অপরাধ ও দুর্নীতি, আলোচনা, রাজনীতি

কৃষকদের প্রতি অমানবিক অত্যাচারের চরম ফল ভুগতে হবে বিজেপিকে

Hits: 12

3
(3)

বটুকৃষ্ণ হালদার

ভারতবর্ষ নদীমাতৃক হওয়ার জন্য বিশ্বের কাছে কৃষিসমৃদ্ধ দেশ হিসেবে পরিচিত। এজন্যই ভারতবর্ষের বেশিরভাগ রাজ্য মূলত কৃষিপ্রধান। কৃষকরা হাড় হিম করা পরিশ্রম করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ভারতবর্ষের মুখে অন্ন তুলে দেয়। অথচ তারা বিশেষ কোনও সুযোগ-সুবিধা পায় না। দেশের নেতা-মন্ত্রীরা মুখে বড় বড় ভাষণ দিলেও তাদের জন্য বিশেষভাবে কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। আর এ জন্য স্বাধীনতার ৭৪ বছর অতিক্রান্ত হলেও কৃষকদের আত্মহননের পথ বেছে নিতে হয়। ঝড়-জল-বন্যা-খরাতে তারা বারবার ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ঋণ নিয়ে পুনরায় চাষবাস করতে শুরু করেন। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রক্ত ঝরিয়ে চাষ বাস করার পরেও কৃষকরা ফসলের ন্যায্যমূল্য পায় না। মাঝপথ থেকে সরকারের পোষ্য মজুতদার, আড়তদার, পুঁজিবাদী, ব্যবসায়ীরা ফুলে ফেঁপে মালামাল হয়ে যায়। আর কৃষকদের ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখা বৃথাই পর্যবসিত হয়।

দেশের অন্নদাতা কৃষকরা দুবেলা নিজেদের পরিবারের মুখে অন্য তুলে দিতে হিমশিম খায়। এদের সন্তানরদের পরনে জোটে না দামি পোশাক, ইংলিশ মিডিয়াম তো দূরের কথা বাংলা মিডিয়াম স্কুলের পড়ার খরচটুকুও যোগাতে পারে না। এ যেন ঘরামির ঘরের চাল ফুটো হওয়ার কাহিনী। যারা ভোটের সময় সাধারণ জনগণকে মিথ্যা স্বপ্নের পাহাড়ে দাঁড় করাতে চায়, তারাই ভোট শেষ হলে সত্যি উড়ানে বিদেশে যায় ফুর্তি করতে। তাও আবার জনগণের করের টাকায়। দেশের অনাহারে দরিদ্র হতাশায় না মরে বেঁচে থাকা অসহায় কৃষকগুলোর সমস্যার কথা জেনেও নাকে তেল দিয়ে দিব্যি শীতঘুমে যায়। এসব ব্যাপারে তারা দিনেরবেলাও দেখতে পান না, চোখে বেহায়ার ছানি পড়ে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে দেশে বহু অর্থ অপচয় হয়। কখনও বা কোটি কোটি টাকায় মূর্তি গড়া হয়, আবার কখনওবা স্টেডিয়াম বানানোর কাজ শুরু হয়। বানানো হয় বহু বেদি-মন্দির-মসজিদ-পবিত্র উপসনালয়। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে দেওয়া যেতে পারে, আমাদের দেশে বহু লোকের নামে স্টেডিয়াম আছে যারা জীবনে কোনদিন খেলেইনি।

যে সমস্ত অর্থ অপচয় করা হয় সেই অর্থ দিয়ে কি অন্নদাতা কৃষকদের সাহায্য করে মুখে একটু হাসি ফোটানো যায় না? আবার সিপিআইএম পশ্চিমবাংলায় ৩৪ বছর রাজত্ব করেছে। তারা অসহায় মানুষগুলোর দুর্দশার মোচন করতে গিয়ে অসহায়দের সুযোগ নিয়েছে। গরীব আরও গরীব হয়েছে, প্রায় ৫৮ হাজার কলকারখানা বন্ধ করে বহু মানুষকে বেকার করে দিয়েছে। তাদের উক্তি ছিল ‘চাষার ছেলে চাষা হবে’। চাষবাস ছেড়ে যদি সবাই ইংরেজি বলতে শেখে তাহলে ঝান্ডা ধরবে কে? এই মানসিকতাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের দেশে নেতা-মন্ত্রীরা নির্বাচনী প্রচার কার্য চালায়। এখন প্রশ্ন যে নির্বাচন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সামান্যটুকু সুখ কেড়ে নেয় সেই নির্বাচনে দরকার আছে কি?

১৯৫০ সাল থেকে এই ভারতবর্ষে নির্বাচনী প্রচার চালু হয়েছিল। কিন্তু এত বছর কৃষকরা কি পেয়েছে? ভাবতে অবাক লাগে যারা দিল্লির কৃষক আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যবহার করছে অসহায় মানুষগুলোকে তাদের কাছে একটাই প্রশ্ন এ যাবৎ তারা কৃষকদের কোনও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে এসেছে? বছরে বছরে ভোটপর্ব অনুষ্ঠান হয় ভারতবর্ষে, আর কৃষকদের উপর অত্যাচারের মাত্রা তীব্র হয়ে উঠছে দিন দিন। এই মুহূর্তে আসাম ও উত্তরপ্রদেশে কৃষকদের উপর নির্মম অত্যাচারে শঙ্কিত গোটা দেশ। আসাম সরকার উচ্ছেদের নামে নিরীহ কৃষকদের উপর গুলি চালায়। তাতেও থেমে থাকেনি মৃত কৃষকের লাশের উপর দাপাদাপি করা চিত্র সাংবাদিকরা আসামের লোক। ভাবতে অবাক লাগছে তাই না। যে দেশে মৃত মানুষ নিরাপদ নয় সেই দেশে জীবিতরা কতটা নিরাপদে থাকবে তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন? প্রশ্ন উঠছে মানুষের বিবেকের উপর। কোথায় হারিয়ে যাচ্ছি আমরা? এখন সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে আমরা বসবাস করছি? হাজার প্রশ্ন জীবিত মানুষগুলোর মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। আধুনিক সভ্য সমাজের মানুষ হয়েও মৃত মানুষের উপর এমন অত্যাচারের পরেও আমরা নিজেদেরকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠজীব মানুষ বলে কতটা দাবি করতে পারব?

একই পথে হাঁটছে ভারতবর্ষের অন্য একটা রাজ্য উত্তরপ্রদেশ। যে রাজ্যটির নজিরবিহীন বর্বরতা বরাবরই সংবাদ মাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসে। আন্দোলন মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের দুর্বলতা প্রকাশ পায়। কিন্তু আন্দোলনকারীদের ওপর গাড়ি চালিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে পিষে মেরে ফেলা কোন ধরনের বর্বরতা বলতে পারেন কেউ? এমন একজন অন্যতম ঘটনা ঘটিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ এক মন্ত্রীর ছেলে। সাধারণ মানুষ ভোট দিয়ে একজনকে মন্ত্রী বানায় দেশের জনগণের অধিকার ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে। কিন্তু সেই মন্ত্রী জনগণের অধিকার হরণ করা হলে তার শাস্তি কি হওয়া উচিত আমাদের দেশের সংবিধানে আছে কি? কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ মন্ত্রী নিজের ছেলের হয়ে সাফাই গাইছে, যে কিনা এমন জঘন্যতম অপরাধ করেছে। এখনও সেই মন্ত্রী তার পদে নির্লজ্জের মতো বহাল আছেন, ইস্তফা দেননি। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারও নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। তবে বলাবাহুল্য সাধারণ মানুষের হত্যার অপরাধে এমন অপরাধীকে বাঁচিয়ে রাখা ও সমাজের পক্ষে খুব একটা সন্তোষজনক নয়।

ক্ষমতার অপব্যবহার করা আমাদের দেশের প্রধান নীতি হয়ে উঠেছে। যার কারণে ভন্ড মুখোশধারী সমাজসেবকরা অপরাধ করেও বেল পায়, আর আন্দোলনকারীরা জেলের সাজা কাটে। এমন নজির আমাদের ভারতবর্ষের অজস্র রয়েছে।

মনে পড়ে পশ্চিমবাংলায় বর্ধমানের সাঁইবাড়ি হত্যাকাণ্ডের কথা। তৎকালীন সময়ে এক কংগ্রেসী পরিবারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা মনে পড়লে শিউরে উঠতে হয়। মায়ের চোখের সামনে ছেলেকে হত্যা করে তার রক্ত দিয়ে ভাত মিশিয়ে মাকে খাওয়ানো হয়েছিল। এমন বর্বর ঘটনা ঘটিয়ে ও সাজা পায়নি অপরাধীরা। তারা ছিলেন তৎকালীন রাজ্য সরকারের অধীনস্থ মন্ত্রীমন্ডলের কর্মকর্তা। হ্যাঁ এমনটাই আমাদের দেশের নিয়ম। জঘন্য ও বর্বর অপরাধীরা হয়ে ওঠেন দেশ বা রাজ্যের নেতা-মন্ত্রী। তবে এর আগে উত্তরপ্রদেশে উন্নাও ধর্ষণকাণ্ড, হাথ্রাস ধর্ষণকাণ্ড সহ একাধিক দুর্নীতিমূলক কাজে বর্বরতার নিদর্শন দিয়ে এসেছে।

বর্তমান সময়ে কৃষকদের অবদান আমরা কখনো অস্বীকার করতে পারি না। তবে স্বাধীনতার আগের ইতিহাসটাও আমাদের একটু অনুধাবন করা দরকার। সে সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বহু কৃষক আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে। সেই আন্দোলন প্রতিহত করতে গিয়ে ব্রিটিশরা অত্যাচারের চরম সীমায় পৌঁছে ছিলেন। বহু কৃষক আন্দোলন করতে গিয়ে ব্রিটিশদের হাতে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করেন। কৃষকদের দাঁড়ায় এই আন্দোলনটি সমাজের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। বহু ঐতিহাসিক এ বিষয়ে পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলেছেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনগুলি ছিল প্রকৃত জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। কিন্তু সমাজের একাংশ স্বার্থবাদীদের অঙ্গুলিহেলনে এই আন্দোলনগুলো জাতীয় মাত্রায় রূপ পায়নি। চুয়ার নীল বিদ্রোহ সাঁওতাল বিদ্রোহ মতো কয়েকটি আন্দোলনকে শুধুমাত্র ইতিহাসে তালিকাভুক্ত করা হয়। কৃষক আন্দোলনের সাথে জড়িত বহু মানুষ স্বাধীনতার পরে জীবিত ছিলেন তাঁরা বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম সুযোগটুকুও পায়নি। তবে একথা নিশ্চিত কৃষকদের সাথে এমন দুর্ব্যবহারের মূল্য পরিশোধ করতে হবে ভারতীয় জনতা পার্টিকে।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?

আপনার ভালোলাগা অনুযায়ী স্টার-এ ক্লিক করুন!

এই পোস্টটি রেটিং করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

No votes so far! Be the first to rate this post.