আলোচনা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বা কালো ছত্রাক

Hits: 7

0
(0)

ডাঃ সঞ্জয়কুমার মল্লিক

মিউকরমাইকোসিস (আগে যাকে বলা হত জাইগোমাইকোসিস) একটি ফাঙ্গাস রোগ যা ব্ল্যাক ফাঙ্গাস নামে পরিচিত। এটি মারাত্মক তবে বিরল সংক্রমণ। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে COVID-19 আক্রান্ত হওয়ার পর বা COVID-19 থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার পর অনেকের শরীরে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস-এর আক্রমণ শুরু হচ্ছে। এটি একটি বিরলতম রোগ হিসেবেই মনে করছেন চিকিৎসক মহল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি একটি প্রাণঘাতী রোগ। রিকভারি রেট ৩০-৫০ শতাংশ। ৫০-৭০% শতাংশ আক্রান্ত রোগী মারা যেতে পারে বলে চিকিৎসক মহলের অনুমান।

এটি সাধারণত মিউকর নামক ছাত্রকের সংস্পর্শে আসার কারনে হয়ে থাকে। মিউকর সাধারণত পাওয়া যায় মাটি, গাছ, পচে যাওয়া বা নষ্ট হয়ে যাওয়া শাক-সবজি ও ফলে। চিকিৎসকদের মতে, এছাড়াও ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে জায়গা, বাতাসে, সুস্থ মানুষের নাকে ও শ্লেষা ঝিল্লিতে থাকতে পারে। যেভাবে ছাড়িয়ে পড়ে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস–পরিবেশ থেকে মানুষের শরীরে, মানুষ থেকে মানুষের শরীরে, পশু থেকে মানুষের শরীরে।

শরীরে কাটা অংশ, পোড়া অংশ ও চামড়ার চিঁড়ে যাওয়া অংশ দিয়েও ব্ল্যাক ফাঙ্গাস প্রবেশ করতে পারে।

ব্ল্যাক ফাঙ্গাস প্রথমে মুখমণ্ডলের সাইনাসগুলোকে আক্রমণ করে, মুখের ভেতর, নাক, চোখ, দাঁতের মাড়ি আক্রান্ত হয়। ধীরে ধীরে তা লাংস বা ফুসফুস, ব্রেন ও সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমকে আক্রমণ করে। বিশেষ করে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম যেমন উচ্চ ব্লাড সুগার যুক্ত রোগী, ক্যানসার, এডস বা HIV আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে ও যে যে রোগীর ওপর স্টেরয়েড চিকিৎসা বেশি হয়েছে সেই সব রোগীদের ক্ষেত্রেও ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বা মিউকরমাইকোসিস রোগের সংক্রমণের সম্ভাবনা বেশি ও এটি একটি প্রাণঘাতী রোগ বলে মনে করছেন চিকিৎসক মহল। এছাড়া ও যাদের অর্গান ট্রান্সপ্লান্ট, স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্ট রোগীদের ক্ষেত্রে, নিউট্রপেনিয়া রোগীদের ক্ষেত্রেও ব্ল্যাক ফাঙ্গাস সংক্রমণের সম্ভাবনা বেশি।

আবার COVID-19 থেকে সেরে ওঠা রোগীদের সুস্থ করে তুলতে যে সমস্ত রোগীদের বেশি পরিমানে স্টেরয়েড চিকিৎসা হয়েছে [জটিল রোগে আগে থেকেই আক্রান্ত যে সমস্ত রোগী COVID 19-এ আক্রান্ত হয়েছে তাদের যেহেতু নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে সেহেতু স্টেরয়েড ব্যবহার করতে হয়। এছাড়াও COVID-19 আক্রান্ত রোগীদের ফুসফুসে ফোলা (inflammation of lungs) কমাতে স্টেরয়েড ব্যবহার হয়।] তাদের ক্ষেত্রেই ব্ল্যাক ফাঙ্গাস এর সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে নাকে অক্সিজেন নল লাগানো রোগীদের ক্ষেত্রেও সংক্রমণ ঘটতে পারে বলে চিকিৎসকরা দাবি করছেন।

ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের লক্ষণসমূহ– 

বিভিন্ন স্থান থেকে যে সমস্ত লক্ষণগুলো পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো হল নিম্ন রূপ:

সাধারণ লক্ষণ-জ্বর, মাথাব্যথা, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, নাকের চারিদিক ফুলে যাওয়া, জন্ত্রনা, ত্বকে লালচে ভাব। নাক, চোখ ও মুখমন্ডলের জন্ত্রনা। কাশি, বুক চেপে যাওয়া, ফুসফুসে কফ জমা ও কখনও কখনও কাশির পর ঘন বা রক্তযুক্ত কফ উঠতে পারে।

এছাড়াও লক্ষণ নাক থেকে লাল ও কালচে রক্ত পড়া, চোখ ফুলে যাওয়া সেই সঙ্গে চোখে জন্ত্রনা, চোখের পাতা সহজেই বন্ধ হয়ে যায়, দৃষ্টি শক্তি কমতে থাকে, শেষ পর্যন্ত রোগী অন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমনকি সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে দুটো চোখ অন্ধ হয়েও যেতে পারে। নাকের চারিদিকে কালচে কালচে দাগ দেখা দিতে পারে। দাঁতে জন্ত্রনা, মাড়ি ফোলা, কয়েক দিনের মধ্যেই দাঁত নড়তে থাকে। মুখমন্ডলের উপরি অংশে কালচে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ দেখা দিতে পারে। এগুলো মাঝে মধ্যেই লক্ষ রাখা উচিত। অনেক সময় এমনও খবর আছে যাতে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস ব্রেনে না পৌঁছতে পারে তার জন্য চোখ অপারেশ করে বের করতে হয়েছে। কখনও সংক্রমণ রুখতে দাঁতের মাড়ির কিছু অংশ অপারেশন করে বাদ দিতে হয়েছে বলে খবর। তবে সার্জারি বিরলতম ঘটনা। যখন মেডিসিনাল চিকিৎসা কাজ করে না তখনই কিছু কিছু চিকিৎসক রোগীর জীবন রক্ষা করতে সার্জারির কথা ভেবেছেন।

ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা যেতে পারে যেমন, হাসপাতালের COVID-19 রোগীদের রুম গুলোতে, ICU-গুলোতে যাতে মিউকরের স্পোর না থাকতে পারে তা নিশ্চিত করা। রোগীদের অক্সিজেন দেওয়া কিটসগুলোকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর স্যানিটাইজ করার দিকে লক্ষ রাখতে পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকগন। উচ্চ ব্লাড সুগার রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, কারন রক্তে যত বেশি মাত্রায় শর্করা উপস্থিত থাকবে তত বেশি ব্ল্যাক ফাঙ্গাস সংক্রমণের তীব্রতা দেখা দিবে। যে সমস্ত COVID-19 থেকে সেরে ওঠা রোগীদের স্টেরয়েড থেরাপি হয়েছে তাদের বাড়িতে আসার পর কিছু দিন বাড়ির ভেতরে থাকতে হবে কারন ওনাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। জানালা খোলা রাখতে হবে, এ সি বন্ধ রাখাই ভালো। অন্যান্য যেকোন পুরাতন ও জটিল রোগে ভোগা রোগীদের রোগের যত্ন নিতে হবে। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এমন খাবার ও ফল শাক-সবজি, দু-চারটে তুলসীপাতা লিকার চায়ে ফেলে খাওয়া যেতে পারে। আদা(তরকারিতে ও কাঁচা আদা সামান্য পরিমানে লবন দিয়ে সকাল-সন্ধ্যা খেলে উপকার পাওয়া যেতে পারে), রসুন, কাঁচা পেঁয়াজ, ভিটামিন সি যুক্ত খাবার যেমন লেবু, মুসাম্বি, আমলকি, কাঁচা লঙ্কা খেতে হবে। ডিম-মাছ-মাংস ও প্রয়োজন মতো খেতে হবে। ধীরে ধীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে, পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে সুস্থ হয়ে ওঠার পর বাড়ির বাইরে বেরোনো উচিত। মাটির কাজ করার সময় গ্লাভস ব্যবহার করা উচিত। পচে যাওয়া শাক-সবজি, ফল যত্রতত্র না ফেলে মাটিতে পুঁতে দেওয়া উচিত। মাস্ক ব্যবহার করা উচিত, ভিড় এড়িয়ে চলা উচিত, সাবান দিয়ে বারে বারে হাত ধুয়ে নেওয়া উচিত, স্যানিটাইজার ব্যবহার করা উচিত। ভয় না পেয়ে সাবধানে থাকা উচিত। লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা করানো উচিত। সাবধানতা ও চিকিৎসা অনেক সময় রোগীকে সুস্থ করে তুলতে সাহায্য করে।

এ ব্যাপারে আয়ুর্বেদিক, হোমিওপ্যাথিক ও মডার্ন মেডিসিনের চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা করাতে পারেন। নিজে নিজে ঔষধ সেবন না করাই ভালো।

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা মতে রোগের লক্ষণ, রোগের স্থান ও রোগের তীব্রতা অনুযায়ী কিছু হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন ব্যবহার করলে উপকার পাওয়া যেতে পারে যেমন, আর্সেনিকাম এলবাম, ফেরাম ফস, মার্কসল, মার্ক-বিন-আয়োড, মার্ক-প্রোটো-আয়োড, ক্যালি বাইক্রোম, বেলেডোনা, একোনাইট, আর্জেন্টাম নাইট্রিকাম, ইউফ্রেসিয়া, ফসফরাস, রাসটক্স, নাট্র্যাম মিউর, ল্যাকেসিস ইত্যাদি। তবে আবার বলা একজন চিকিৎসকই পারে তার অভিজ্ঞতা ও রোগ লক্ষণ মিলিয়ে তার রোগীর জন্য সঠিক ঔষধ, সঠিক পোটেন্সি, সঠিক ডোজ নির্বাচন করতে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ মতো চলার চেষ্টা করাই ভালো।

সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের কথা, দুশ্চিন্তার কথা ভেবে ও আমার কিছু চিকিৎসক বন্ধুদের কথা ভেবে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস রোগ সম্পর্কে যতটা জানতে পেরেছি ততটাই জানানোর চেষ্টা করেছি। বিশেষজ্ঞ হিসেবে লেখাটি লিখিনি।। কারও কাজে লাগলে পরিশ্রম সার্থক হবে এই আশা রাখি। সবার সুস্বাস্থ্য কামনা করি। আসুন সবাই মিলে হাতে হাত রেখে, পাশে থেকে রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করি।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?

আপনার ভালোলাগা অনুযায়ী স্টার-এ ক্লিক করুন!

এই পোস্টটি রেটিং করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

No votes so far! Be the first to rate this post.