অপরাধ ও দুর্নীতি, আলোচনা, রাজনীতি

সব ঘটনা কি ঘটনাক্রমে ঘটে?

Hits: 288

পাঠক মিত্র

দেশজুড়ে অস্থিরতার ঢেউ যেন ক্রমশঃ বেড়েই চলেছে। অস্থিরতার প্রচ্ছন্ন কারণ যাই হোক তার বিশ্লেষণ রাজনৈতিক না হয়ে পারে না। এমনকি নারীর প্রতি পৈশাচিক নির্যাতন থেকে খুনের ঘটনাও কখনো কখনো রাজনৈতিক ছায়ায় মাখামাখি হয়ে পড়ে। আসলে সমাজে কোনো ঘটনাই রাজনৈতিক ছায়া থেকে দূরে থাকে না যা কখনো প্রকট বা কখনো প্রচ্ছন্ন। আবার অনেক জঘন্য ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক জড়িয়ে থাকলেও তা ব্যক্তিগত বলে প্রশাসন থেকে নেতারা নিজের মত করে অরাজনৈতিক বলে ব্যাখ্যা দিতে দেখা যায়। কলকাতার বুকে বাড়ি বয়ে গুলি চালানোর হামলা পরপর ঘটেছে, যা ব্যক্তিগত বিবাদের কারণে ব্যাখ্যা থাকলেও তার প্রচ্ছন্ন কারণ নিয়ে চর্চা হবে না। বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাই বলে। তবু কলকাতা সহ বাংলা নিয়ে যে-গর্ব, এই ঘটনায় সেই গর্বের ছবি আর থাকে না।

সম্প্রতি দেশের কয়েকটি ঘটনা যেভাবে ঘটেছে তা দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক থেকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন তা তুলে না-ধরে পারে না।

প্রথম ঘটনা: গত ২৩ সেপ্টেম্বর আসামের দরং জেলার গারুঘাঁটিতে উচ্ছেদের ঘটনায় নৃশংসভাবে খুন হল শিশুসহ দু’জন। শুধু তাই নয় মৃত-দেহের ওপর সরকারি আলোকচিত্রীর উদ্দাম নৃত্য মানব-সভ্যতার লজ্জা, কলঙ্ক যাই বলা হোক না কেন, তা যথার্থ নয়। তবে এই ঘটনা আজকের সময়ে মানব-সভ্যতার কোন পর্যায়কে চিহ্নিত করে তা কখনোই ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। শ্মশান যাত্রাপথে মৃতদেহের প্রতি সম্মান জানাতে মানুষকে প্রণাম করতে দেখা যায়। অথচ মানুষকে খুন করে সেই মৃতদেহের ওপর সরকারি কর্মীর নাচানাচিতে শ্রদ্ধা নয়, এক হিংস্র ঘৃণা প্রকাশ হয়। এই ঘৃণা মানুষকে মানুষ হিসেবে না-দেখার এক বহিঃপ্রকাশ। এই কি আসামের সভ্যতা ? তা নয়। আসলে মানুষকে মানুষের হিসেবে না দেখে মানুষকে শুধু রাজনৈতিক জীব হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে শাসক। রাজনৈতিক জীব মানে যাঁদের নিজেদের স্রোত বলে মনে করে শাসক। আর স্রোতের বিপরীত হলে অঙ্ক জটিল। যার সমাধান চাই যেনতেন প্রকারে। অনেক সময় যেন সহজ সমাধান। সেই সহজ সমাধানের বলি হয়ে পড়ে এই রাজনৈতিক জীব। এমন ঘটনার বিচার চলে। তবে সুবিচার হয় বলে কেউ খোঁজ রাখে না। ১৯৮৩ সালে আসামের নেলিতে এক গণহত্যার ঘটনা ঘটেছিল। পরবর্তী সময়ে তার বিচার নিয়ে কে বিচার করবে ? রাজনৈতিক শব্দ এখন যেমন শোনা যাচ্ছে, তখনও তেমন ছিল। তাহলে রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শেষ বিচার মানুষ জানতে পারে না। আবার জানলেও জানতে পারে তখন, যখন প্রমাণে দোষী হয়ে যায় নির্দোষ।

দ্বিতীয় ঘটনা: ২৪ সেপ্টেম্বর দিল্লির কোর্টরুমে গুলি করে অপরাধীর বিচার অপরাধীর হাতে। প্রকাশ্য দিনের আলোয় কড়া প্রহরারত পুলিশের চোখ এড়িয়ে অপরাধীরা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে কোর্টরুমে হাজির। এই ঘটনা আইনশৃঙ্খলার শিথিলতা, না পুলিশের গাফিলতি তা নিয়ে তর্ক চলবে। কিন্তু আগ্নেয়াস্ত্র সহ অবাধে সুরক্ষা বলয়ে প্রবেশ করা সম্ভব হয়েছে সিকিউরিটি চেকিং দুর্বল ছিল বলে ধরা যায়। তাছাড়া ইনটেলিজেন্স ব্যুরোর কাছে কোনো খবর ছিল না বলেও ধরা যায়। কারো গাফিলতি হোক বা না-হোক সে চর্চা বাদ দিয়ে বলা যায়, অপরাধীর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে কোর্টরুমে পৌঁছে যাওয়া সমাজের সুস্থতার পরিচয় নয়। এনকাউন্টারে সব অপরাধীর বিচার শেষ হয়ে গেলেও সেই সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। এই ঘটনা রাজনৈতিক চর্চা সেভাবে দখল করতে পারেনি। আসলে সরকারি কর্মচারী বিশেষ করে নিরাপত্তা রক্ষীর গাফিলতির দায় তাঁদেরকেই নিতে হয়। কিন্তু আজকের সময়ে জোর গলায় কেউ কি বলতে পারে যে পুলিশ আর অপরাধীর সঙ্গে রাজনীতির কোনো যোগ নেই। সেই যোগ প্রমাণিত যাতে না হয়, উত্তরপ্রদেশের আর এক গ্যাংস্টার বিকাশ দুবের এনকাউন্টারে মৃত্যু হয় বলে রাজনৈতিক চর্চা হয়েছে।

তৃতীয় ঘটনা: ১ অক্টোবর শাহরুখ পুত্র আরিয়ান মাদক কান্ডে গ্রেফতার হল। আগ্নেয়াস্ত্র সঙ্গে নিয়ে কোর্টরুমে চলে গেলে ধরা যায় না, কিন্তু কয়েকগ্রাম মাদক কে নিয়ে যাচ্ছে তার খবর আগাম জানতে পারে প্রশাসন। মাদক ব্যবসায়ীদের ধরা যায় না। তাই মুদ্রা বন্দরে কনটেইনার ভর্তি মাদক এলে কেউ জানে না তার পরিচয়। গোপন মাদকের ব্যবসায়ীদের গোপন ব্যবসার খবর জানে না প্রশাসন। অথচ সেই মাদকের সেবনকারীরা কোথায় সেবন করবে তা ধরা যায়। এই পরিস্থিতি এবং পদক্ষেপ অদ্ভুত বলে মনে হয় নাকি। শাহরুক পুত্রের এই ঘটনা এখন রাজনৈতিক চর্চা হয়েই পড়েছে। চর্চা এই কারণে, আরিয়ানকে যে-পার্টি থেকে ধরা হয়েছে সেখানে সে ছিল আমন্ত্রিত। উচ্চ প্রবেশ মূল্যের বিনিময়ে হাউসফুল পার্টিতে দোষী প্রবেশের অধিকারীীরা নন, পার্টির উদ্যোক্তা নয়, দোষী হলেন আমন্ত্রিত ব্যক্তি। এ ও এক অদ্ভুত ব্যাপার।

চতুর্থ ঘটনা: ৩ অক্টোবর উত্তরপ্রদেশের লখিমপুরে মন্ত্রীর কনভয় বিক্ষোভরত চার কৃষককে চাপা দিয়ে হত্যা করেছে। এই হত্যাকান্ডে আসল দোষী হিসেবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ছেলের নাম থাকলেও তাকে গ্রেফতার করা এখনো সম্ভব হয় নি। মাননীয় আদালত ভর্ত্সনা করলেও এই গ্রেফতারের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগ সরাসরি বলেই তা সম্ভব হয়নি। কারণ মন্ত্রীর ছেলে বলে কথা। এমন প্রভাবশালীর প্রভাব পুলিশ এড়াতে কখনোই পারে না। সে কথা ওপেন সিক্রেটের মত।

এই ঘটনাগুলো নিয়ে রাজনৈতিক চর্চা যাই থাক, এর নেপথ্য চরিত্ররা কিন্তু সামাজিক অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে। তাই সব ঘটনা শুধু ঘটনাক্রমে ঘটেছে বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় কি ?