আলোচনা, সমাজ ও পরিবেশ

গ্রামের দুর্গাপুজো, আনন্দের একাল-সেকাল

Hits: 52

1
(1)

কল্যাণ দত্ত

গ্রামের দুর্গাপুজো যেন কেমন যেন আনন্দহীন হয়ে উঠছে। আমরা জানি দুর্গাপুজো মানেই নারকেল নাড়ু, চালভাজা, (হলুদ মুড়ি), গ্রামের পুজো মানে খই-মুড়কি, দুর্গাপুজো মানেই নতুন জামা কাপড় কেনার ধুম, দুর্গাপুজো মানেই আত্মীয় স্বজনের আনাগোনা। এখন পুজোর সময়েও বাড়ির অনেক ছেলেই সময় করে উঠতে পারে না গ্রামের বাডিতে ফেরার জন্য৷ নেই হলুদ মুড়ি, খই-মুড়কি ভাজার তোড়জোড়। যাঁরা দুর্গাপুজোয় একটু দূরে দাঁড়িয়ে পুজো দেখতেন, অঞ্জলি দিতেন উপোষ করে, তাঁরা নিজেরাই এখন উপস্থিত থাকতে পারেন না নিজের গ্রামের পুজোয়। ব্যাস্ত থাকেন থিমের পুজো দেখতে।

দুর্গাপুজোর গান কথাটা বর্তমান সময়ে শোনাই যায় না৷ একটা সময় ছিল, যখন পনেরো-কুড়িবার গাইবার পরে একটা গান রেকর্ড হতো৷ সেটা গ্রামোফোনের যুগ৷ ক্যাসেটের যুগেও পুজো-পুজো একটা ভাব থাকতো৷ কিন্ত্ত আজকাল আর পুজোর গান নিয়ে মাতামাতি হয় না বলাই চলে ৷ পুজাবার্ষিকীর সংখ্যা বেড়েছে৷ কিন্ত্ত সেই আকর্ষণটা কোথায় যেন হারিয়ে যেতে বসেছে৷ হারাবেনাই বা কেন? ষষ্ঠীতে দেবীর বোধনের সময় অনেকই অফিস থেকে বা বাইরে থেকে ফিরতে পারেন না৷ বাবা-জ্যাঠামশাইরা আগে তাড়াতাড়ি ফিরতে বলতেন৷ আজকাল তাঁরাও কিছু বলেন না৷ গ্রামের পুজোয় অবশ্য অত সব ঝক্কি নেই৷ আগের চেয়ে ঝক্কি বা হুড়োহুড়ি অনেক কমেও গেছে। এখন অনেকেই ভুলতে বসেছেন সেকালের পুজোকে। খেয়াল নেই অনেক কিছুরই ৷ যেমন খেয়াল নেই নবমীতে লাইন দিয়ে কবে পাঁঠার মাংস কেনা হয়েছে৷ এখন ফ্রিজ আছে৷ ছুটির দিন কিনে ঢুকিয়ে দিলেই হল৷ ডাক্তারের নিষেধ থাকায় ‘রেড মিট’ খাওয়া অনেকেরই বন্ধ৷ তাই প্রতি রবিবার সকালে গজিয়ে ওঠা মুরগির মাংসের দোকানে গিয়ে খানিকটা কিনে নিলেই হল৷ দশমীতেও আজকাল মাংস লাগে৷

মণ্ডপে নতুন কাউকে দেখলে ফটাস ফটাস করে চারবার ক্যাপ-বন্দুকের ট্রিগার বাচ্ছারা টিপতো৷ দুবার-তিনবার টেপার পর একবার ক্যাপ ফাটতো৷ সিংহ চিহ্ন আঁকা ক্যাপের বাক্স ছিল সেই সময় ৷ রোল ক্যাপ আর টিপ ক্যাপ৷ এখন কদাচিত্‍ চোখে পড়ে৷ পুজো মানেই ছুটি৷ পুজো মানেই একটু লাগামছাড়া৷ তাই ছোটোরাও সেই সুযোগ পুরোদম নিয়ে মোবাইলে কার্টুন দেখতে বসে পড়ে৷ মিকি-মাউস আজকাল তেমন চলে না৷ এখন ডোরেমন, ছোটা ভীমের যুগ৷ আর গেম তো আছেই। একটু বড় হলে মণ্ডপের পিছনে গিয়ে আধপোড়া সিগারেট বা বিড়ি খাওয়ার চল ছিল সেই সময়ে ৷ সে ছিল দারুণ উত্তেজনা৷ এখন প্রকাশ্যে পান না করা গেলেও, পান করে প্রকাশ্যে ঘোরা যায়।

মহালয়ার আগে থেকেই পুজোর গন্ধটা এসে যেত৷ ভোরের শিউলির সাথে পুজোর গন্ধ একটা আলাদা মাত্রা এনে দিত গ্রামবাংলার মানুষের মন-কে৷ এখন শিউলির গন্ধটাও হয়তো ভুলতে বসেছে কিছু কেমন মানুষ। সেকালে বাড়িতে তর্পণ হতো৷ ‘ওঁ অত্রি স্তৃপ্যতাম, ওঁ অঙ্গিরা স্তৃপ্যতাম৷ আরও কত কী৷ তারপরে দু’কূলের তিন পুরুষ করে জল দেওয়া হতো৷ শেষ দিনে যাঁরা মারা গিয়েছেন তাঁদের যাঁর কথা মনে পড়ে তাঁদেরই জল দিতে হতো৷ উত্তরপুরুষের জল পেয়ে তাঁরা দক্ষিণ থেকে উত্তরে যাত্রা করেন৷ আজকাল বাড়িতে তর্পণ উঠে গেছে৷ মহালয়ার দিন যাঁরা সময় পান চলে যান নদীর ঘাটে৷ সেখানে পিতৃতর্পণ করে বাড়িতে ফেরা৷ মহালয়ার দিন কয়েক আগে পুরনো রেডিও ঝাড়পোঁচ করার দরকার আগে হতো, এখন মোবাইল ফোনের দৌলতে সে সব তোড়জোড় করতে হয় না৷ তা ছাড়া মাঝরাত পর্যন্ত অফিস সামলে, বা সোশ্যাল সাইডে সময় অপচয় করে ভোরে উঠে মহালয়া! কেউ কেউ অবশ্য শোনেন, কানে হেড ফোন গুঁজে৷ কানে ঢোকে, কিন্তু মন পর্যন্ত পৌঁছায় না সেই প্ৰখ্যাত বীরেন ভদ্রের কণ্ঠ সুর ৷ সকালে উঠে গোল হয়ে চা-বিস্কুট না খেলে সেই মেজাজ টাই আসে না৷

দেখতে দেখতেই পুজো হাজির৷ অফিস থেকে পুজোর ছুটি পেলেও, স্কুল কলেজ বন্ধ থাকলেও সেইসব মানুষের ছুটি নিজেরাই বরাদ্দ করেন বাইরে যাবার প্ল্যানে। নিজের গ্রামে আজকাল কেউ ঠাকুর দেখতেই চায় না৷ হয় বাইরের পুজো, না হয় একেবারে বাইরে৷ গ্রাম আর মফস্সলের লোক শহরে, শহরের লোক লং ড্রাইভে৷ পুজোর পরে ঘুরপাক খায় নানা খবর৷ ট্রেনে কার একটা বিনুনী কেটে নেওয়া হয়েছে, কার কত টাকা পকেটমারি হয়েছে, কার পা ভেঙেছে এমন কত কী। আগে ছবি তোলার তেমন চল ছিল না৷ আজকাল মোবাইল ক্যামেরার দৌলতে অনেক ছবি ওঠে৷ তারপরে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে আপলোড তাও সেটা গ্রামের পুজো কেন্দ্রিক নয়।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?

আপনার ভালোলাগা অনুযায়ী স্টার-এ ক্লিক করুন!

এই পোস্টটি রেটিং করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

No votes so far! Be the first to rate this post.