আলোচনা, সমাজ ও পরিবেশ

মোঘলশাসিত ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তাবহনকারী বিভিন্ন উৎসব

Hits: 94

4.6
(5)

সৌপ্তিক অধিকারী

সুদূর মধ্য এশিয়া থেকে ভারতবর্ষে প্রবেশ করে সেভারতের শাসন ক্ষমতা দখল করে ভারতের সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করে ভারতের অন্তরের আত্মার সঙ্গে একাত্ম গিয়েছিল মোঘল শাসকগণ।

পার্সি উৎসব ছিল ‘নওরোজ’ [ পার্সি নতুন বছর ], যা মোঘল দরবারে পালন করা হত। এই উৎসব প্রধানত বসন্ত কালের শুরুতে পারসিকরা উদযাপন করত। প্রথা অনুসারে উপহার দেওয়া ও নেওয়া চলত এবং গান-বাজনা-নৃত্য পরিবেশিত হত, এমনকি পশুদের মধ্যে প্রতিযোগিতার খেলাও চলত।

নওরোজের পাশাপাশি তিমুরীয় উৎসব ‘গুলাবপাশি’ [আব-পাশি ] র প্রচলন ছিল। সুন্দর বস্ত্র পরিহিত অনুচারীগণ রত্নখচিত রুপো এবং সোনার ভেসেল থেকে গোলাপ জল বর্ষণ করত অ্যাসেম্বলির ওপর, কিছু নির্বাচিত গায়ক এই সময় বিভিন্ন যন্ত্র ও ঐক্যতান সঙ্গীত পরিবেশনা করত।  মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁর আত্মকথাতে এই উৎসবের কথা স্মরণ করে গেছেন। চিত্রশিল্পের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক জাহাঙ্গীর তাঁর  শাসনকালের চিত্রশিল্পী গোবর্ধন এই উৎসবের চিত্র অঙ্কন করেছিলেন।

সবেবরাত ও ঈদ ছিল ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। ইসলাম ধর্মাবলম্বীগণ শাবান মাসের ১৪ ও ১৫ তারিখের রাত পালন করে। মনে করা হয় রাত্রিবেলা আগামী বৎসরের জন্য প্রত্যেকের ভাগ্য নির্ধারিত হয় এবং সর্বশক্তিমান পারে পাপীদের ক্ষমা করে দিতে। বিভিন্ন চিত্রশিল্পীদের আঁকা ছবি থেকে জানা যায় যে, ঐ দিনগুলিতে রাত্রিবেলা আলোকসজ্জা সজ্জিত থাকত এবং পটকা ফাটানো হত।

ঈড-উল-ফিতর সেই সময়ে ধনী-দরিদ্র উভয়েই পালন করত। ধনীগণ বিশাল ভোজসভার আয়োজন করত। দুঃস্থ ব্যক্তিগণ দান-খয়রাতি সেরে তাঁরা মসজিদে প্রার্থনা করত। পুরো মাস জুড়ে একবেলা উপোস থেকে মাসের শেষে ‘ঈদ’ উৎসব পালন হত সকালবেলার প্রার্থনা দিয়ে। উৎসর্গের ঈদ বা বকরা ঈদ পালিত হত এর প্রায় মাস দুয়েক অতিক্রমের পর।

ফাল্গুন মাসে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ই দোল বা হোলি [ রঙ খেলার উৎসব ] উৎসবে মেতে উঠত। মোঘল সম্রাট ও যুবরাজগণ বিভিন্ন রঙের খেলায় মেতে উঠত। হিন্দু-মুসলমান একত্রিত ভাবে এই হোলি উৎসবে অংশ নিত।

এছাড়া ফাল্গুন মাসে হিন্দু সম্প্রদায়ের পবিত্র উৎসব শিবরাত্রি। শিবরাত্রি মোঘল যুগে সমারোহের সাথেই পালিত হত বিভিন্ন চিত্রশিল্প থেকে সেই চিত্রটিই ধরা পরেছিল।

শ্রাবণ মাসের শেষের দিকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব পালিত হত যার নাম রক্ষাবন্ধন। ধনী ও শ্রদ্ধেয় মানুষের হস্তে রাখি বেঁধে দিত ব্রাহ্মণগণ এবং এর ফলে তাঁরা উপহার পেত। এছাড়াও ভাইদের তার বোনেরা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিবেদন করে রাখি পরাতো।

শারদ উৎসব অর্থাৎ দূর্গা দেবীর বন্দনা এবং আলোর উৎসব দীপাবলি মোঘল আমলে হিন্দু-মুসলমান উভয় রমণীগণ তাদের মহলে উদযাপন করত। এই উৎসবে হিন্দু-মুসলমান এক সম্প্রীতির  বার্তা বহমান হত। জাহাঙ্গীরের আত্মজীবনী তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরি থেকে এই উৎসবের অনেক তথ্য জানা গেছে।

মোঘল শাসকগণ ও তাদের পরিবারবর্গ কিছু উৎসবে প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহণ করতেন আবার কিছু ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। ঈদ, সবেবরাতে যেমন জাঁকজমকের ব্যবস্থা করতেন তেমনি নওরোজ কিংবা শারদ উৎসব ,দীপাবলি, হোলিতেও জাঁকজমকের কোন ত্রুটি রাখতেন না। তৎকালীন যুগে এই ভিন্ন ধর্মের উৎসবের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে বহু  জাতি –বর্ণ-ধর্ম-ভাষাভাষীর দেশ ভারতবর্ষকে এক সম্প্রীতির বার্তা দিয়ে মোঘল শাসকগণ একসূত্রে বেঁধে রেখেছিলেন।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?

আপনার ভালোলাগা অনুযায়ী স্টার-এ ক্লিক করুন!

এই পোস্টটি রেটিং করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

No votes so far! Be the first to rate this post.