আলোচনা, খেলা

লড়াই এবার জাতপাতের ডিফেন্স ভাঙার

Hits: 131

3.7
(3)

দীপক সাহা

এই প্রথমবার অলিম্পিক্সের নক আউট পর্যায়ে পৌঁছতে পেরেছে ভারতের মহিলা হকি দল। শেষ ম্যাচে ব্রিটেনের সঙ্গে জিতলে পদকটাও চলে আসত। জাত-ধর্ম-বর্ণের ঐক্যের প্রতীক ভারতীয় মহিলা হকি দল দূরন্ত লড়াই করেও পরাজিত হয়। খালি হাতে ফিরলেও রানি রামপালদের দুরন্ত পারফর্ম্যান্সকে কুর্নিশ জানাচ্ছে সারা দেশ। দেশের প্রধানমন্ত্রীও মহিলা হকি দলকে বাহবা জানিয়েছেন।

কিন্তু এরই মধ্যে ভারতে বহু যুগ ধরে লালিত পালিত সামাজিক ব্যধি ‘জাতের নামে বজ্জাতি’র বিষবাষ্প চাগাড় দিয়ে উঠেছে। জাতপাত, ধর্মের ভেদাভেদ এখনও দেশের বেশ কয়েকটি জায়গায় প্রবলভাবে স্বমহিমায় বিরাজমান। ডিজিটাল ইণ্ডিয়ার তকমার আড়ালে ব্রাহ্মণ্যবাদ ও মনুবাদের হুমকি এখনও দেশের কোণায় কোণায় প্রশ্রয় পাচ্ছে। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রায়ই সেই কুৎসিত ও বর্বর খবর ও ছবি আমাদের হৃদয় ও মননকে বিদ্ধ করে। সেই কুপ্রভাব এতটাই যে, সেখান থেকে রেহাই দেওয়া হয় না অলিম্পিকে অংশ নেওয়া অ্যাথলিটের পরিবারদেরও। যাঁরা দেশের পতাকাকে সবার উপরে তুলে ধরতে নিজেদের নিংড়ে দেন, তাঁদের পরিবারকেই এমন দুর্বিসহ ঘটনা সহ্য করতে হয়।

টোকিও অলিম্পিক্সে মেয়েদের বক্সিং-এর ওয়েল্টার ওয়েট বিভাগ। ব্রোঞ্জ জিতলেন লভলিনা বড়গোঁহাই। মুহূর্তে গুগল ভরে গেল একটি নির্দিষ্ট সার্চ-এ। লভলিনার ট্রেনিং বা কেরিয়ারের ব্যাপারে নয়, মানুষ খুঁজছে লভলিনা কোন ধর্ম সম্প্রদায়ের– হিন্দু না মুসলিম না ক্রিশ্চান! টোকিও অলিম্পিক্সে মেয়েদের ব্যাডমিন্টন সিঙ্গলস। ব্রোঞ্জ জিতলেন পিভি সিন্ধু। বহু মানুষ, বিশেষত উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান ও হরিয়ানা থেকে গুগলে সার্চ করতে শুরু করলেন, সিন্ধু কোন জাত– ব্রাক্ষণ না কায়স্থ না অন্য কিছু। হায়রে বিবেকানন্দের ‘আমার ভারত অমর ভারত’!

লভলিনা আর সিন্ধু-র তাও কপাল ভালো, শুধু গুগল সার্চের ওপর দিয়ে গিয়েছে। কিন্তু বন্দনা কাটারিয়ার শিকার হলেন চরম জাতি বিদ্বেষের। ভারতের মহিলা হকি টিমের এই সেন্টার ফরোয়ার্ডের বাড়ি হরিদ্বার থেকে ১৪ কিমি দূরে রোশনাবাদ গ্রামে। এ বারই প্রথম অলিম্পিক্স হকিতে সেমিফাইনালে উঠেছিল ভারতীয় মহিলা হকি টিম। বন্দনা নিজেও চমৎকার পারফর্ম করেন, অলিম্পিক্সের ইতিহাসে প্রথম ভারতীয় মহিলা হকি খেলোয়াড় হিসেবে তিনি হ্যাটট্রিক-ও করেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। ইতিহাস তৈরি করেন। কিন্তু সেমিফাইনালে আর্জেন্তিনার কাছে হেরে যেতেই বন্দনার রোশনাবাদের বাড়ির সামনে বাজি ফাটানো শুরু হয়! এই উল্লাসের কারণ খুব স্পষ্ট– দলিত মেয়ে-র টিম হেরে গিয়েছে। এর সাথে সাথে উড়ে আসে ‘জাত’ তুলে অশ্রাব্য গালিগালাজ। এমনকি বন্দনা-কে ব্যক্তিগত ভাবেও কুরুচিকর ভাষায় আক্রমণ করা হয়।

এই সন্ত্রস্ত অভিজ্ঞতার কথা পুলিশকে জানাতে গিয়ে বন্দনার ভাই চন্দ্রশেখর কাটারিয়া বলেন, আর্জেন্তিনার বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল ম্যাচ শেষ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি জানলা দিয়ে দেখেন, দু’জন লোক মোটর সাইকেলে চেপে তাদের বাড়ির চারদিকে ঘুরছে। তারাই বাজি ফাটায় ও কাটারিয়া পরিবারের জাত নিয়ে নানা অশ্লীল মন্তব্য ছুঁড়তে থাকে। তারা চিৎকার করে বলতে থাকে যে, দলিত সম্প্রদায়ের বেশি খেলোয়াড়কে টিমে নেওয়া হয়েছে বলেই ভারত হেরে গেল! তারা এটাও বলে যে শুধু হকি নয়, অন্যান্য সব খেলা থেকেই দলিত সম্প্রদায়ের খেলোয়াড়দের বাইরে রাখা উচিত। বন্দনার পরিবারের সদস্যরা এমনই অভিযোগ করেছেন যে তাঁরা মানসিকভাবে বিধ্বস্ত পড়েছেন।

চন্দ্রশেখর জানান, ওই দু’জনকে তিনি চেনেন। তারা আশেপাশেরই বাসিন্দা ও তথাকথিত ‘উঁচু জাত’। চন্দ্রশেখর এরপর থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। স্থানীয় থানার পুলিশ আধিকারিক লখপত সিং বুতোলা জানিয়েছেন, বন্দনার ভাই চন্দ্রশেখরের অভিযোগের ভিত্তিতে বিজয়পাল, সুমিত চৌহান এবং কয়েকজনের বিরুদ্ধে তফসিলি জাতি ও উপজাতি আইনের একাধিক ধারা এবং ভারতীয় দণ্ডবিধির ৫০৪ ধারায় (শান্তিভঙ্গের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান) মামলা রুজু করা হয়েছে। ইতিমধ্যে বিজয়পালকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

বাবার অমতেই হকিকে বেছে নেওয়া। বাবা নাহার সিং কাটারিয়া ছিলেন কুস্তিগীর। কখনও চাইতেন না মেয়ে হকি খেলোয়াড় হোক। কিন্তু দরিদ্র দলিত বাবার মেয়ে বন্দনার মন পড়েছিল সেই হকি স্টিকেই। বাবার চোখরাঙানিকে উপেক্ষা করেই নিজের লক্ষ্যে এগিয়ে যান। ছোট থেকেই দুষ্টুমি করতেন বন্দনা। উত্তরাখণ্ডের গ্রামে গাছের ডালে ডালে চড়ে বেড়াতেন। একটা গাছের ডাল থেকে আরেকটা গাছের ডালে লাফিয়ে যেতেন। এটাই ছিল তাঁর খেলা। আর সেই খেলাই এখন তাঁকে হকিতে সাহায্য করছে। একটা গাছের ডাল থেকে আরেকটা গাছের ডালে লাফ দেওয়ার ফলে বন্দনার রিফ্লেক্স ছোট থেকেই অনেক ভাল। শরীরকেও দ্রুত সরাতে পারেন। যা তাঁকে খেলায় সাহায্য করে।

তিন মাস আগে প্রয়াত হয়েছেন নাহার সিং কাটারিয়া। জাতীয় দলের শিবিরে থাকার সুবাদে বাবার শেষকৃত্যে হাজির থাকতে পারেননি। অলিম্পিকের আসরে মেয়ের দাপুটে পারফরম্যান্স দেখে যেতে পারেননি বন্দনার বাবা। হকিতে দেশকে সাফল্য এনে দিয়ে উত্তরাখণ্ডের মুখ উজ্জ্বল করাই লক্ষ্য বন্দনা কাটারিয়ার। দেশের জন্য আপ্রাণ লড়াই ও ত্যাগ স্বীকার করার পরেও এই প্রতিদান পেলেন বন্দনা দেশের একাংশের নাগরিকদের। সত্যিই কী বিচিত্র আমার দেশ!

এই ঘটনা শুনে প্রবল ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রানি। এই ঘটনাকে ‘হৃদয়বিদারক’ আখ্যা দিলেন মেয়েদের দলের অধিনায়ক রানি। তিনি বলেছেন, ‘বন্দনার পরিবারের সঙ্গে এমন ঘটনার কথা শুনে সত্যি খারাপ লেগেছে। ওর বাবা মারা গেছে সম্প্রতি এবং অ্যাথলিটদের আবেগের ব্যাপারটা কেউ বোঝে না। অলিম্পিক্সের আগে ট্রেনিং মিস হয়ে যাবে বলে বাবার অন্তেষ্ট্যিতে যায়নি বন্দনা। আমি জানি না মানুষ কেন এসব করে। ’ রানি আরও বলেন, “আমরা প্রত্যেকেই দেশের বিভিন্ন অংশ থেকে আসি। কেউ হিন্দু, কেউ মুসলিম, কেউ শিখ কিন্তু আমরা সবাই ভারত এবং জাতীয় পতাকার প্রতিনিধিত্ব করি, কোনও রাজ্য বা ধর্মের নয়। ”

এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার সাথে সাথেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় দলিত এবং তথাকথিত পিছিয়ে থাকা অংশের মানুষদের ভারতে ঠিক কী অবস্থা তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠে যায়। দলিতদের উপর শারীরিক মানসিক অত্যাচার বেড়েই চলেছে। তাঁদের কোণঠাসা করে দেওয়ার ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে। ইতিবাচক দিক, বন্দনা ও তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন বহু মানুষ। টুইট করেছেন অনেকে। বন্দনার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স, প্রথম মহিলা হকি খেলোয়াড় হিসেবে অলিম্পিকে হ্যাটট্রিক– এগুলো তুলে ধরে প্রতিবাদে ফেটে পড়েন বেশ কিছু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। অনেকে বলছেন, ‘শুধু দলিত বলেই একজন জাতীয় হিরোকে এ ভাবে অপমানিত হতে হল। ’ অনেক আবার আরও একধাপ এগিয়ে বলেন, ‘গোটা দেশের পক্ষ থেকে আমাদের বন্দনা ও তাঁর পরিবারের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। ‘

বন্দনা কাটারিয়া ভারতীয় নারী দলের তারকা খেলোয়াড়। একই সঙ্গে তিনি দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ। ঘরের মেয়ে গেছে সাড়ে ৫, ০০০ কিলোমিটার দূরে টোকিওতে অলিম্পিক গেমসে খেলতে। … দেশের মুখ উজ্জ্বল করার জন্য জানপ্রাণ লড়াই করেছেন। হয়তো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেননি। কিন্তু তাঁদের চেষ্টা, পরিশ্রম ও দেশপ্রেমের অভাব ছিল না। আগামীতে নিশ্চয় তাঁরা অভীষ্ট লক্ষ্যের শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছবে।

ব্রোঞ্জ মেডেল ম্যাচে গ্রেট ব্রিটেনকে হারিয়ে দেশকে একটা পদক এনে দিলে, মুখতোড় জবাব দেওয়া হতো নিশ্চয়ই। কিন্তু তা আর হল কই! অগত্যা বন্দনাদের এখন তাকিয়ে থাকা পরবর্তী অলিম্পিক্সের দিকে। আর এই মাঝের সময়টুকু আরও বেশি করে বোধহয় তাকিয়ে থাকা নিজের দেশের নাগরিকদের দিকে। হকি স্টিক দিয়ে শুধু প্রতিপক্ষের ডিফেন্স নয়, নিজের ঘরে এখনও জ্বলতে থাকা জাতপাতের বেড়াটাও ভাঙতে হবে যে!

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?

আপনার ভালোলাগা অনুযায়ী স্টার-এ ক্লিক করুন!

এই পোস্টটি রেটিং করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

No votes so far! Be the first to rate this post.