আলোচনা, সমাজ ও পরিবেশ

ফেসবুক, মানুষ চেনার এক উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম

তন্ময় সিংহ রায়

সে হোক আসল অথবা নকল, একটু বেশি বেশি লাইক, আর একটু বেশি শেয়ার, একটু পজিটিভ কমেন্ট বা কৃত্রিমভাবে ফেসবুক ফলোয়ার্স বাড়িয়ে নেওয়ার মাধ্যমে জনপ্রিয়তাকে একান্তভাবে পাওয়ার জন্যে মানুষ যে কি না কি করতে পারে, তা ফেসবুক নামক স্যোশাল মিডিয়ার এই দৈত্য ভূমিষ্ট না হলে পারতাম’ই না বোধহয় জানতে,

থেকে যেতাম এ বিষয়ে অজ্ঞতার অন্ধকারেই!

লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাগুলো যেন ক্রমশই উঠছে মানুষের মনে হীরে কিংবা অন্যান্য মণিমাণিক্য প্রাপ্তির মতই হয়ে, সে কনটেন্ট-এর ধড়, মুন্ডু বা নাক-চোখ থাকুক আর নাই বা থাকুক।

এই বিশেষত বেশি বেশি লাইক না মিললে মনটা যেন প্রবল ইচ্ছায় হয়ে যেতে চায় ভেঙে টুকরো টুকরো, আর পেলে মনটা যেন ডগমগ করে ওঠে অনাবিল আনন্দে!

কিন্তু আমরা মাথায় রাখি না যে, যে পরিমাণে সেগুলো প্রত্যাশা আমরা করছি, ঠিক সেই ধরণ বা ওজনের কনটেন্ট আমরা পোস্ট করছি কি? আমাদের ফ্রেন্ড সার্কেলে যাঁরাই আছেন, তাঁদের রুচি ঠিক কেমন? লাইক, কমেন্ট, শেয়ার বেশি প্রত্যাশা করলে সেই অনুযায়ী আমরা পোস্ট করি কি? শুধুই কি পোস্ট করছি না সেই সম্পর্কিত যথাযথ ইন্ট্রো বা ক্যাপশন আমরা দিচ্ছি? পোস্টের রেগুলারিটি, কোয়ানটিটি বা ডিসিপ্লিন আমরা উপযুক্তভাবে নিত্যদিন মেইনটেইন করি কি? নিজেদের প্রোফাইলকে যথাসাধ্য অকৃত্রিম ও সুন্দরভাবে সাজিয়ে আমরা আমাদের ফেসবুক প্রোফাইল চালাই কি? ফেসবুকে সাধারণত লাইক আসে চারভাবে,

১ . শ্রদ্ধা, স্নেহ-ভালোবাসা বা দয়া-মায়ার উপরে নির্ভর করে। এক্ষেত্রে ছবি, ভিডিও এই জাতীয় কিছু কনটেন্ট, বিশেষত লেখা আকারে কিছু পোস্ট থাকলে, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে না পড়ে, না বুঝেও আসতে পারে।

২ . বাধ্য হয়ে। সে বা তিনি লাইক দেন, তাই তাঁর পোস্টেও আমায় দিতে হয় ইত্যাদি এমন।

৩ . ভদ্রতা রক্ষার্থে, ও

৪ . পোস্ট করা বিষয়ের ওজন, গুরুত্ব ও জনপ্রিয়তা অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবেই। এক্ষেত্রে বিষয়কে দেখে, শুনে বা পড়ে বুঝতে হয়।

এ বিষয়ে ফেসবুকে বেশ কিছু মজাদার ঘটনা প্রায়দিনই আমার নজরবন্দি হয় বৈকি। যেমন : আর্থিকভাবে বেশ প্রতিপত্তিসম্পন্ন, নেতা-নেতা গোছের, কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তিত্ব কিংবা উচ্চ পদস্থ কোনো সরকারী কর্মচারী কেউ একটা মাছের ছবি দিয়ে তাঁর প্রোফাইলে পোস্ট করলেন, আর ক্যাপশন হিসেবে উপরে লিখলেন, ‘আমাদের নিজেদের গাছের, কেমন সুন্দর না?’ ব্যস! আর পিছনে ফিরে তাকাতে হল না, টুপ-টাপ, ঝুপ-ঝাপ করে বৃষ্টির ফোঁটার মতন পড়তেই থাকলো তাঁর সেই পোস্টে লাইক, পারলে আবার গুচ্ছখানেক পজিটিভ কমেন্ট, বা শেয়ারও।

বলাবাহুল্য এক্ষেত্রে বিশেষত নতুন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলার প্রায় সাথেসাথেই তাঁদের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আসে কালবৈশাখী হয়ে।

এদিকে বিষয় হল, যে বা যাঁরা লাইক করেছেন, শুধু তাঁরাই জানেন যে, কে, কি চিন্তাভাবনা করে সেই পোস্টে লাইক করেছেন কিংবা করেন, কিন্তু যিনি পেলেন, তিনি তো বকবক খুশি!

আবার কোথাও দেখা যায় এমন, অপ্রতিষ্ঠিত বা নিম্নমধ্যবিত্ত কিংবা অসুন্দর কেউ একজন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ক্রিয়েট করে, তাতে সমাজকেন্দ্রিক ইতিবাচক কিছু কিংবা বিভিন্ন স্বাধীনতা সংগ্রামী বা মনিষীদের কথা লিখছেন বা ভিডিও-এর মাধ্যমে পোস্ট করছেন, সেক্ষেত্রে লাইক আসে পূর্ব অপেক্ষা বেশ কম বলাটাই এখানে যুক্তিসংগত।

কখনও দেখা যায়, কারো প্রোফাইলে, কেউ আবার পোস্ট করলেন এক সেলিব্রিটি নায়িকার অর্ধদেহ পোশাক অনাবৃত এক রঙিন ও স্বচ্ছ ছবি, আর পাশাপাশি করা হল বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনী হাজরা কিংবা শ্রদ্ধেয় মান্না দে’র ছবি। কিছুক্ষণ পরেই দেখা যাবে, লাল-নীল পিঁপড়েরূপী সিংহভাগ লাইকগুলো উবুড় হয়ে বা হুমড়ি খেয়ে গিয়ে পড়েছে সেই মধুভান্ডার নায়িকার গায়ের উপরে গিয়ে! অনেক ক্ষেত্রে এটাও লক্ষ্য করা গেছে, বেশিরভাগ লাইক অথবা লাইক, কমেন্ট পড়ে যে কনটেন্টে, ফেসবুক বন্ধুরা তাতেই লাইক করেন বেশি। বিষয়টা বুঝে হলে পরবর্তী বাকিরা সে মুহুর্তে তখন আগ্রহবশতঃ পড়েন বা দেখেন সেই কনটেন্ট, আর যদি হয় না বুঝেই তো এমন যে, এতজন যখন লাইক, কমেন্ট করেছেন, নিশ্চই ভালো কিছু হবে।

একটু ভালোভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে, ফেসবুকে শুধু এই লাইক, কমেন্টের ভিত্তিতেই বোঝা যায় বেশ কিছু মানুষের মানসিক গতিবিধি। তবে ফেসবুকে সিংহভাগ মানুষের মানসিকতার সবথেকে বড় ও অদ্ভুৎ যে পরিচয়টা পাওয়া যায় তা হল, তুমি আমায় লাইক দাও, আমিও তোমায় লাইক দেব। এতে তোমার বা অন্য কারো কনটেন্ট যদি আমার চেয়ে হয়ও গুরুত্বপূর্ণ, কুছ পরোয়া নেহি। এক্ষেত্রে সামাজিক মেলামেশায়ও হয়তো তাঁর বা তাঁদের সেই মানসিকতা বেরিয়ে না আসাটা অস্বাভাবিক যে, তুমি বা আপনি আমায় উপকার করলে তবেই আমিও সামাজিকভাবে এগিয়ে যাব আপনাকে উপকার করতে। এমনকি কে আপনাকে ঈর্ষা করে, কে হিংসা করে, কে ভালোবাসে? প্রভৃতি এসব কিছুও একটু লক্ষ্য করলেই ফেসবুকের মাধ্যমে জ্যোৎস্নার আলোর মতন ফুটে বেরিয়ে পড়বে আপনার মনেই।

অনেকে আছেন আবার এমন, প্রোফাইল ক্রিয়েট করে, বহু ফ্রেন্ড বানিয়েই হয়ে যান সুইচ অফ্!

মানে তিনি হয়তো সেই প্রোফাইলের মাধ্যমে নিজে নিষ্ক্রিয় থেকে, তাঁর বন্ধুদের গতিবিধির উপরে যতদিন সম্ভব সংগোপনে প্রভাব ফেলবেন ক্লোজ সার্কিট বা মোশন ডিটেক্টর ক্যামেরা হয়ে!

কে ভবিষ্যতে সু-সম্পর্ক আপনার সাথে আদৌ রাখতে চায় অথবা চায় না, কে উপেক্ষা বা অবহেলা করছে, এসব কিছুও কিন্তু চেষ্টা করলেই, ধরা পড়তে পারে আপনার অনুভূতিতে।

সর্বশেষ পরোক্ষভাবে ফেসবুক কিন্তু মানুষ চেনার ও তাঁদের সাথে সম্পর্কের উন্নতি অথবা অবনতি ঘটাবার এক উপযুক্ত মাধ্যমও বলা যেতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *