আলোচনা, রাজনীতি

সিপিএম ও তার ভাবনার শূন্যতা

Hits: 330

5
(1)

পাঠক মিত্র 

সিপিএমের অধ্যাপক সংগঠনের এক সদস্য ইতিহাসের অধ্যাপক অজন্তা বিশ্বাস ‘বঙ্গরাজনীতিতে নারীশক্তি’ নামে এক উত্তর সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লিখেছেন। প্রবন্ধ লিখতেই পারেন। কিন্তু সেই প্রবন্ধ প্রকাশ পেল চার কিস্তিতে তৃণমূলের মুখপত্রে। এ সম্পর্কে মিডিয়াজুড়ে সিপিএমের বিভিন্ন পদাধিকারীদের নানা মন্তব্য প্রকাশ পেয়েছে। শুধু তাই নিয়ে মাননীয়া অধ্যাপককে সংগঠনবিরোধী পদক্ষেপের জন্য শাস্তিও পেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন অনেক নেতাই। তাঁর দোষ হল, প্রথমতঃ সিপিএমের সদস্য হয়ে তৃণমূলের মুখপত্রে লিখেছেন। দ্বিতীয় দোষ হল, বঙ্গরাজনীতিতে নারীশক্তি ইতিহাসে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীকে সেরার আসনে বসিয়েছেন। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীকে এইভাবে প্রজেক্ট করলেন কেন, যদিও বা করলেন তা তৃণমূলের মুখপত্রে করলেন কেন ? এ প্রশ্ন যে-কেউ শুনলেই সিপিএমের নেতাদের মন্তব্য নিয়ে কথা হয়তো আর থাকে না। কিন্তু প্রবন্ধটি পড়লে আর তখন কোনো প্রশ্ন-যে আসতে পারে তা বলা যায় না। তাঁর লেখা প্রাক-স্বাধীনতার আন্দোলন থেকে এখন পর্যন্ত দলমত নির্বিশেষে রাজনীতিতে বাংলার প্রায় সমস্ত নারীর অবদান তুলে ধরেছেন তিনি। যা অত্যন্ত তথ্যপূর্ণ লেখা। একজন ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে যা তাঁর স্বাভাবিক চর্চার মধ্যেই পড়ে। সেই স্বাভাবিক চর্চার মধ্যেই বঙ্গরাজনীতিতে নারীশক্তির কথা লিখতে গেলে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির কথা চলে আসাটাও স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিকতায় মমতা ব্যানার্জির নাম এসে গেলেই সিপিএমের বিরোধী লেখা হয়ে যায়। কিন্তু বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে মমতা ব্যানার্জির নাম বাদ দিয়ে হতে পারে কি ? যেমন প্রয়াত জ্যোতি বসুর নাম সর্বাধিক সময়ে থাকা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বাংলা রাজনীতি তথা দেশের রাজনীতির ইতিহাসে বাদ যেতে পারে কি ? এমন প্রশ্নও স্বাভাবিক হতে পারে না। কিন্তু এক্ষেত্রে স্বাভাবিক হয়ে পড়লো এই কারণে যে যে-তৃণমূলের কাছে সিপিএমের পরাজয় তারই মুখপত্রে লেখা কেন ? তৃণমূলের কাছে পরাজয় মানে মমতা ব্যানার্জির কাছে পরাজয়। তবে এই পরাজয়ও ত এক ইতিহাস। এ ইতিহাস না-মানলে দলের নেতাদের চিন্তাভাবনা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। নারীশক্তির ইতিহাসে তিনি সিপিএম বা বাম নেত্রীদের কোনো নামই বাদ দেননি। আসলে এই অধ্যাপক শুধু সিপিএম সংগঠনের মানুষ নন, তিনি বিখ্যাত সিপিএম নেতা প্রয়াত অনিল বিশ্বাসের কন্যা। তাই এই পরিবেশ থেকে মমতা ব্যানার্জির নামের ইতিহাস লেখককে তাঁরা মেনে নিতে পারছেন না। যে-পরিবেশ হোক, শুধু মমতা ব্যানার্জির নাম থাকলেই সেই ইতিহাস-লেখককে দলের সদস্য বলে তাঁর শাস্তির কথা ভাবতে হবে !

তৃণমূলের মুখপাত্রে লেখকের পরিচয় অনিল বিশ্বাসের কন্যা বা সিপিএমের স্পর্শের কোনো পরিচয়ের প্রকাশ ছিল না। সেখানে তাঁর পরিচয় হিসেবে ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবেই ছিল। তাহলে একজন ইতিহাসের শিক্ষকের পরিচয়ে লেখাটির জন্য কোনো বিতর্ক হতে পারে না। আসলে বিতর্ক যা-কিছু সিপিএমের চিন্তা ভাবনায়। এঁরা সংস্কৃতিবান, উদার ও সঠিক যুক্তিবাদী নিজেদের মনে করেন। যদিও বাংলার রাজনীতিতে বামবিরোধী হাওয়া বা ঝড় যাই বলা হোক-না কেন তাঁদের ভাবনা যে-সঠিক ছিল না বলেই তা সম্ভব হয়েছে। বামপন্থীর উচ্চ সংস্কৃতির চর্চায় মানুষকে কাছে না-টেনে, মানুষের থেকে তাঁরা দূরে সরে গেছে। আসলে মানুষকে কাছে টানার সেই সংস্কৃতির চর্চাটাই হারিয়ে ফেলেছিল। আর সেই ক্ষয়িষ্ণু সংস্কৃতি চর্চায় অধ্যাপকের প্রবন্ধ সম্পর্কে লেখকের প্রতি তাঁদের ক্ষোভ চাপা থাকেনি। এই ক্ষোভ যত না লেখকের বিরুদ্ধে তার থেকে বেশি ইতিহাসের বিরুদ্ধে। কারণ ইতিহাস তাঁদের মনমতো হয়নি। আর এই জায়গাতেই সমস্ত ক্ষমতাধারী দলের ভাবনার দৈনতা প্রকাশ পায়। ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। আর সেই বিতর্ক থেকে উঠে আসতে পারে সত্যটা। কিন্তু শুধু বিরোধী দল আর বিরোধী নেতার কথা ইতিহাসে এলে তা মানা যায় না, এমনটা হতে পারে না। আসলে মমতার উত্থানের পিছনে বামের ব্যর্থতা হল আসল ইতিহাস। মমতার বাইরে সেই ইতিহাস থেকে তাঁরা কি দূরে থাকতে পারবে ? বাংলার ভোট-পরবর্তী সময়ে বাম নেতারা বলেছিলেন যে বিজেপির সাথে তৃণমূলের বিরোধিতা করা সঠিক হয়নি। এই মন্তব্য কি শুধু ভোটের দিকে তাকিয়ে ? আবার সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বিজেপিকে ঠেকাতে তৃণমূলের সঙ্গে জোট করা যেতে পারে বলে কোনো নেতার মন্তব্য কি শুধু ভোটের নজরে ? তাহলে ভোটের নজরে বিরোধীর সাথে সহবাস করা যায়। কিন্তু দলীয় পরিচয়ের বাইরে ইতিহাসকে মেনে নিতে অসুবিধে হয়। শুধু তাই নয় বামফ্রন্টের আর এক মন্ত্রী মাননীয় ক্ষিতি গোস্বামীর কন্যা অনিল বিশ্বাসের কন্যাকে সমর্থন জানিয়ে তৃণমূলের মুখপত্রে এক নিবন্ধ (03.08.21) লিখেছেন। যেখানে সিপিএমের অনিল-কন্যার প্রতি স্ট্যলিনিস্ট আচরণ করছে বলে মন্তব্য করেছে। সিপিএমের পরিবেশ থেকে বেড়ে ওঠা ব্যক্তি স্ট্যালিন সম্পর্কে তথাকথিত বিতর্ক মন্তব্য থেকে বের হতে না-পারা সিপিএমের বামপন্থা চর্চার পরিপন্থী বলে মনে হয়।

ঠিক এই মুহুর্তে দলবদলের স্রোত আর সিপিএমের বর্তমান পরিস্থিতিতে অনিলকন্যাকে নিয়ে এমন বিতর্ক ও মন্তব্যের প্রচার তাঁদেরকে আরো শূন্যতার দিকেই নিয়ে যায়।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?

আপনার ভালোলাগা অনুযায়ী স্টার-এ ক্লিক করুন!

এই পোস্টটি রেটিং করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

No votes so far! Be the first to rate this post.