আলোচনা, সমাজ ও পরিবেশ

বিধি মেনেই পালিত হোক বাঙালির শ্রেষ্ঠ দুর্গোৎসব

Hits: 28

0
(0)

রবিউল ইসলাম 

ভারতবর্ষে বাঙালির সবথেকে বড়ো উৎসব হল দুর্গাপুজো। শুধু পশ্চিমবঙ্গই না, ভারতবর্ষ এমনকি সমগ্র পৃথিবীর মানুষ প্রতিবছর অপেক্ষা করে থাকেন এই সময়টার জন্য। জাতি -ধর্ম -বর্ণ নির্বিশেষে এই উৎসব, সর্বস্তরের বাঙালির অন্তরাত্মা ও শিকড়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। প্রতিবছর শারদোৎসবের সূচনাকাল আপামর বাঙালির জীবনে নিয়ে আসে উৎসবের আমেজ। কিন্তু গত বছরের মতো এই বছরেও করোনাভাইরাসের প্রকোপ আমাদের কপালে ফেলেছে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। প্রত্যেকেই প্রায় ঊন্নিশ মাস ধরে ঘর-বন্দিদশায় কাটছে জীবনযাপন। রাজ্যে করোনা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। প্রতিদিনই সংক্রমণের রেখচিত্র ওঠানামা করছে। এবছরের পরিস্থিতি অনেকটাই আলাদা। কারণ কোভিড ১৯। সমগ্র পৃথিবীর অর্থনীতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সামাজিক জীবনযাপন ব্যাহত ও বিপর্যস্ত হয়ে রয়েছে এই অতিমারির প্রকোপে। এই পরিস্থিতিতে দুর্গাপুজো উৎসব মানেই সেখানে অনেক মানুষের সমাগম এবং দুর্গাপুজোর মতো উৎসবে সমাগম ঘটে কয়েক কোটি মানুষের, তা বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারে সামনের দিনে পশ্চিমবঙ্গের কোভিড সংক্রমণের হারে। করোনাকালে মানব জীবনে এসেছে অভাবনীয় পরিবর্তন। সামনেই দরজায় কড়া নাড়ছে দুর্গাপুজো আর বাঙালি পুজোর বাজার সারবে না, তাও কি হয়? করোনা যতই আমাদের স্বাভাবিক অভ্যাসের রদবদল ঘটিয়ে থাকুক না কেন, এই অভ্যাসটা চিরন্তন। তাই অনেক দিন আগে থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে কেনাকাটা। কোথাও কোথাও আবার ভিড়ের মধ্যেই চলছে দেদার কেনাকাটা! তবে করোনাকালে পুজোর বাজার করার সময় এতটাও উদাসীন থাকা উচিত নয়। সংক্রমণ এড়াতে মেনে চলতে হবে বিধিনিষেধ। শারদোৎসবে দিন দিন নতুন মাত্রা যুক্ত হচ্ছে। প্রতিমা তৈরি, আলোকসজ্জা, তোরণ নির্মাণসহ সবকিছুতেই বেড়েছে এর জাঁকজমকতা। পূজাকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন ঢাক-ঢোলের বাদ্য-বাজনা ও আরতিনৃত্য চলে, তেমনি এর পাশাপাশি চলে নানা সামাজিক কর্মকা-ও। সব মিলিয়ে দুর্গোৎসব এখন সকল বাঙালীর উৎসব। বাঙালী মাত্রই আপ্লুত হয় পূজার আনন্দে। শারদীয় দুর্গোৎসব বাঙালী হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। তবে কালের পরিক্রমায় এটি এখন আর নির্দিষ্ট একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দুর্গাপূজা এখন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সার্বজনীন উৎসব। শুধু ধর্মীয় দিক থেকে নয়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক দিক থেকেও এ উৎসব অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। নির্দিষ্ট ধর্ম বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে সূচনা হলেও উৎসব- এর রূপ নিয়ে দুর্গাপূজা হয়ে উঠেছে সব সম্প্রদায়ের সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির সেতুবন্ধকে সুদৃঢ় করার এক অনন্য সামাজিক উৎসব।

ধর্ম উৎসব মানুষে মানুষে প্রীতি, প্রেম, সহিষ্ণুতা, ঐক্য ও শান্তির ডাক দিয়ে যায়। তা সত্ত্বেও হানাহানি, লোভ-লালসা, অনৈক্য, অসহিষ্ণুতা ও নিষ্ক্রিয়তা আজ চারপাশে বিরাজমান। তাই সত্যের রক্ষাকর্তা ও দুষ্টের বিনাশকারিণী হিসেবে ‘মা’ আসেন শান্তির বার্তা নিয়ে। এ পূজা আমাদের সমগ্র জাতিসত্তায় মনুষ্যত্বের জাগরণ, মানবকল্যাণ তথা বিশ্ব কল্যাণের পূজা। বর্তমান বাস্তবতায় যে কল্যাণের নামে অকল্যাণ, ধর্মের নামে অধর্ম, স্বার্থপরতা, হিংসা-বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, পঙ্কিলতা তা দূর করে শান্তি স্থাপন সবচেয়ে বেশি দরকার। শুধু মুখে নয় কর্মের মাধ্যমে সত্যিকারের প্রেম, ভালোবাসা, মানবতা, ভক্তি, সম্প্রীতি বেশি প্রয়োজন। যতই আমাদের মধ্যে দেবী ‘মা’র মাতৃভক্তির বিকাশ হবে ততই আমরা পবিত্র হব আর উন্নতির দিকে এগিয়ে যাব। এতে করে নারীরা যথার্থ মর্যাদা ও সম্মান পাবে। নারীর প্রতি সব ধরনের নির্যাতন রুখে দিয়ে মাতৃরূপে ভক্তি ও সম্মানের দৃষ্টিতে সাম্যের পৃথিবী গড়তে হবে। তাহলেই কেবল সমাজ সমতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাবে।

বর্তমান সময়ে পৃথিবীতে করোনা নামক অতিমারি পুরো বিশ্বকে কিছুটা হলেও থামিয়ে দিয়েছে। মা দুর্গার আগমনে অতিমারিসহ সব ধরনের অনাচার ধুয়ে-মুছে যাক- এটাই কামনা। মায়ের আগমনের মধ্য দিয়ে আমাদের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন আরো দৃঢ় হোক এবং ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হোক। দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট থাকুক এবং শুভ শক্তির জয় হোক। দুর্গাপূজা সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের যে ঐতিহ্য তৈরি করেছে সে ধারাবাহিকতা অটুট থাকুক। শারদীয় দুর্গোৎসবে সত্য, ন্যায় ও শুভশক্তির বিজয় হোক। শুভ চেতনা সঞ্চারিত হোক সবার মনে। এ পূজায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি ও ভালবাসার এক অকৃত্রিম বন্ধনে মিলিত হয়। অনাবিল আনন্দে ভরিয়ে দেয় প্রতিটি বাঙালীর হৃদয়। সবাই মিলে এই উৎসব পালনের মধ্য দিয়েই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক সৌহার্দের বন্ধন আরো দৃঢ় করতে হবে। পাশাপাশি এবারের পূজাতে সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখি। দেবী দুর্গা অবশ্যই নিধন করবে অসুররূপী এই শক্তিশালী করোনাভাইরাসকে। এই ক্রান্তিকালে মহানুভবতার আবাহনে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির নবতর অভিষেক প্রাণিত হোক, সম্প্রীতির আস্থায় উৎসব হোক মঙ্গলময়, উৎসব হোক আনন্দের সম্প্রীতির মিলনের ও ঐক্যের – আজকের দিনে এটুকুই প্রার্থনা।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?

আপনার ভালোলাগা অনুযায়ী স্টার-এ ক্লিক করুন!

এই পোস্টটি রেটিং করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

No votes so far! Be the first to rate this post.