সমাজ ও পরিবেশ

পাহাড় ধসের অন্যতম কারণ বৃক্ষনিধন

Hits: 62

0
(0)

আলম শাইন

পাহাড়-পর্বত-জলাশয়-বনবনানী প্রকৃতির বিশেষ দান বা আর্শীবাদ। যে দানে প্রকৃতির সার্থ সংশ্লিষ্টতা নেই। পৃথিবীর সমগ্র প্রাণিকুলের জন্যই প্রকৃতি এই বিশেষ দান সমবন্টন করে রেখেছে। এই বিশ্ববহ্মাণ্ডের প্রতিটি প্রাণীই প্রকৃতিকে নানাভাবে ভোগ করে আসছে লক্ষ-কোটি বছর ধরে। হতে পারে সেটি জল-বায়ু গ্রহণের মাধ্যমে, হতে পারে খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে, কিংবা হতে পারে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকনের মাধ্যমে। অর্থাৎ প্রাণী জগতকে টিকে থাকতে হলে প্রকৃতির স্বাদ আস্বাদনের বিকল্প নেই। আমরা আগেই বলেছিলাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য অবলোকন করাও প্রকৃতিকে ভোগ করার সমতুল্য। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য বিভিন্ন ভাবেই ভোগ করছে মানবজাতি। যেমন, নদ-নদী, সমুদ্র দর্শন, বন জঙ্গল দর্শন, পাহাড়-পর্বত দর্শন ইত্যাদি। এই সৌন্দর্য্য দর্শনে শুধু আনন্দই পাচ্ছেন না মানুষ, বেঁচে থাকার উপাদানও খুঁজে পাচ্ছেন। যেমন পাহাড়-পর্বতের কথাই ধরা যাক, পর্বত শুধু সৌন্দর্য্যরেই প্রতীক নয়, এর থেকে অর্থনৈতিক ভাবেও স্বাবল্মবী হচ্ছেন মানুষ। সেসব কথায় আমরা পরে আসছি। তার আগে আমরা জেনে নেই পাহাড়ের গুরুত্ব পৃথিবীর জন্য কতটা প্রয়োজনীয়।

পাহাড় বা পর্বতশ্রেণিকে বলা হয় প্রকৃতির পেরেক। ভুমিকম্প প্রতিরোধক বললেও ভুল হবে না। আমরা জানি, পৃথিবীটা হচ্ছে লাটিম সাদৃশ্য ঘূর্ণিমান একটা গ্রহ। সৌরজগতের বিশেষ একটা নক্ষত্র সূর্যকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত ভনভন করে ঘুরছে পৃথিবী। সমস্ত গ্রহ ও নক্ষত্রম-লীকে প্রকৃতি এমন ভাবে নিজস্ব কক্ষপথে স্থাপন করে দিয়েছে যে তাতে এক চুল পরিমাণও এদিক সেদিক হওয়ার সুযোগ নেই। ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রকৃতি বিভিন্ন গ্রহকে বিভিন্নভাবে স্থাপন করেছে, আবার সহায়ক কোন বস্তুকে গ্রহের অভ্যন্তরে সেঁটেও দিয়েছে। পৃথিবীর সহায়ক বস্তু হিসেবে পাহাড়-পর্বতমালা সৃষ্টি করেছে সৃষ্টিকর্তা। আমরা রহস্যময় সেই সৃষ্টি সম্পর্কে সামান্য ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছি আগে, তার পরে বিস্তারিত।

ভূতত্ত্ববিদদের মতে, ‘ভারী ভারী বৃহদাকার প্লেটগুলো পৃথিবীর ওপরের শক্ত স্তর সৃষ্টি করে, সেগুলোর নড়াচড়া আর সংঘর্ষের ফলেই উৎপত্তি ঘটে পর্বতমালার। দুটি প্লেট যখন পরস্পর ধাক্কা খায় তখন শক্তিশালী প্লেটটি অন্য প্লেটের নিচে গড়িয়ে চলে যায়। তখন ওপরের প্লেটটি বেঁকে গিয়ে পর্বত ও উঁচু উঁচু জায়গার জন্ম দেয়। নিচের স্তরটি ভূমির নিচে অগ্রসর হয়ে ভেতরের দিকে এক গভীর প্রসারণের জন্ম দেয়। এর মানে পর্বতের রয়েছে দুটি অংশ। ওপরে সবার জন্য দর্শনযোগ্য একটি অংশ থাকে। তেমনি নিচের দিকে গভীরে এর সমপরিমাণ বিস্তৃতি রয়েছে।’

পর্বতগুলো ভূমির ওপরে ও ভূমির গভীরে বিস্তৃত হয়ে পেরেকের মতো ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন প্লেটকে দৃঢ়ভাবে আটকে ধরে রাখে। পর্বতগুলো দৃঢ়ভাবে ধরে রাখার বৈশিষ্ট্যই ভূপৃষ্ঠের ওপরের স্তরের ভূকম্পন প্রতিরোধ করে অনেকাংশেই। সুতরাং বলা যায়, পর্বতমালা হচ্ছে পৃথিবীর জন্য বিশাল একটা রক্ষাকবচ। অথচ ওই রক্ষাকবচটাকেই মানুষ নানাভাবে তছরূপ করে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়গুলোর রক্ষণাবেক্ষণ না করে বরং পাহাড় কেটে সমতল ভূমি বানাচ্ছে। তছরূপ করে পাহাড়ের জীববৈচিত্র্যও ধ্বংস করছে মানুষ। বিভিন্ন ভাবেই মানুষ পাহাড়ের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে আসছে যুগযুগ ধরে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পাহাড়-পর্বতগুলো তছরূপের শিকার হচ্ছে। তার মধ্যে বৃক্ষনিধন ও মাটিকাটা অন্যতম। যার ফলে বর্ষা এলেই পাহাড়ি অঞ্চলে বিশেষ করে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্রগ্রাম ও কক্সবাজারে দুর্যোগ নেমে আসে। অতি বর্ষণে পাহাড়ের মাটির ধস নেমে অসংখ্য প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে।

পাহাড়ধস নামে মূলত বর্ষা এলেই; প্রতি বছরই এ ধরনের ভয়াবহ ঘটনাটা ভারত-বাংলাদেশে প্রায়ই ঘটছে। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে প্রতি বছরই কোন না কোন পাহাড় ধসে পড়ছে। পরিসংখ্যানে জানা যায়, পাহাড়ধসের ঘটনায় গত ১৫ বছরে শুধু চট্টগ্রাম জেলাতেই প্রাণহানি ঘটেছে প্রায় ৩ শতাধিক। তার মধ্যে ১১.৬.২০০৭ সালে ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনাটি ঘটে। উক্ত ঘটনায় ১২৭ জনের প্রাণহানির সংবাদ জানা যায়। অপর দিকে ২০১৭ সালে তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড়ধসে ১৫৬ জনেরও বেশি মানুষ মারা যান। ওই ঘটনায় ৪ জন সেনাসদস্যও প্রাণ হারান; তারা সেখানে উদ্ধার কাজেই নিয়োজিত ছিলেন।

বিশেষজ্ঞদের গবষণায় পাহাড়ধসের কয়েকটি কারণ জানা যায়; তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, পাহাড়ের মাটি কেটে নেওয়া। অবাধে বৃক্ষনিধন। সড়ক নির্মাণের জন্য পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট করে দেওয়া। তার ওপরে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে বসতি গড়ে তোলা। যার ফলে ভূতাত্ত্বিক গঠন নষ্ট হয়ে পাহাড় ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই বিপর্যয়ের সঙ্গে আবার অতিবৃষ্টি যোগ হয়ে পাহাড় ধসে পড়ছে। ভূমিকম্পের কারণেও পাহাড়ের ধস নামে; আবার প্রয়োজনে ডিনামাইট ফাটিয়েও পাহাড়ের ধস নামানো হয়, সেসব শুধু মাত্র উন্নয়নের ক্ষেত্রে করা হচ্ছে। অন্য দিকে কিছু অসাধু মানুষ ইটভাটার প্রয়োজনে মাটি কেটে এবং ভূমিদস্যুরা পাহাড় দখল করে সমতল বানানোর প্রচেষ্টায় অথবা কৃষি কাজের প্রয়োজনে মাটি কেটে নেওয়ায় পাহাড়গুলো ধসে পড়ছে। দেখা গেছে, পাহাড়ের মাটি কাটার দরুন প্রবল বর্ষণে মাটির স্তরে স্তরে জলের স্রােত প্রবেশ করে পাহাড়ের মাটিকে গলিয়ে ফেলে, অথবা ফাটল সৃষ্টি করে নিচের দিকে ধসে পড়ে। উল্লেখ্য, পাহাড়ের মাটি উপরের দিকে যতটা শক্ত অনুভূত হয় ভেতরটা ততটা শক্ত নয়। ভারত-বাংলাদেশের পাহাড়ের মাটি বেশির ভাগই দো-আঁশ মাটির, বেলে পাথরের পাহাড় থাকলেও সেসব পাহাড়ের সংখ্যা ততটা নয়। আবার কিছু পাহাড় আছে শুধুই মাটি আর বালু দিয়ে গঠিত। আরেক ধরনের পাহাড় আছে, বিভিন্ন স্তরে মাটি ও বালুর মিশ্রণে তৈরি। উল্লেখ্য, ভারতে বরফের পাহাড়ও রয়েছে।

পাহাড় ধসের আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে, বনভূমি উজাড় হওয়া। বৃক্ষরাজির বিস্তৃতি কমে যাওয়া এবং মাটি ঝুরঝুরে হওয়ায় বৃষ্টিজলে পাহাড়গুলোতে ফাটল সৃষ্টি হয়ে ধসে পড়ছে। আবার প্রাকৃতিক বন কেটে ফলবাগান তৈরি করার কারণেও পাহাড় ধসে পড়ছে। দেখা গেছে, এই গাছগুলোর শিকড়ের বিস্তৃতি কম, তেমন শক্তিশালীও নয়, মাটি আঁকড়ে ধরে রাখতে পারছে না। ফলে মাটি আলগা ও শুকনো হয়ে যাচ্ছে। ওই মাটি বেয়ে অতিবৃষ্টির স্রোত নামার কারণেও পাহাড় ধসে যাচ্ছে। এছাড়াও ঝিরি-ঝর্ণার গতিপথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির ফলেও পাহাড়ে বিপর্যয় নেমে আসছে। যেই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে আমাদের উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে শীঘ্রই। এমতাবস্থায় প্রথমত আমাদের করণীয় হচ্ছে, দেশের সমস্ত ন্যাড়া পাহাড়গুলোকে সবুজে মুড়িয়ে দেওয়া। পাহাড়ের জন্য পরিবেশবান্ধব বনায়ন গড়ে পাহাড়গুলোকে সতেজ করে তোলা। তার সঙ্গে অবশ্যই যা করতে হবে, সেটি হচ্ছে পাহাড় কাটা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। উন্নয়ন কাজের জন্য পাহাড় কাটতে হলে অর্থাৎ রাস্তাঘাট নির্মাণ করতে হলে, অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে তা করতে হবে। পাশাপাশি ঝিরি-ঝর্ণাগুলোর গতিপথও ঠিক রাখতে হবে, তবেই পাহাড় ধস রোধ করা সম্ভব হবে, নচেৎ প্রকৃতির এই পেরকগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে অচিরেই। আর তাতে পরিবেশের ভারসাম্যও নষ্ট হয়ে যাবে। বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকায় জুমচাষের কারণে পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের সম্মুখীন। তার ওপরে পাহাড় ধসে পড়লে পাহাড়ের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে একদিন। সুতরাং প্রকৃতিকে বাঁচাতে হলে আগে পাহাড়গুলোকে টিকিয়ে রাখতে হবে আমাদের। কারণ পাহাড় শুধু ভূমিকম্পের প্রকোপ থেকেই রক্ষা করে না, পাহাড়ের উর্বরা মাটি খাদ্যেরও জোগান দেয়। নানা ধরনের সবজি, ফলমূল, ধানসহ হরেক ফসল পাহাড়ের গায়ে উৎপন্ন হয়। যা পাহাড়ি এলাকার খাদ্যের জোগান দেওয়ার পর বাণিজ্যিকভাবে সমতলে চলে আসে। এছাড়াও পাহাড়ি গাছ-গাছালির গুরুত্ব তো রয়েছেই। সব মিলিয়ে বলতে হয় পাহাড়-পর্বত আমাদের জন্য প্রকৃতির বিশেষ আর্শীবাদ, যা টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব সবার উপরেই কমবেশি বর্তায়।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?

আপনার ভালোলাগা অনুযায়ী স্টার-এ ক্লিক করুন!

এই পোস্টটি রেটিং করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

No votes so far! Be the first to rate this post.