মতবাদ চলে আসছিল প্রায় দু’ হাজার বছর ধরে, এবং বিশেষত শিক্ষিত মানুষ থেকে মানুষে এর সংক্রমণ পৌঁছে গেছিল প্রায় মহামারি আকারে। কিন্তু ইতালীয় সেই বিশ্ববন্দিত জ্যোতির্বিজ্ঞানী, পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ, দার্শনিক ও লেখক গ্যালিলিও কিন্তু আদৌ ছিলেন না এই মতবাদে বিশ্বাসী। বরং তিনি আর্যভট্ট, অল বিরুনী ও আর্কিমিডিসের মতই প্রবলভাবে বিশ্বাসী ছিলেন যাজক নিকোলাস কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদে, অর্থাৎ পৃথিবীসহ সব গ্রহই প্রদক্ষিণ করছে সূর্যকে কেন্দ্র করে। কিন্তু দীর্ঘদিনের এক শক্ত-পোক্ত বিশ্বাসকে, নতুন একটা বিশ্বাস দিয়ে হঠাৎই ভেঙে ফেলা যে সহজ কাজ নয়, এও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন বোধকরি হাড়েহাড়ে।

‘দ্য ফ্লাইং বব’: অলিম্পিপের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ লাফটি দিয়েছিলেন যিনি

এদিকে সে সময়ের বুকে দাঁড়িয়ে ক্যাথলিক চার্চের ক্ষমতাশালী পোপরা বিজ্ঞানের বিরোধিতা করতেন একেবারে সরাসরিই।

পাশাপাশি বাইবেলের যুক্তিভিত্তিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিয়ে তাঁরা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতেন প্রায় সবকিছুকে বলাটাই এখানে যুক্তিসংগত। অর্থাৎ কোনো বিষয় যদি বৈজ্ঞানিক যুক্তি-তথ্যের ভিত্তিতে প্রমাণিত হয়েও যায় নির্ভুল সত্যি বলে, তাতেও ছিল তাঁদের তীব্র আপত্তি। বলা যেতে পারে এও সেই এক ধরণের ঈর্ষা, হিংসা, দম্ভ ও ধর্মান্ধতা, যা সমাজের দু’একটা বিশেষত নির্দিষ্ট ধর্মের ডি এন এ-এর মাধ্যমে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আজও হয়ে আসছে বহাল তবিয়তে সঞ্চারিত। যাইহোক, সার কথা, বিজ্ঞানীদের কোনো যুক্তি, প্রমাণ, তথ্য সঠিক প্রমাণিত হলেও দৌড়ে বা লাফিয়ে কোনওভাবেই তা এগিয়ে যাওয়া যাবে না বাইবেলের বিপরীতে। আর যদিও বা ভুলবশতঃ গেল এগিয়ে, তো তাঁদের জীবনে নেমে আসতো অকল্পনীয় এবং অসহনীয় অত্যাচার, এমনকি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত, এবং এসবের ব্যতিক্রম কিন্তু আদৌ হয়নি গ্যালিলিওর ক্ষেত্রেও।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রধান কারণ খুজঁতে হবে জনগণকে

১৬৩২ সালে ফ্লোরেন্স থেকে ইতালিয়ান ভাষায় গ্যালিলিও প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত বই ‘ডায়ালগ কনসার্নিং দ্য টু চিফ্ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস্’, যে বইটা ছিল তিন ব্যক্তির মধ্যে কথোপকথনের উপর ভিত্তি করে। কেমন ছিল সেই কথোপকথন? না সেখানে একজন ব্যক্তিকে লেখক কথা বলিয়েছিলেন কোপারনিকাসের সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্বকে সমর্থন করে, তো অপরদিকে অন্যজন বা দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রাণপণে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন যেভাবেই হোক সেই যুক্তিগুলোকে সপাটে আঘাত করে খন্ডন করার, আর তৃতীয় ব্যক্তি ছিলেন নিরপেক্ষ ভূমিকাতেই। কিন্তু বইটা প্রকাশ পাওয়ার সাথে সাথেই এক তীব্র দুশ্চিন্তা ও আতঙ্ক যেন গ্রাস করতে শুরু করে চার্চ প্রধানদের, তাঁদের ভয় ছিল এই যে, এই তত্ত্বের বিরুদ্ধে যথাশীঘ্র ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে, বিশেষত পরবর্তীতে তা প্রোটেস্ট্যান্টদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে বাধা পাবে প্রবলভাবে ও বাইবেলের প্রতি বিশ্বাস হু হু করে কমে যাবে বহু মানুষের। এরপর গ্যালিলিওকে তাঁরা সরাসরি ডেকে পাঠান রোমের পবিত্র দপ্তরে, ও দমননীতি গ্রহণের মাধ্যমে আদেশ জারি করেন যে, কখনই তিনি এ মতবাদ মেনে চলতে কিংবা এর স্বপক্ষে পারবেন না প্রচার করতে। এমনকি শারীরিকভাবে অত্যাচারের হুমকি দিয়ে তাঁকে দিয়ে স্বীকারও করানো হয় যে, তিনি তাঁর ডায়ালগ বইতে সমর্থন করেছেন কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদকেই, এবং বৃদ্ধ বয়সেও গ্যালিলিওকে দিয়ে ঘোষণা করতে বাধ্য করানো হয়, ‘আমি ফ্লোরেন্সের পরলোকগত ভিনসেঞ্জো গ্যালিলেই-এর পুত্র ৭০ বছর বয়স্ক গ্যালিলিও গ্যালিলেই আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে শপথ করছি যে, সূর্যই মহাবিশ্বের কেন্দ্রস্থল এবং স্থির, এই ভ্রান্ত ধারণা আমি ত্যাগ করছি ও উক্ত ভ্রান্ত ধারণা বা তথ্য সমর্থন, প্রচার বা ঘোষণা করা থেকে আমি বিরত থাকবো যথাসম্ভব। ‘

কেউ কথা রাখে না, ভোটের পর জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের ঈশ্বর ভাবেন!

যদিও ১৬১২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর লেখা ‘লেটারস অব সানস্পটস’ নামক পুস্তিকা থেকেই সূত্রপাত পোপের সাথে ঠান্ডা লড়াইয়ের, যে বইয়ের মূল বিষয়বস্তু হল, সূর্য নিখুঁত নয়, বরং এর গায়ে আছে কালো কালো দাগ, যাকে তিনি অভিহিত করেছেন সৌরকলঙ্ক বলে। অবশেষে ধর্মদ্রোহীতার গুরুতর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে তাঁকে করা হয় গৃহবন্দী। এরপর নানান দুঃখ, শারিরীক ও মানসিক কষ্ট-যন্ত্রণা এবং অভাব-অনটনের করাল গ্রাসে পড়ে এই অসুস্থ ও কালজয়ী, মহান বিজ্ঞানী অনির্দিষ্টকাল ধরে কারাগার থেকে এক পুরোহিতের বাড়ি ও শেষমেশ ইতালির অন্যতম এক ঐতিহাসিক শহর সিয়েনায় তাঁর নিজের বাসভবন আরসেত্রিতে গৃহবন্দিত্ব কাটিয়ে ১৬৪২ খ্রিস্টাব্দের ৮ জানুয়ারি করেন মর্মান্তিক মৃত্যুকে অনিচ্ছাকৃত বরণ। বলাবাহুল্য মৃত্যুর তিন বছর আগে তিনি হয়ে গিয়েছিলেন সম্পূর্ণভাবে অন্ধ।

সঠিক পরিকল্পনা না হলে শিক্ষা বাঁচে না

ভাবলে অবাকও হয়ে পড়ে বিষ্ময়ে হতবাক যে, শেষমেশ কোপার্নিকাসের তত্ত্বের সমর্থনে গ্যালিলিওর তত্ত্ব যে একেবারে সঠিক, ক্যাথলিক গির্জা কর্তৃপক্ষ এটা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন গ্যালিলিওর মৃত্যুর ৩৫০ থেকে ৫১ বছর পর, অর্থাৎ ১৯৯২ সালে। কিন্তু সত্যি হল সেই আগুন, যাকে ছাই চাপা দিয়ে রাখা যায়নি কোনও দিনও, আর ভবিষ্যতেও যাবে না রাখা।

এদিকে প্রায় সেই একই ফ্লেভার। অর্থাৎ রাজনীতি ও ধর্মের অপারেশন থিয়েটারের টেবিলে নিয়ে, অবৈধভাবে দিনের পর দিন ধরে অজস্র ও ইচ্ছেস্বাধীন কাঁটাছেড়ার মাধ্যমে রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত করার পরেও যে মানুষটার জীবন সমাজের মানুষের জন্যে উৎসর্গীকৃত? নিজের জন্মভূমি থেকে ২৭ টা বছর নির্বাসিত হয়ে, সেই স্থানে ফেলে আসা অমূল্য সব স্মৃতিগুলোকে প্রতিদিন, প্রতিরাত দু’বাহুতে আজও আঁকড়ে ধরে, অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণা, দুঃখ, কষ্ট নিয়েও যে মানুষটা আজও নির্ভীক সংগ্রামে রত মানুষের আগামীর ভালোর জন্যে? নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, শান্তি ও বিলাস-বৈভবকে আজও প্রতিমুহূর্তে নির্দ্বিধায় গলা টিপে হত্যা করেও যে মানুষটা অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকে অবিচল? তাঁর আদর্শ, চিন্তাধারা, দূরদর্শিতা, বুদ্ধ্যঙ্ক, শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বুদ্ধি, যুক্তি-তর্ক, মনুষ্যত্ব, বিজ্ঞান, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ-এর ওজন যে সবাই পারবে না বহন করতে, এটাই কিন্তু স্বাভাবিক।

সৌজন্যতা হারাচ্ছে রাজনীতি

সর্বশেষ বলার এই যে, হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা জৈন, ইহুদি হওয়া তো সোজা, কিন্তু মানুষ হওয়া বেশ কঠিন। ধর্ম কমলে, এ পৃথিবীর বিশেষ কিছু আসে যাবে না, বরং মানুষ ক্রমশঃ কমলে, এ পৃথিবী নিশ্চিত ধ্বংসের এও হবে এক উল্লেখযোগ্য কারণ। হোমোহাবিলিসরা কিন্তু না ছিল হিন্দু, না বৌদ্ধ না পারসিক, আর না ছিল ধর্মযুদ্ধে রত। কিন্তু হোমোস্যাপিয়েন্সদের ধর্ম ৪৩০০, আর বিশ্বের বিভিন্ন ভূমি টাটকা লাল রক্তে স্নান করেছে ঠিক সে সময়েই। সেই আদিকাল থেকেই নানান সংষ্কারও কিন্তু করে আসছে এই মানুষই, সমাজ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রয়োজনে সর্বক্ষেত্রেই সংষ্কার অত্যাবশ্যক, আর বিজ্ঞান বোধহয় হিংসে করেনা ধর্মকে, বিপরীতে বিজ্ঞানই বরং চরম শত্রু কাল্পনিক ধর্মের।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?

আপনার ভালোলাগা অনুযায়ী স্টার-এ ক্লিক করুন!

এই পোস্টটি রেটিং করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

No votes so far! Be the first to rate this post.