আলোচনা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

রাজ্যেও করোনার ডেল্টা এবং ইউকে ভ্যারিয়েন্ট, বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন!

Hits: 1076

0
(0)

সি. ভাস্কর

ফের বঙ্গের কোভিডচিত্রে অশনিসংকেত। আশঙ্কাই যে আজ সত্যি! উত্তরবঙ্গেও খোঁজ মিলল কোভিডের দুই নয়া ভ্যারিয়েন্টের। নাম ইউকে ও ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। কল্যাণীর জেনোমিক্সে পাঠানো সোয়াব স্যাম্পেলের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ৫ জন ডেল্টা ও ২ জন ইউকে সহ মোট ৭ জনের শরীরে নতুন করোনা ভ্যারিয়েন্টের খোঁজ পাওয়া গিয়েছে। উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সুপার সঞ্জয় মল্লিক বলেন, ‘ভ্যারিয়েন্ট পরীক্ষার জন্য প্রথম যে স্যাম্পেল পাঠানো হয়েছিল তাঁর রিপোর্ট এসে পৌঁছেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে ৫ জন ডেল্টা ও ২ জন ইউকে ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হয়েছেন।’

সম্প্রতি কল্যাণীর জেনোমিক্সে পাঠানো নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে শিলিগুড়ির সূর্যসেন কলোনি, চম্পাসরি, নৌকাঘাট,  উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক রোগী এবং মংপুর রিশপে ৫ জনের শরীরে কোভিডের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গিয়েছে। সেইসঙ্গে শিলিগুড়ি মহামায়া কলোনি এবং মাটিগাড়ার তুম্বাজোতের ২ জনের শরীরে ইউকে ভ্যারিয়েন্টের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে বলে এদিন উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সুপার ডাক্তার সঞ্জয় মল্লিক জানান।

এদিকে, উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের কোভিড কেয়ারের বিশিষ্ট চিকিৎসক তথা অধ্যাপক ডাঃ কল্যাণ খাঁ বলেন, ‘আমাদের দেশে এই মুহূর্তে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। তবে যেহেতু ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ বেশি, তাই আমাদের একটু সাবধান হতেই হবে। অন্যদিকে ইউকে ভ্যারিয়েন্ট যেটা রয়েছে, সেটাকে আলফা ভ্যারিয়েন্ট বলা ঠিক হবে। এর সঙ্গে কোনও দেশের নাম না জোরাই ভালো। তবে আলফা ভ্যারিয়েন্টটি কোভিডের প্রথম ঢেউয়ে দেখা গিয়েছিল। এই ক্ষেত্রেও ভীতির কোনও কারণ নেই। তবে একটু স্বস্তির খবর, জানা গিয়েছে এই ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিনগুলি কাজ করছে। আমাদের কাছে এটি খুশির বিষয়। মে মাসের রিপোর্ট যাঁদের পাওয়া গিয়েছে তাঁরা এখন সবাই সুস্থ রয়েছেন। চিন্তার বিষয়, এদের থেকে যাঁদের সংক্রমণ ছড়িয়েছে, তাঁদের চিহ্নিত করতে হবে। কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ের ওপর জোর দিতে হবে। নয়ত পরিস্থিতি হাতের বাইরেও চলে যেতে পারে।’

কল্যাণবাবুর কথায়, ‘যেই স্যাম্পেলগুলি টেস্টিং বা গবেষণার জন্য পাঠানো হবে, সেগুলিকে খুব সাবধানে নিয়ে যেতে হবে। সেই থেকেই পরবর্তীতে কোনও নতুন ষ্ট্রেইন এলে চটজলদি চেনা যাবে।’

ডেল্টা নাকি ডেল্টা প্লাস, কোনটা বেশি সংক্রামক? প্রশ্নের উত্তরে ডাক্তারবাবু বলেন, ‘ডেল্টা প্লাস একটু হলেও বেশি সংক্রামক। তবে এই কথা বলা যেতেই পারে যে ডেল্টার জন্য ভ্যাকসিন প্রমাণিত কার্যকরী।’

তিনি বারংবার কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘আমরা কিন্তু এখনও জানি না কারা কারা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংস্পর্শে এসেছেন। তাই আমাদের খুব শীঘ্রই কন্টাক্ট ট্রেসিং শুরু করে দিতে হবে।’

শিলিগুড়ির অন্যতম বরিষ্ঠ চিকিৎসক, সমাজসেবী তথা রোটারি ক্লাব অব শিলিগুড়ি মিডটাউনের সভাপতি ডাঃ ইকবাল রহমান বলেন, ‘এটি আমাদের কাছে একটি নতুন চ্যালেঞ্জ। এরসঙ্গেও আমাদের লড়াই করতে হবে। বর্তমানে আমাদের সোশ্যাল গ্যাদারিং থেকে বিরত থাকতে হবে। যতটা সম্ভব বাইরে না বের হতে হবে। সরকারি সমস্ত নির্দেশিকা মেনে চলতে হবে। শিলিগুড়ির বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পাশাপাশি রোটারি ক্লাবও পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত।’

এই বিষয়ে একদম ভিন্ন মত পোষণ করেছেন শিলিগুড়ির অন্যতম বরিষ্ঠ চিকিৎসক তথা কোভিড বিশেষজ্ঞ ডাঃ কৌশিক ভট্টাচার্য। তাঁর মতে, ‘কোভিডের এই নতুন ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। নতুন তাত্ত্বিক বিষয়ে চিকিৎসকরা সর্বশক্তি দিয়ে পাশে আছি।’

ডাঃ ভট্টাচার্য বলেন, ‘ডেল্টার চাইতে ডেল্টা প্লাস ভ্যারিয়েন্ট বেশি সংক্রামক। ছড়ায় বেশি। কিন্তু এসবে আতঙ্কিত হবার কিছু নেই। বরং আমাদের কোভিডবিধি আরও শক্ত হাতে মেনে চলতে হবে।’ বলেন, ‘আমি প্রথম থেকেই বলে আসছি টিকাকরণের বিকল্প কিছু নেই। সুতরাং, সরকার সবাইকে যত দ্রুত সম্ভব টিকা দিয়ে দেবে ততই সকলের জন্য মঙ্গল।’

এদিন কৌশিকবাবু আরও বলেন, ‘সরকারের আংশিক লকডাউনে সংক্রমণের গ্রাফ যেই কমতে শুরু করেছিল, তখনই আমরা আরও বেশি উন্মুক্ত হয়ে উঠি। যা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। সামাজিক দূরত্ববিধি যেই হারিয়ে গিয়েছিল বাজারগুলিতে। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল, করোনা কী আদৌও আছে?’ বলেন, ‘এই অতি উৎসাহে আমরা সপরিবারে দলবল নিয়ে বেড়িয়েও পড়েছিলাম। যা আরও একটি বড় ভুল সিদ্ধান্ত। মনে করিয়ে দিতে চাই, কিছুদিন আগে সিকিমে একইসঙ্গে ৯৭ জনের শরীরে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের হদিস পাওয়া যায়। যা যথেষ্টই উদ্বেগের। ফলে আমাদের আরও সচেতন হতে হবে।’

পাশাপাশি, ডাঃ কৌশিক ভট্টাচার্য বাড়ির খাবারকেই প্রাধান্য দিয়ে বলেন, ‘বাড়ির খাবার সর্বদাই পুষ্টিকর। আমাদের এই মুহূর্তে পুষ্টিকর খাবারের দিকেই ঝুঁকতে হবে। দৈনিক ব্যায়াম করতে হবে। যতটা সম্ভব। আর কোনও অসুবিধা হলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। আমার বিশ্বাস আমরা এই যুদ্ধও সংঘবদ্ধভাবে জিতব।’

নতুন ভ্যারিয়েন্টের খোঁজ মেলার খবরের থেকেও চমকে দেওয়ার মতো তথ্য হল, গত জুন মাসের শুরুর দিকে কল্যাণীর ওই পরীক্ষাগারে এই সোয়াব স্যাম্পেল পাঠানো হয়েছিল। গ্যাংটকে যে ভ্যারিয়েন্টের খোঁজ পাওয়ার পরই স্যাম্পেল পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। ৭ জনের রিপোর্টে নতুন ভ্যারিয়েন্ট ধরা পড়ার পর এবার উদ্যোগ শুরু হয়েছে তাদের বর্তমান লোকেশন ও শারীরিক অবস্থা জানার। মাঝে দীর্ঘদিন সময় ব্যবধানে তারা হয়ত সুস্থ হয়ে উঠেছে প্রত্যাশা করা হলেও মাঝে তারা কোভিডবিধি মেনে ঠিকমতো আইসোলেশনে ছিলেন, না কি অন্য কেউ তাদের সংস্পর্শে এসেছেন, সেই বিষয়টি নিয়ে খতিয়ে দেখার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। যাদের দেহে সংক্রমণ ধরা পড়েছে, তারা কোথা থেকে এসেছিলেন, সেই খোঁজ করাও শুরু হয়েছে। এমনিতেই গোটা রাজ্যে যে সমস্ত জেলাগুলিকে সংক্রমণ কিছুটা বেশি তার মধ্যে রয়েছে দার্জিলিং। সংক্রমণের হার আগের থেকে অনেকটাই কমলেও ক্রমাগত তা ঘোরাফেরা করছে একটা নির্দিষ্ট সংখ্যার আশপাশে। পাশাপাশি শিলিগুড়ি তথা দার্জিলিং জেলা যেহেতু উত্তর-পূর্বের দ্বার তাই বহু মানুষের চলাফেরা এই অঞ্চলে।

এরই মাঝে ডেল্টা ও ইউকে ভ্যারিয়েন্টের খোঁজ মেলার খবর সামনে আসায় নিঃসন্দেহে কিছু করোনা আতঙ্ক বেড়েছে। এমনিতেই বহু রিপোর্টে প্রকাশিত ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট অতি সংক্রামক। পাশাপাশি অনেকের আশঙ্কা ডেল্টা প্লাস ভ্যারিয়েন্টে ছড়ায় শিশুদের মধ্যে। এই অবস্থায় রাজ্যে যখন করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা, সেই সময় এই খবরে আশঙ্কা বাড়ল বিভিন্ন মহলে।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?

আপনার ভালোলাগা অনুযায়ী স্টার-এ ক্লিক করুন!

এই পোস্টটি রেটিং করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

No votes so far! Be the first to rate this post.