- অপরাধ ও দুর্নীতি, আলোচনা, রাজনীতি

অতিমারীতেও যুদ্ধ ও দখলের রক্তাক্ত ইতিহাস

দীপক সাহা

সময়টা অতিমারীর। মারণ ভাইরাস দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এখনও। এই অবস্থাতেও যুদ্ধ ও দখলের রক্তাক্ত ইতিহাস পৃথিবীকে ছেড়ে যায়নি। দশ দিনের যুদ্ধে প্রায় আড়াইশো প্রাণহানির পর মিশরের মধ্যস্থতায় সংঘাত অবসানে রাজি হয়েছে ইহুদিবাদী ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও সামরিক সংগঠন হামাস। উভয়পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার যুদ্ধবিরোধীর ঘোষণা এসেছে বলে বিবিসি ও রয়টার্স জানিয়েছে। আপাতত স্বস্তির নিঃশ্বাস। কিন্তু এই স্বস্তি কতদিনের!

বিগত কয়েকদিন সারাক্ষণই আতঙ্কে কেটেছে সেখানকার মানুষের দিনরাত। এই বুঝি বেজে উঠবে সাইরেনের তীক্ষ্ণ শিস। হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তাই আঁকড়ে ছুটে গিয়ে লুকোতে হবে আন্ডারপাসে। কখন কোন বাড়িতে আছড়ে পড়বে রকেট, কে জানে! রাতের আকাশ আলো করে রেখেছিল রাশি রাশি রকেট। যেন আতসবাজি। আসলে মৃত্যুমেঘ! কার জন্য মরণের শমন বয়ে আনছে কে তার হিসেব রাখে। অথবা কোনও উঁচু অট্টালিকা গুঁড়িয়ে গেল আছড়ে পড়া রকেটে। চারপাশ থেকে ভেসে আসছে আর্ত চিৎকার, শেষ সময়ে নিজের ঈশ্বরকে ডেকে নিচ্ছে কেউ। এমনই সব ভিডিও ও ছবি দেখে আঁতকে উঠেছে বিশ্ব। ঘাতক করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে মানুষ দিশেহারা। ঠিক সেই সময়ই একদল মানুষ উদ্যত একে অন্যকে শেষ করে ফেলতে। আরও ক্ষয়, আরও মৃত্যুর খতিয়ান যেন তৈরি হওয়ার মুখে।

ধ্বংসলীলার শিকার শিশুরাও। নিরপরাধ শিশুর রক্তে ভিজে গেছে গাজার মাটি। ৬৩ টি শিশুর রক্তে হাত রক্তাক্ত করেছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সেভ দ্য চিলড্রেনের হিসাবে, প্রতি ঘন্টায় গাজায় আহত কমপক্ষে তিনটি শিশু। শিশুর আর্তচিৎকারে কাঁদছিল আকাশ বাতাস। আতঙ্কিত যে শিশু মায়ের বুকে আশ্রয় খোঁজে ঘুমের দেশে হারিয়ে গিয়েছিল, ভোরে সে লাশ। থেঁতলে গেছে তার শরীর। তেমনি মায়ের কোলে শুয়ে আছে। বিশ্ববাসী তবু যেন নীরব দর্শক।

পবিত্র জেরুজালেমে ত্রিধর্মের সংঘাতের পুনরাবৃত্তির ইতিহাস এখনো বহমান। আসলে এই সমস্যার শুরুয়াৎ অনেক গভীরে। এ লড়াই অনেক পুরনো। ইতিহাস বলবে সেই খ্রিস্টজন্মের আগের সময়কালের কথা। তবে আধুনিক সময়ে এ লড়াইয়ের মূল কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্ম।

ইসরাইল রাষ্ট্রটি স্বাধীন হয় কোনরূপ যুদ্ধবিগ্রহ করে নয় বরং জাতিসংঘের কন্সটিটিউশন এবং চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে। ইহুদিদের আদি নিবাস বর্তমানের সিরিয়া-জর্ডান-লেবানন-ইসরাইল-ফিলিস্তিন অঞ্চল। কিন্তু ইতিহাসের নানা সময় নিপীড়নের শিকার হয়ে ইহুদিরা এই অঞ্চল থেকে বিতাড়িত হয় এবং সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ইহুদি নেতারা তাদের আদি ভুখন্ডে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনার বিষয়ে আলোচনা শুরু করে। ১৮৯৬ সালে ডঃ থিওডোর হারজেল প্রথম ইহুদি জাতিগোষ্ঠীর জন্য আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি করেন। ১৮৯৭ সালে ইহুদিদের আদি নিবাসে ফিরে যাওয়া ও তাদের জন্য একটি রাষ্ট্র সৃষ্টির বিষয়টি রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনের নানা পথ অতিক্রম করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ইহুদিদের হাতে ক্রীড়নকে পরিণত হয়ে মার্কিন ও ব্রিটেনের চক্রান্তকে সফল করার উদ্দেশ্যে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের বিরোধিতাকে তোয়াক্কা না করে ফিলিস্তিনকে দ্বিখণ্ডিত করার প্রস্তাব পাশ করে। এই প্রস্তাব অনুসারে জাতিসংঘ মাত্র ৪৫ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের প্রদান করে এবং বাকি ৫৫ শতাংশ ভূমি ইহুদিবাদীদের হাতে ছেড়ে দেয়। এভাবে ফিলিস্তিনের ভূমিকে জোর পূর্বক দখল করে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে গঠন করা হয় নতুন ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল। অনেক টালবাহানার পরে স্থির হয় পশ্চিম জেরুজালেম থাকবে ইসরাইলের অধীনে। পূর্ব জেরুজালেম থাকবে জর্ডনের অধীনস্থ। কিন্তু তা ছিল একেবারেই অস্থায়ী ব্যাপার। দু’দশক যেতে না যেতে লাগল যুদ্ধ। ১৯৬৭ সালে সিরিয়া, জর্ডন ও ফিলিস্তিনের সঙ্গে লড়াইয়ের পরে ইসরাইল পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয়। সেই সঙ্গে দখল করে আরেক উল্লেখযোগ্য স্থান ফিলিস্তিনের ওয়েস্ট ব্যাংক।

সংঘর্ষ চলতে থাকে। এরই মধ্যে ১৯৮৭ সালে জন্ম নেয় ফিলিস্তিনের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক সংগঠন হামাস। ‘ইন্তিফাদা’ বা ফিলিস্তিনি গণজাগরণ শুরু হওয়ার পরে তাদের জন্ম। ২০০৫ সালে রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতে অংশগ্রহণ করে হামাস পরের বছর ফিলিস্তিনের আইন পরিষদ নির্বাচনে জিতেও যায়। তারপর থেকে গাজা রয়েছে তাদের দখলে। আর ইসরাইল চেষ্টা করছে গাজায় হামাসের ক্ষমতা খর্ব করতে। সেই থেকেই ইসরাইলের সঙ্গে হামাসের সংঘর্ষ চলছে। ২০১৪ সালে শুরু হয় এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। হামলা, পালটা হানায় ক্ষতবিক্ষত হয় গাজা। মারা যান ২১৪৩ ফিলিস্তিনি। আহত ১১ হাজার। ঘরছাড়া হতে হয় লক্ষাধিক মানুষকে।

২০১৪ সাল থেকে ২০২১। ফের শুরু বড় ধরনের সংঘাত। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে যে সংঘর্ষ চলছিল তার সূত্রপাত ঘটে ৯ মে। ওই দিন ছিল ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য পবিত্র শবে কদরের (লাইলাতুল কদর) রাত। ৯ মে রাতে জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদে শবে কদরের নামায আদায় শেষে মসজিদ চত্বরে বিক্ষোভ শুরু করেন সেখানে উপস্থিত ফিলিস্তিনি মুসল্লিরা। তা দমাতে তৎপর হয়ে ওঠে ইসরাইলের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ সময় সংঘাতে আহত হন অন্তত ৯০ জন ফিলিস্তিনি। সংঘাতের পর থেকে আল-আকসা মসজিদ ও এর সংলগ্ন এলাকা ঘিরে রেখেছিল ইসরাইল পুলিশ। এর জেরে হামাসের পক্ষ থেকে ইসরাইল সরকারকে আল্টিমেটাম দিয়ে বলা হয়, ১০ মে সন্ধ্যা ৬ টার পর মসজিদ চত্বর থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের প্রত্যাহার না করা হলে তার পরিণতির জন্য ইসরাইল সরকার দায়ী থাকবে। ইসরাইল এই হুমকিকে আমল না দেওয়ায় ১০ মে সন্ধ্যার পর গাজা থেকে ইসরাইলের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে রকেট হামলা শুরু করে হামাস। অল্প কিছু সময় পরই গাজায় ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলো লক্ষ্য করে বিমান হামলা শুরু করে ইসরাইলের সেনাবাহিনী। সেই থেকেই শুরু। ঘোর করোনাকালে পুরনো শত্রুতাকে আঁকড়ে ধরে দু’পক্ষের সংঘর্ষ।

বাইডেনের প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়ে ইসরাইল হামাসকে ধ্বংসের নামে গাজায় গুঁড়িয়ে দিয়েছে জনপদ, বিশাল বিশাল টাওয়ার, বাণিজ্যিক ভবন। এমনকি তাদের রক্তের নেশা থেকে রেহাই পাই না স্কুল পর্যন্ত। কমপক্ষে ৩১ টি স্কুল ধ্বংস করে দিয়েছে। খবরে প্রকাশ, সংঘর্ষ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত গাজায় নিহত হয়েছেন ২৩১ জন। নিহতের মধ্যে ৬৩ জন শিশু ও ৩৬ জন মহিলা আছেন। আহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে দেড় হাজারেরও বেশি। ইসরাইলের চলমান হামলায় গাজায় ৭৫, ০০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। গাজা উপত্যকায় আলজাজিরা ও এপির কার্যালয় থাকা বহুতল ভবন আল-জালা-টাওয়ার গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরাইল। বর্বোরচিত হামলায় গাজায় তিনটি মসজিদ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে, ৪০ টি মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়াও ৪২টি মসজিদের দরজা ছিল বন্ধ।

রেড ক্রসের মহাপরিচালক রবার্ট মার্দিনি এক বিবৃতিতে বলেছেন, গাজায় মৌলিক সরবরাহ ও বিদ্যুতের মারাত্মক সংকট চলছে, যা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনার সামিল। রাষ্ট্র সংঘের হিসাবে, গাজায় জল সংকটের কারণে অনন্ত ৪ লাখ ৮০ হাজার মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়েছে। খাদ্যসংকটে পড়া গাজায় ত্রাণের সামগ্রী ঢুকতে দিচ্ছে না ইসরাইল। এ তথ্য অন্য কারো নয়, রাষ্ট্রসংঘের। পূর্ব জেরুজালেম থেকে ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নির্মূলকরণের ঘটনা, রমজানে আল আকসা মসজিদে নামাজরত মুসল্লিদের ওপর ইসরাইলিদের আগ্রাসন এবং গাজার সাম্প্রতিক হামলায় শত শত ফিলিস্তিনির মৃত্যুর ঘটনা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সামিল। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও যুদ্ধপরাধ চালাছিল ইসরাইল। এদিকে ইজরাইলি কর্তৃপক্ষ বলছেন, গাজার হামলায় এ পর্যন্ত তাদের ২ শিশুসহ ১২ জন নিহত। এ পর্যন্ত হামাস কমপক্ষে ৩ হাজার রকেট ছুঁড়েছে ইসরাইলে। যদিও ‘আয়রন ডোম’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে বেশির ভাগ রকেটকে প্রতিহত করে দিয়েছে ইসরাইল। উভয় পক্ষই দৃশ্যত যুদ্ধাপরাধ আইন লঙ্ঘন করছে।

আর মানুষ? সাধারণ মানুষ? তাঁদের দিন কাটে প্রার্থনায়। বিশেষ করে গাজায়। প্রতি পদে পদে তাই ঘুরে যায় মৃত্যুর সার্চলাইট। বৃহত্তর দৃষ্টিতে সংঘর্ষ কিংবা যুদ্ধে মৃত্যু আসলে সংখ্যা মাত্র। কিন্তু ধ্বংসস্তূপের রারুদগন্ধের ভিতর থেকে যে ক্রন্দনধ্বনি ঠিকরে বেরোয়, তা বুঝিয়ে দেয় যুদ্ধে যেই জিতুক বা হারুক আসলে পরাজিত হয় মানুষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *