আলোচনা, বিনোদন

কিংবদন্তি অভিনেতা দিলীপ কুমার ওরফে মুহাম্মদ ইউসুফ খান

Hits: 106

0
(0)

তন্ময় সিংহ রায়

বিভিন্ন কাল্পনিক চরিত্রে নিখুঁত অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে বলিউডের পর্দা কাঁপিয়ে আনন্দ, দিওয়ার, শোলে, অমর আকবর অ্যান্টনি, ডনের মতন একের পর এক সুপারহিট ফিল্ম ক্রমাগত রিলিজের মধ্যে দিয়ে যখন তিনি একেবারে সুপারস্টার। এমনকি তাঁর ব্যক্তিত্বের কাছে সে মুহুর্তে অন্যান্য অভিনেতারাও যখন হয়ে পড়েছিলেন ব্লার, ঠিক সে মুহূর্তে তাঁর কাছে অফার এসে পৌঁছয় শোলে-এর পরিচালক রমেশ সিপ্পির’ই আর এক মুভি ‘শক্তি’তে কাজ করার। সিনেমার স্টোরি তো পছন্দ হয়ে যায় ৬ ফুট উর্ধ্ব, ট্যালেন্টেড এই অভিনেতার, কিন্তু যখনই এ দুঃসংবাদ তাঁর কানে এসে প্রবেশ করে যে এই ছবিতে বিপরীতে তাঁকে কাস্ট করতে হবে স্বয়ং দিলীপ কুমার ওরফে মুহাম্মদ ইউসুফ খানকে, তো সে রাত্রে ঘুম পর্যন্ত উড়ে যায় এই অভিনেতার। অর্থাৎ অমিতাভ বচ্চনের মতন একজন অভিনেতা রীতিমতন চিন্তায় পড়ে যান যে শ্যুটিং চলাকালীন তাঁর এই অভিনয়ের দৈর্ঘ্য না ছোটো হয়ে যায় দিলীপ কুমারের ধারালো অভিনয়ের কাছে, আর হবে নাই বা কেন? সমগ্র বলিউড ইন্ডাস্ট্রির তাবড় তাবড় অভিনেতা-অভিনেত্রীরা যে অভিনয়ের পিতা হিসেবেই মনে করতেন এই কিংবদন্তি অভিনেতাকে। তাঁর অভিনয়ের দ্যুতিতে সমৃদ্ধ হয়েছেন বিশেষত বলিউডের বহু নামী-দামী তারকারা। হিন্দি ছবিতে রোমান্টিক চরিত্রে অভিনয়ের ব্যাপারে দিলীপ কুমারের কোনও বিকল্প ছিল যে নাই, তা বিলক্ষণ জানতেন অনেকেই। বলিউডের স্বর্ণালী যুগের অসাধারণ সব নায়িকা নার্গিস ও মধুবালা থেকে বৈজয়ন্তীমালা, মীনা কুমারী আবার ওয়াহিদা রেহমান- সবাই তো বলতে গেলে মুকিয়ে থাকতেন দিলীপ কুমারের সঙ্গে অভিনয় করার জন্যে। দিলীপ কুমারের মৃত্যুর আগে তাঁকে নিয়ে একবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অমিতাভ বচ্চন তো বলেইছিলেন যে, দিলীপ কুমারের অটোগ্রাফ পেতে তাঁর সময় লেগেছিল ৪৬ বছর।

হিন্দি সিনেমা জগতের ইতিহাসের বহুল আলোচিত ছবির একটি হল ভারতের বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার করিমুদ্দীন আসিফের ‘মুঘল-ই-আজম। ‘ সম্রাট জাহাঙ্গীর ওরফে প্রিন্স সেলিমের চরিত্রে সেখানে দিলীপ কুমারের সেই দুর্দান্ত অভিনয়ের পর ব্রিটিশ পরিচালক ডেভিড লিয়েন তাঁকে ‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’ ছবিতে প্রস্তাব দিয়ে বসেন শেরিফ আলীর চরিত্রে অভিনয়ের জন্যে, কিন্তু দিলীপ কুমার তা প্রত্যাখ্যান করেন সবিনয়ে। তিনি সর্বদাই চাইতেন বলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। শুধু অসম্ভব অভিনয় দক্ষতাই বা কেন বলা? কিছু মানবিক গুণও ভারতীয় সিনেমার এই ট্র‍্যাজেডি কিং-কে নিয়ে গিয়ে পৌঁছে দিয়েছে একেবারে শীর্ষে। তিনি পারশ্রমিকের চেয়ে নিজের অভিনয় পারফেকশনে সর্বদাই ফোকাস রাখতেন অনেক বেশি এবং অত্যন্ত বিনয়ী ও পরিশীলিত ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন এই অসামান্য অভিনেতারূপী মানুষটা। তাঁর ৯৮ বছরের প্রয়াণের এই শোক শুধু পাথর করেনি গোটা বলিউড জগতকেই, বরং শোকে বিহ্বল পাক প্রধান ইমরান খান থেকে সম্পূর্ণ পাকিস্তান পর্যন্ত! এ প্রসঙ্গে ইমরান খান আন্তরিক এক শোক বার্তায় উল্লেখ করেছেন, মা শৌকত খানুমের নামে ক্যানসার হাসপাতাল তৈরির উদ্দেশ্যে সে মুহুর্তে দাঁড়িয়ে অর্থ সংগ্রহের জন্যে দিলীপকুমার যে ভাবে পাকিস্তান ও লন্ডনের অনুষ্ঠানে এসে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সে কথা তিনি ভুলবেন না কোনোদিনও। প্রাক্তন পাক বিদেশ মন্ত্রী ও লেখক খুরশিদ মাহমুদ কাসুরি তো তাঁর এক গ্রন্থে উল্লেখই করেছেন যে, মহান এই অভিনেতা যখনই এসেছেন পাকিস্তানে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য কাজ করে গেছেন গোপনেই।

১৯২২ সালের ১১ ডিসেম্বর পাকিস্তানের পেশাওয়াতে জন্মগ্রহণ করা এই সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান পেশাওয়াতেই ফল ব্যবসায়ী বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে ঘর ছেড়ে পাড়ি জমান মুম্বাইতে। এরপর পুণেতে নিজের ক্যান্টিন খুলে বিক্রি করতেন স্যান্ডউইচ, স্বপ্ন, প্রতিষ্ঠিত একজন ব্যবসায়ী হওয়া। এমনকি বিনিময়ে তখনকার দিনে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত সেভিংস করতে পেরেছিলেন দিলীপ কুমার।

কিন্তু ভাগ্যে তাঁর জীবনের গল্পটা সংগোপনে লেখা ছিল যে অন্য। ঘটনাচক্রে ১৯৪৪ সালে ‘বোম্বে টকিজ’-এর ব্যানারে অমিয় চক্রবর্তী পরিচালিত ‘জোয়ার ভাটা’ নামক ভারতীয় নাটক চলচ্চিত্রে ঘটে গেল তাঁর অভিনয়ের অভিষেক। পরবর্তীকালে ১৯৪৭ ও ১৯৪৮ সালে যথাক্রমে ‘জুগনু’ ও ‘শহিদ’ মুভি বাণিজ্যিকভাবে সফল হওয়ার পর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে, এরপর একে একে ‘দাগ’, ‘দেবদাস’, ‘আজাদ’, ‘নয়া ডর’, ‘কোহিনুর’, ‘মুঘল-ই-আজম’, ‘গঙ্গা-যমুনা’ প্রভৃতি মুভিতে অবিশ্বাস্য অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে তিনি হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিলেন যে তিনি যথেষ্ট যোগ্যতা রাখেন একজন বড় মাপের অভিনেতা হওয়ারও। দীর্ঘ ছয় দশকের বর্ণময় অভিনয় জীবনের রাজত্বে ভারতীয় সিনেমায় তিনি সৃষ্টি করেছিলেন আলাদা এক যুগের, আর তাঁর মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করে এমনটাই ট্যুইট করেছেন স্বয়ং বিগ বি।

দাম্পত্য জীবনে বাবা ডাক না শোনার একটা নিদারুণ দুঃখ-হতাশা প্রায়সময়েই ঢেউ তুলতো তাঁর সমগ্র মন জুড়ে! বলাবাহুল্য স্বামীর প্রতি যথাযোগ্য স্ত্রী হিসেবে শেষ পর্যন্ত কিন্তু সায়রা বানু পালন করে গেছেন তাঁর সমস্ত দায়িত্ব, পাশে থেকেছেন সর্বক্ষণ। তবে নিঃসন্তান হলেও বলিউড বাদশা শাহরুখ খানকে সন্তানের চোখেই দেখতেন বর্ষীয়ান এই অভিনেতা ও সায়রা বানু। বলা যায় যে, শাহরুখ খান ছিলেন দিলীপ সাবের ‘মু বোলা বেটা। ‘ ভারতীয় সিনেমার এই প্রথম খান তাঁর দীর্ঘ অভিনয় জীবনে, বলিষ্ঠ অভিনয় পারদর্শীতার মাধ্যমে মুগ্ধ করে যেমন জিতে নিয়েছেন লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়কে, তেমনই সম্মান হিসেবে পেয়েছেন এত পুরস্কার যে, সর্বোচ্চসংখ্যক পুরস্কার বিজয়ী হওয়ার জন্য তিনি জায়গা দখল করে নেন ‘গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড’-এ।

বলিউডের ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম সেরা এই অভিনেতা ‘ফিল্মফেয়ার বেস্ট অ্যাক্টর অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন সর্বমোট ৮ বার। ১৯৯৩ সালে সম্মানিত হয়েছেন ‘ফিল্মফেয়ার আজীবন সম্মাননা’য়। ১৯৯৪ সালে পেয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘দাদাসাহেব ফালকে। ‘ ভারত সরকার তাঁকে ১৯৯১ সালে ‘পদ্মভূষণ’ এবং ২০১৫ সালে সম্মানিত করে ‘পদ্মবিভূষণ’ সম্মানে।

শেষ সময়ে এসে এই অসম্ভব গুণী মানুষটা চিনতে পারতেন না অনেককেই। বয়সজনিত অসুস্থতার কারণে বিগত এক বছর ধরে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় একাধিকবার। তবে শ্বাসকষ্টজনিত শারীরিক জটিলতার কারণে তিনি শেষ পর্যন্ত আবারও ভর্তি ছিলেন মুম্বইয়ের হিন্দুজা হাসপাতালে। কিন্তু না এবারে আর হল না তাঁর নিজের প্রিয় বাড়িটায় ফেরা! ২০২১-এর ৭ জুলাইয়ের সকালটাই যে হয়ে যাবে তাঁর জীবনের শেষ সকাল, তা কি আর তিনি জানতেন? না জানতেন আর মাত্র কয়েকবার তিনি গ্রহণ করতে পারবেন অক্সিজেন? এরপর বাধ্য হয়ে চিরবিদায় জানাতে হবে বহু প্রিয়জনকে, দাম্পত্য সঙ্গিনীকে একা রেখেই অনিচ্ছাকৃত চলে যেতে হবে তাঁকে অজানা এক দেশে, যেখান থেকে চাইলেও আর যাবে না ফেরা? সর্বশেষ সেদিন সকাল ৭.৩০ টায় তিনি ত্যাগ করেন তাঁর শেষ নিঃস্বাসটা! তবে দেহের মৃত্যু হলেও, তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম সুস্থ-সবলভাবে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকবেন বিশেষত লক্ষ লক্ষ অভিনয় প্রেমী মানুষের হৃদয়ে!

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?

আপনার ভালোলাগা অনুযায়ী স্টার-এ ক্লিক করুন!

এই পোস্টটি রেটিং করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

No votes so far! Be the first to rate this post.