- আলোচনা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সমাজ ও পরিবেশ

কম্পিউটার সায়েন্স এবং করোনা পরবর্তী বিশ্ব

ড. রত্নকীর্তি রায়

সময়টা ২০২০ সালের মার্চ। হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল সারাবিশ্ব। বন্ধ স্কুল, কলেজ। বন্ধ যানবাহন, ব্যবসা, দোকানপাট। স্তব্ধ হয়ে গেল জনজীবন। করোনা ভাইরাসের আক্রমনে হঠাৎই বদলে গেল গোটা দুনিয়া। এরকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হইনি কেউই। যেমন দরকার ছিল এই লকডাউনের তেমনি সমস্যা ও হল নতুন একটি, ‘এবার সমস্ত কিছু চলবে কি করে? অফিস, পড়াশোনা সব কি তবে আটকে যাবে? ছাত্রদের ভবিষ্যৎ কি তবে অনিশ্চিত?’ এই সকল প্রশ্নের উত্তর এবং সমস্যার সমাধান বাতলে দিল কম্পিউটার সায়েন্স।

বিশ্বব্যাপি পুনর্জন্ম হল অনলাইন কাজকর্মের। বাড়িতে বসে চলতে লাগল স্কুল-কলেজের ক্লাস। বাড়ি থেকেই কাজ করলেন তথ্যপ্রযুক্তিকর্মীরা। ঘরের ভিতর একটি ল্যাপটপ বা মোবাইলের সাহায্যে চলল সরকারি-বেসরকারি কাজ। বাড়িতে পৌঁছোল খাবার, ঔষধ এবং আর যাবতীয় দ্রব্য। একবছর পরে আমরা সবাই এই নতুন জীবনকে অনেকটাই মেনে নিয়েছি। অনেকের কাছে খুলেছে অনেক সুযোগও। তাই আলোচনা করা যাক সেই বিষয়টি নিয়ে যার আশীর্বাদে আমরা এই দুর্গম সময়টি অনেকটাই সহজে অতিক্রান্ত করতে পারছি। কি হবে সেই কম্পিউটার সায়েন্সের ভবিষ্যৎ মহামারী পরবর্তিকালে?

বলা যেতেই পারে, আগামী দিনটা কম্পিউটার নির্ভর হবে অনেকটাই। দৈনন্দিন জীবনে সর্বত্র থাকবে এর ছোঁয়া। যেমন খুব সহজেই অনলাইনে অফিসের মিটিং সেরে ফেলতে পারেন Cisco Webex, Google Meet, Microsoft Teams বা Zoom; নামক কিছু অতি পরিচিত অ্যাপের সাহায্যে। এদের সবগুলিঅ্যাপই সুরক্ষিত এবং দ্রুত। বলাবাহুল্য, Google Meet অ্যাপটি হাল্কা এবং নিখরচায় ব্যবহার করা যায় কোন সময়সীমার বাধানিষেধ ছাড়াই। এই সমস্ত অ্যাপগুলি Subscription ও করা যায় যদি বেশিসংখ্যক (১০০ জনের বেশি) অংশগ্রহণকারী থাকে এবং subscription নিলে আর কোন বাধানিষেধ থাকবে না। এগুলি দ্বারা স্কুল-কলেজের ক্লাসও সুন্দর ভাবে নেওয়া যায়। এবার ধরা যাক রোজকার বাজার দোকানের সামগ্রি বাড়িতে পৌঁছোনোর জন্য আছে Grofers, Spencers, BigBasket-এর মত অ্যাপ। যেখানে এগুলিনেই সেখানে আঞ্চলিক অ্যাপ আছে যেমন দুর্গাপুর শহরের ক্ষেত্রে ZipZo।

শুধু এই না, এমনকি ধরে নেওয়া যাক যে আপনি গোটা পরিবারের সঙ্গেই করোনাক্রান্ত হয়ে হাস্পাতালে ভর্তি। এবার আপনার বাড়ির সুরক্ষা কে করবে? এইরকম পরিস্থিতিতেও কম্পিউটারের দৌলতে উপায় হওয়া সম্ভব। Internet of Things বা IoT কম্পিউটার সায়েন্সের এক নতুন দিগন্ত বলা চলে যার একটিমাত্র বৃহৎ উদ্দেশ্য মানুষের জীবনকে আরও সহজ এবং আরামদায়ক করে তোলা। IoT দ্বারা আপনার বাড়ি হয়ে উঠতে পারে ‘Smart Home’। যেখানে ইন্টারনেটের মাধ্যামে যুক্ত হতে পারে ক্যামেরা এবং বিভিন্ন সেন্সর যা আপনার বাড়ির সবকিছুকে বেঁধে রাখবে একটি অ্যাপের সঙ্গে। দূরে থেকেও অ্যাপের মাধ্যামে দেখতে পাবেন বাড়ির অন্দর-বাহির সবকিছু।

পাশাপাশি, লাগান জেতে পারে ‘Anti Burglary System’। যাতে চোর-ডাকাতের অনুপ্রবেশ ঘটলে অ্যাপই কাছের পুলিশ থানায় জানাবে। যখন আমরা ভেবেছি যে এত কাজ কি করে হবে, তখনই লকডাউনের মধ্যে ঘটে গিয়েছে এক শান্ত বিপ্লব। গোটা দেশের ইন্টারনেটের পরিকাঠামো উন্নতি হয়েছে ঝড়ের বেগে। আগের তুলনায় তাই ইন্টারনেটের ভরসাযোগ্যতা অনেকটাই বেশি।

এই পরিস্থিতিতে বলা যায়, আগামী সময়ে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করা ছাত্রদের সামনে ‘সুবর্ণ সুযোগ’ আছে প্রতিস্থিত হওয়ার। যেহেতু আজ অ্যাপ এবং ইন্টারনেটের ব্যবহার বেড়েছে অনেক, তাই জন্য তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে অনেক নতুন চাকরির সুযোগ ও তৈরি হয়েছে। অবশ্য এখন বৃত্তিমূলক বা ‘Skill based’ চাকরি প্রাধান্য পাচ্ছে। অতএব, ছাত্র-ছাত্রীদের শুধুমাত্র মেধাবী হলেই চলবে না বরং মেধার সঙ্গে লাগবে সঠিক এবং মানানসই ‘Skill Set’। তাহলে প্রশ্ন হল কী কী থাকবে সেই স্কিলসেটে?

সমসাময়িককালে, গোটা বিশ্ব ডেটা নিয়ে কাজ করে চলেছে তাই কম্পিউটার বিজ্ঞান অ্যাপ্লিকেশন যেমন ডেটা সায়েন্স হল শিক্ষার্থীরা যে বড় দক্ষতা অর্জন করতে পারে তারমধ্যে একটি। পাইথনের মতো প্রোগ্রামিং ভাষার সংমিশ্রণে ডেটা বিশ্লেষণ কম্পিউটার বিজ্ঞানের স্নাতকের জন্য দুর্দান্ত সূচনার পয়েন্ট হতে পারে। একইভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘Artificial Intelligence’, মেশিন লার্নিং এবং ইন্টারনেট অফ থিংসের মতো অ্যাপ্লিকেশনগুলিও লাভজনক ক্যারিয়ারের পথ সুগম করতে পারে। আবার, যেহেতু গত এক বছরে ইন্টারনেট ভিত্তিক পরিষেবাগুলির ব্যবহার বহুগুণ বেড়েছে চলাচল ও মিথস্ক্রিয়ার সীমাবদ্ধতার কারণে, একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র যেটি আত্মপ্রকাশ করেছে সেটি হচ্ছে ‘সাইবার সুরক্ষা’। আগামী কয়েক বছরে, সাইবার সুরক্ষা একা দশ লক্ষেরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর খবরে বলা হয়েছে, ২০১২-২০২৯ সালের মধ্যে এই শিল্পটি চাকরির বৃদ্ধির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে ৩১%। এটি অন্যান্য শিল্পের তুলনায় অনেক দ্রুত হার। আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা আমাদের মনে রাখতে হবে তাহল ‘কোভিড-১৯’ পরবর্তী বিশ্বে এমন কম্পিউটার ভিত্তিক সমাধান তৈরির উপর জোর দেওয়া হবে যা প্রতিদিনের ক্রিয়াকলাপগুলিকে স্বয়ংক্রিয় করে তোলে এবং মানুষের ‘direct contact’ ন্যূনতম করতে পারে। ব্যাংকিং থেকে শুরু করে কেনাকাটা পর্যন্ত বেশিরভাগ সংস্থাগুলি যেখানে মানুষের আনাগোনা বেশি, এই নীতিগুলি গ্রহণ করার চেষ্টা করবে। এমন কি শিক্ষারক্ষেত্রেও পদ্ধতিগতভাবে শিক্ষাদান এবং শেখার অভিজ্ঞতাগুলিতে মানযোগ করবে প্রযুক্তি। সুতরাং, কম্পিউটার সায়েন্স কোর্সের শিক্ষার্থীদের সেই সকল দক্ষতা অর্জনের দিকে মনোনিবেশ করা উচিত যা তাদের এই লক্ষ্য অর্জনে সমাধানের সংস্পর্শে আসতে সহায়তা করবে।

আগামী বছরগুলিতে কম্পিউটার বিজ্ঞানের ভবিষ্যত যথেষ্ট উজ্জ্বল বলে মনে হয়। কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন, সাইবার সিকিউরিটি, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং মেশিন ইন্টেলিজেন্সে বিভিন্ন বিশেষায়িত স্নাতক কোর্সের উপস্থিতি আরও অনেক শিক্ষার্থীর কম্পিউটারের জগতে প্রবেশের সুযোগ বাড়িয়েছে। যথাযথ দক্ষতার সেটগুলির সঙ্গে প্রয়োগের স্কোপগুলির প্রাচুর্যতা প্রকৃতপক্ষে কম্পিউটার বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক এবং ফলপ্রসূ ভবিষ্যতের পথ প্রশস্ত করতে পারে।

সঠিক দক্ষতা বাছাই করা ছাড়া, কেবলমাত্র অন্য যে জিনিসটির প্রয়োজন তাহল ক্রমাগত আপগ্রেড এবং উদ্ভাবনের একটি চেতনা। কোভিড-১৯ পরবর্তী যুগে, এটিই সাফল্যের পথ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *